করোনা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে দেশের বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত ও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যখন শিক্ষার্থী সমাগমের ব্যাপারে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করছে, তখন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়-শাবিপ্রবি কর্তৃপক্ষ যেন যেচে শিক্ষার্থী আন্দোলন ডেকে এনেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যারাতে বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলে ছাত্রীদের সঙ্গে প্রাধ্যক্ষের অসদাচরণের যে অভিযোগ উঠেছিল, সেদিনই তার নিষ্পত্তি কঠিন ছিল না। তার বদলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিক দীর্ঘসূত্রতা অবলম্বন করেছে এবং একের পর এক অবিমৃষ্যকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বিশেষত আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ কিংবা ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হামলা কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। রোববার যেভাবে পুলিশ শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা করেছে, রাবার বুলেট মেরেছে, কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে; তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সায় ছাড়া সম্ভব? এর মধ্য দিয়ে কর্তৃপক্ষ কেবল ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তা বিধানেই ব্যর্থ হয়নি; অভিভাবকসুলভ দায়িত্ব ও সংবেদনশীলতার পরিচয়ও দিতে পারেনি। আমরা মনে করি, বিশ্ববিদ্যালয়টি অহেতুক অস্থিতিশীল করে তোলার দায় কর্তৃপক্ষকে তো নিতে হবেই; উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী কিংবা তাদের পরিবারের কেউ যদি করোনায় সংক্রমিত হন, তার দায়ও এড়াতে পারবে না। পুলিশ ও ছাত্রলীগের হামলায় আহত শিক্ষার্থীদের শারীরিক চিকিৎসা ও মানসিক শুশ্রূষার দায়িত্বও বিশ্ববিদ্যালয়কে নিতে হবে।
বস্তুত গভীর রাত পর্যন্ত হলের ভেতরে আন্দোলন করে পরদিন সকালে ছাত্রীদের প্রতিনিধি দল উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যে তিন দফা দাবি তুলেছিল, তার যৌক্তিকতা অস্বীকারের অবকাশ নেই। হলের আসন সংকটের সমাধান, খাবারের মান উন্নয়ন ও ইন্টারনেটের ব্যবস্থার মতো দাবি যদি প্রাধ্যক্ষের কাছে 'গুরুত্ব' না পায় এবং তিনি যদি কোনো শিক্ষার্থীর 'মৃত্যুর মতো' গুরুতর পরিস্থিতি ছাড়া হলে উদয় হতে না চান; সেটা নিঃসন্দেহে অমার্জনীয় অসদাচরণ। এমন অসংবেদনশীল ও অবিবেচক প্রাধ্যক্ষসহ প্রভোস্ট কমিটির পদত্যাগ, ছাত্রীবান্ধব নতুন কমিটি নিয়োগ এবং হলটির সব অব্যবস্থাপনা দূরীকরণ- এই তিন দাবির কোনোটিই পূরণ করা উপাচার্যের পক্ষে অসম্ভব ছিল না। তিনি দায়িত্বশীলতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়ে শুরুতেই দাবিগুলো মেনে নিলেন না কেন- এ প্রশ্ন এখন সংগত। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে স্থানীয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলাও উপাচার্যের সবুজ সংকেত ছাড়া ঘটেছে- আমরা বিশ্বাস করি না। সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশিত খবরে দেখা যাচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের আসনগুলোর ৮০ শতাংশই ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে প্রশাসন আসন বরাদ্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব একটি ছাত্র সংগঠনের হাতে তুলে দিতে পারে, তারা যে আরও অনেক অনিয়মে সহযোগী হতে পারে, তা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। শিক্ষার্থীরা যখন উপাচার্য কিংবা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন করছেন, তখন ছাত্রলীগের আঁতে ঘা লাগার কারণও এতে স্পষ্ট।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন আমরা সমর্থন করি। তাদের দাবি যেভাবে তিন দফা থেকে এক দফায় উঠে এসেছে, তার প্রেক্ষাপটও যথার্থ। এটাও স্পষ্ট যে, রোববার সিন্ডিকেট সভা ডেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধসহ যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি ধামাচাপা দেওয়ার অপকৌশল ছাড়া আর কিছু ছিল না। সেই সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে শিক্ষার্থীরা দৃঢ়তা ও দূরদর্শিতারই পরিচয় দিয়েছেন। ইতোমধ্যে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপাচার্য সম্পর্কে যেসব অভিযোগ দেখা যাচ্ছে, তাও যথেষ্ট গুরুতর। অভিযুক্ত প্রাধ্যক্ষ ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। আমরা মনে করি, উপাচার্য ও তার প্রশাসনের উচিত হবে অবিলম্বে অভিন্ন পথ অবলম্বন করে বিলম্বে হলেও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়া। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হতে হবে। শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকারী ছাত্রলীগ নামধারী দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণের বিকল্প নেই। ক্যাম্পাসে শান্তি রক্ষার নামে পুলিশ যে বাড়াবাড়ি করেছে, তারও জবাবদিহি হতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে শিক্ষার পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের পক্ষে আবাসন, খাদ্য, সেবা ও পরিবেশ উন্নয়নের দাবিগুলো পূরণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সহজ হবে না।