ইসলামে স্বাধীনতা, দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধের গুরুত্ব অপরিসীম। কেননা, আল্লাহতায়ালা সবাইকে স্বাধীন করে সৃষ্টি করেছেন। সবাই নিজ নিজ ধর্ম-কর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে; এটাই আল্লাহতায়ালার বিধান। প্রত্যেক মানুষ মাতৃগর্ভ থেকে স্বাধীন হয়ে জন্মগ্রহণ করে। মানুষের জন্য এটাই স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। আল্লাহতায়ালা সবাইকে বিবেক ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা দিয়েছেন।

ইসলাম স্বাধীনতাকে যেমন গুরুত্ব দিয়েছে, তেমনি দেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধকেও গুরুত্ব দিয়েছে। যার ফলে দেশপ্রেমকে ইমানের অংশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে সুরক্ষিত রাখতে দেশপ্রেম অত্যাবশ্যক। রাসুলে পাক (সা.)-এর জীবনাদর্শ ও স্বভাব-চরিত্রে দেশপ্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি নিজের মাতৃভূমি পবিত্র মক্কা নগরীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তাই স্বজাতি কর্তৃক নির্যাতিত, নিপীড়িত হয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশে জন্মভূমি মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকালে বারবার মক্কার দিকে ফিরে তাকিয়ে কাতরকণ্ঠে আফসোস করে বলেছিলেন, 'হে মক্কা! ভূখণ্ড হিসেবে তুমি কতই না উত্তম; আমার কাছে তুমি কতই না প্রিয়! যদি আমার স্বজাতি আমাকে বের করে না দিত, তবে কিছুতেই আমি অন্যত্র বসবাস করতাম না।' (তিরমিজি)।

অন্যান্য নবীর ক্ষেত্রেও আমরা দেখেছি, মহান আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে একেকটি অঞ্চলে দ্বীনের দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। কোরআনে যেমন মুসার (আ.) কথা রয়েছে- 'স্মরণ করো, যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ করো, যখন তিনি তোমাদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছিলেন এবং তোমাদের রাজত্বের অধিকারী করেছিলেন। আর বিশ্বজগতে কাউকে যা তিনি প্রদান করেননি, তা তোমাদের দিয়েছেন।' (সুরা মায়িদা, আয়াত :২০)। একইভাবে নুহ (আ.)-এর কথা আল্লাহ বলেছেন, 'আমি তো নুহকে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের কাছে। সে বলল, 'হে আমার সম্প্রদায়, আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো ইলাহ নেই। তবু কি তোমরা সাবধান হবে না?' (সুরা মুমিন, আয়াত :২৩)। অনুরূপভাবে আল্লাহ আরও বলেন, 'আমি প্রত্যেক রাসুলকেই স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি।' (সুরা ইবরাহিম, আয়াত :৪)

এ আয়াতগুলোর মাধ্যমে বস্তুত স্বদেশ, ভাষা ও সম্প্রদায়ের ইঙ্গিত দিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। স্বদেশপ্রেম ও মাতৃভূমিকে ভালোবাসা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিমের ইমানি দায়িত্ব। যারা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা করবে, দেশের মানুষকে ভালোবাসবে এবং দেশের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত থাকবে; তাদের প্রতি আল্লাহ ও তার রসুলের কাছ থেকে বিশেষ পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। তাই আল্লাহর দ্বীনের জন্য, দেশের স্বাধীনতা অর্জন ও দেশমাতৃকার সুরক্ষার জন্য জানমাল উৎসর্গ করা কর্তব্য।

হাদিসে বর্ণিত- রাসুলে পাক (সা.) স্বদেশপ্রেমকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভের উপায় হিসেবে উল্লেখ করে এরশাদ করেন, 'যারা দেশরক্ষার উদ্দেশ্যে সীমান্ত পাহারায় বিনিদ্র রজনি যাপন করে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।'

অপর হাদিসে বর্ণিত- হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমি রাসুলে পাক (সা.)-কে বলতে শুনেছি, 'দুই প্রকারের চক্ষুকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না।

প্রথমত, সে চক্ষু যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে। দ্বিতীয়ত, সে চক্ষু যা আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারাদারি করতে করতে রাত কাটিয়ে দেয় বা বিনিদ্র রজনি যাপন করে।' (তিরমিজি)।

আমাদের এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে, স্বদেশপ্রেম ইমানি দায়িত্ব। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, আজকাল মানুষের হৃদয়ে স্বদেশপ্রেম ও দেশাত্মবোধের নৈতিকতা অনেকটা লোপ পেয়েছে। শুধু দেশের প্রতি নয়, বরং দেশের অসহায় মানুষের প্রতি ভালোবাসা দেখাতেও তারা ইতস্তত বোধ করে। অথচ দেশাত্মবোধ ও স্বদেশের প্রতি মমতা অনেক অন্যায় ও অপরাধপ্রবণতা থেকে মানুষকে বিরত রাখতে পারে।

তাই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধন করতে হলে আমাদের হৃদয় ও মননে দেশপ্রেম জাগ্রত করতে হবে। স্বদেশের প্রতি অনুগত থেকে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশমাতৃকাকে ভালোবাসতে হবে। দেশের যে কোনো প্রয়োজন বা দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের প্রতি যার ভালোবাসা নেই; দেশের মানুষের প্রতি যার মায়া-মমতা নেই; সে দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কোনো কাজ করতে পারে না। বরং সে দেশের শত্রু বলে বিবেচিত।

আমাদের কাছে মাতৃভূমি যেমন পবিত্র ও মর্যাদাবান, তেমনি দেশের পতাকাও সম্মানিত ও মর্যাদাবান। তাই দেশকে ভালোবাসার পাশাপাশি দেশের পতাকাকেও ভালোবাসতে হবে। আমাদের পতাকার মাঝে যে লাল-সবুজের চিত্র; এ তো কেবল রং নয়, বরং সবুজ জমিনের ওপর লাখো শহীদের তাজা রক্ত। এ সবুজ জমিনের ছায়া আর শহীদের রক্তলাল আদর্শের মায়া আমাদের হৃদয়ে জাগ্রত করতে হবে। তবেই দেশ হবে সোনার বাংলা। আর আমরা হবো সত্যিকারের আদর্শ দেশপ্রেমিক।

আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও দেশকে ভালোবাসার তৌফিক দান করুন।

ড. মো. শাহজাহান কবীর: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা