মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটার গড়ে ১১৭ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব রেখে গ্যাস বিরতণকারী ছয়টি কোম্পানি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) পৃথকভাবে প্রস্তাব জমা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর দুই মাসের মাথায় গ্যাসের দাম বাড়ানোর এই পাঁয়তারা 'মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা'র শামিল। কোম্পানিগুলো আবাসিক, বাণিজ্যিকসহ সব পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। আবাসিকে দুই চুলায় ৯৭৫ থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার ১০০ টাকা ও এক চুলায় ৯২৫ থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের এ প্রস্তাব কতটা 'অবাস্তব', তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাবি, যানবাহনে ব্যবহূত সিএনজির প্রতি ঘনমিটার কমিশন ছাড়া দাম বর্তমানে ৩৫ টাকার পরিবর্তে ৭৬ টাকা ৪৮ পয়সা করতে হবে। আর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৪ টাকা ৪৫ পয়সার পরিবর্তে তা বাড়িয়ে করতে হবে ৯ টাকা ৬৬ পয়সা। শিল্পকারখানার নিজস্ব জেনারেটর দিয়ে উৎপাদিত ক্যাপটিভ পাওয়ারের গ্যাসের দাম ১৩ টাকা ৮৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করতে হবে ৩০ টাকা। শিল্পে ব্যবহূত গ্যাসের দাম ১০ টাকা ৭০ পয়সার পরিবর্তে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে ১৭ টাকা ৪ পয়সার পরিবর্তে ৩৭ টাকা ২৪ পয়সা, চা শিল্পে ১০ টাকা ৭০ পয়সার পরিবর্তে ২৩ টাকা ২৪ পয়সা করার দাবি তাদের।
আমরা জানি, আইন অনুযায়ী সরাসরি প্রক্রিয়ায় তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিধান নেই। এ জন্য প্রয়োজন গণশুনানি। বিইআরসি গ্যাস কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব আমলে নেয়নি। তারা বলেছে, নিয়ম অনুযায়ী প্রস্তাব দিতে হবে, তারপর আইন অনুসারে গণশুনানি হবে। এ জন্য আমরা বিইআরসিকে সাধুবাদ জানাই। সরকারকেও এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত। জনস্বার্থবিরোধী এমন পদক্ষেপ সরকারের জন্যও হতে পারে অস্বস্তির কারণ। ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব ইতোমধ্যে জনজীবনে দৃশ্যমান। এ অবস্থায় গ্যাসের অস্বাভাবিক হারে দাম বাড়ানোর প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। করোনা দুর্যোগ আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ফের করোনা সংক্রমণ বাড়ছে। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকায় দেখা দিয়েছে শঙ্কা। এ পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই বাড়বে না; শিল্পকারখানা ও উৎপাদন ব্যবস্থায়ও এর বিরূপ প্রভাব হবে বহুমুখী।
করোনার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে সব শ্রেণির ভোক্তা ও শিল্প উদ্যোক্তারা নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। আমরা জানি, শিল্প উদ্যোক্তারা মুনাফার মার্জিন কমিয়ে পণ্য রপ্তানি করছেন। এমন পরিস্থিতিতে গ্যাসের দাম বাড়লে দাম বেড়ে যাবে বিদ্যুতেরও। গ্যাসনির্ভর শিল্পগুলোর ব্যয়ভার আরও বাড়বে। বিদ্যুতের দাম বেড়ে গেলে বাড়বে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও। এর ফলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারানোর শঙ্কাও দেখা দেবে। এলপি গ্যাসের দামও সাধারণ মানুষের ক্রয়সাধ্যের বাইরে। গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী করার এই প্রস্তাব আত্মঘাতী বলে আমরা আশঙ্কা করি। অতীতে কখনও গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলো একবারে গ্যাসের দাম এত বৃদ্ধির প্রস্তাব করেনি। দেশের গ্যাস বিতরণকারী প্রতিটি কোম্পানি বর্তমানে মুনাফায় রয়েছে- এ খবর বুধবার সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।
গত অর্থবছরে বিতরণকারী কোম্পানিগুলো যেখানে মোট মুনাফা করেছে এক হাজার ১৮১ কোটি টাকা, সেখানে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির এই অস্বাভাবিক প্রস্তাবের পেছনে কী রহস্য রয়েছে, তা সরকারের খতিয়ে দেখা উচিত।
আমরা জানি, গ্যাসের বিতরণ থেকে শুরু করে নানা স্তরে অনিয়ম-দুর্নীতি জিইয়ে আছে। জ্বালানি তেল ও ডিজেলের দামের অভিঘাত এখনও সামাল দেওয়া যেখানে কঠিন হয়ে আছে; সে ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির এই পাঁয়তারা বুমেরাং হতে পারে। আমরা আশা করি, বিইআরসি ভোক্তার স্বাথর্কে প্রাধান্য দিয়ে গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলোর দুরভিসন্ধির কারণ চিহ্নিত করে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।