কক্সবাজার শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাঁকখালী নদী দখল করে কেউ করেছেন আবাসন ব্যবসা, কেউবা বানিয়েছেন চিংড়ি ঘের। কাটা হচ্ছে প্যারাবন। সমুদ্র সৈকতের ইনানী ও সুগন্ধা পয়েন্টের পরিবেশগত সংকটাপন্ন স্থানে ‘সি বিচ ব্যবস্থাপনা কমিটি’র স্থাপনা নির্মাণ চলছে। দখল-দূষণে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি করছে। পাহাড় সাবাড় করে চলছে স্থাপনা নির্মাণ। এভাবে দিনে দিনে দখল হয়ে যাচ্ছে কক্সবাজারের পাহাড়, বন ও নদী। দখলদারের তালিকায় আছেন রাজনীতিবিদ, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীসহ অনেক প্রভাবশালী।

পর্যটন নগরীর পরিবেশ রক্ষায় হাইকোর্টে ১৯টি মামলা করেছে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ (বেলা)। প্রতিটি মামলার পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট পাহাড়, বন, সমুদ্র রক্ষার আদেশ দিলেও তার বাস্তবায়ন নেই। 

বুধবার কক্সবাজারের একটি হোটেলে বেলা এবং ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটি (ইয়েস) আয়োজিত ‘পরিবেশ প্রতিবেশ বিপর্যয় রোধে করণীয়’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। কক্সবাজারকে বাঁচাতে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাস্তাবায়ন চেয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজার শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরীর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত লেফটেনেন্ট কর্নেল ফোরকান আহমেদ। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। 

অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আল আমিন পারভেজ, বিভাগী বন কর্মকর্তা (উত্তর) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার, বিভাগী বন কর্মকর্তা (দক্ষিণ) সারওয়ার আলম, কক্সবাজার পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহেনা আক্তার পাখি, জেলা পরিষদের সদস্য আসমাউল হুসনা, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক নাজমুল হুদা, কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা, ইয়েস-এর প্রধান নির্বাহী ইব্রাহিম খলিল মামুন এবং চেয়ারম্যান মো. হাছান প্রমুখ। 

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পরিবেশবাদী নেতা, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ পর্যটন নগরীকে বাঁচাতের বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন। 

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, পরিবেশ বিনাশী কর্মকাণ্ডে কক্সবাজারের প্রতিবেশ ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকিতে। আইন ও নীতিমালার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এখানকার পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিনাশে নেমেছেন কিছু অবিবেচক প্রভাবশালী মহল। অনেক ক্ষেত্রেই আবার সরকারের অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কক্সবাজারের পরিবেশ। 

তিনি বলেন, কক্সবাজারের অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য রক্ষায় সমুদ্র, সমুদ্র তীর, নদী, পাহাড়, বন সংরক্ষণ করার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু প্রাণ-প্রকৃতির সুরক্ষায় উচ্চ আদালতে নির্দেশনা বার বার উপেক্ষিত হচ্ছে। যারা দখলদারদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন তারা নানা ভাবে হুমকি-ধমকি, মামলা ও আক্রমণের মুখোমুখি হচ্ছেন। কক্সবাজার সারা বাংলাদেশের গর্ব। আমাদের অস্তিত্ব রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান ফোরকান আহমদ নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, আমার কাছে অবৈধ দখলদারদের তালিকা আছে। মাঝে মাঝে মন চায় সব দখলদারের তালিকা জনসভা করে জনগণকে জানিয়ে দেই। কিন্তু আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা আছে, কিছুই করতে পারছি না। অনেক কিছু বলার থাকে, কিন্তু বলা যায় না। বড় বড় রথি মহারথিদের অবৈধ দোকান-পাট আছে।  আমরা সমন্বিতভাবে কক্সবাজারের পরিবর্তন চাই। এই পরিবর্তনের জন্য ৮০ শতাংশ মানুষ সমর্থন দেবেন। সবাই এক থাকলে কক্সবাজারকে সুন্দর করে গড়ে তোলা কঠিন হবে না।