মহামারি কভিড-১৯ মোকাবিলার অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী যে টিকা কার্যক্রম চলছে, তাতে বিশ্ববাসী আশায় প্রহর গুনছে এই ভেবে যে, সামনে সুদিন আসছে; কভিড-১৯ মহামারি থেকে মুক্তি পাচ্ছে। কিন্তু ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামে ধীরগতি, টিকা বণ্টনে বৈষম্য, আন্তঃদেশীয় সমন্বয়হীনতা, টিকা রাজনীতি, টিকা জাতীয়তাবাদ ও বর্ণবাদ, উন্নত বিশ্বের কপটতা এবং পৃথিবীর কোথাও কোথাও কভিড-১৯ জনমনে 'সবার জন্য টিকা' আশা হতাশায় রূপ নেয়।
'ভ্যাকসিন ইকুইটি' বা টিকা সমতা মানে হলো পৃথিবীর সব মানুষ যে যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, ভ্যাকসিন পাওয়ার ব্যাপারে সমান সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে, ব্যক্তির অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থান যা-ই হোক না কেন। বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বলেছেন, 'ভ্যাকসিন ইকুইটি কোনো রকেট বিজ্ঞান নয়, নয় কোনো দাতব্য চিকিৎসাব্যবস্থা; বরং প্রত্যেকের জন্য এটি একটি সর্বোত্তম স্মার্ট জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা।' যে কোনো ব্যক্তি পৃথিবীর যে প্রান্তে যে অবস্থায় অবস্থান করুক না কেন, এই ভ্যাকসিন সবার জন্য সমান সুরক্ষা দেবে। পৃথিবীর যে কোনো দেশের নাগরিক হোক, সে ধনী কিংবা অতীব গরিব কভিড-১৯ মোকাবিলায় সমান গুরুত্ব পাবে।
গত জুলাইয়ে ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ডের মতে, টিকা বৈষম্যের কারণে পৃথিবী ত্রিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। পুরো বিশ্ব কৃত্রিমভাবে পুরো টিকাযুক্ত, আংশিক টিকাযুক্ত এবং টিকাবিহীন বিশ্ব- এই তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে। নিম্ন আয়ের দেশগুলো অসহায় আত্মসমর্পণ করছে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর কাছে। আমরা কথায় কথায় বলি 'অরণ্যের বর্বরতা'। আসলে অরণ্যে কোনো বর্বরতাই হয় না, বর্বরতা হয় সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ নামক এই মানবসমাজে। যখন থেকে করোনার টিকা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে, ধনী দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা তো বটেই, গেল্গাবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বারবার বলে আসছে টাকার জন্য যাতে কোনো দেশ টিকা থেকে বঞ্চিত না হয়। অথচ এখন অনেক দেশ অগ্রিম টাকা দিয়ে চুক্তি করেও টিকা পায় না। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ভারতের মতো দেশ করোনার টিকা কিংবা এর কাঁচামাল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বিশ্বের অন্যতম বড় টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়ার প্রধান আদর পুনেওয়ালা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, 'ভারতের পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আপাতত দেশের ভেতরেই টিকা সরবরাহে অগ্রাধিকার পাবে। অন্য কোনো দেশ এখনই টিকা পাবে না।' টিকা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে অভাবনীয় মুনাফা অর্জনের পথে। টিকা বিক্রি থেকে আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে বিশ্বে অন্তত ডজনখানেক নতুন বিলিয়নেয়ার তৈরি হয়েছে। ২০২১ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৩৫০ কোটি ডলারের টিকা বিক্রি করেছে ফাইজার। অথচ তাদের উৎপাদনের মাত্র ২ শতাংশ দিতে চেয়েছে কোভ্যাক্সকে। মডার্না আশা করছে বছর শেষে তারা ১৮০০ কোটি ডলারের টিকা বিক্রি করবে।
টিকা উৎপাদনে অক্ষম গরিব বিশ্ব, মেধাস্বত্ব দিতে নারাজ পশ্চিমা বিশ্ব, মেধাস্বত্বের ইংরেজি পরিভাষা কপিরাইট বলতে আক্ষরিক অর্থে কোনো মৌলিক সৃষ্টির অনুলিপি তৈরির অধিকার বোঝায়। তা বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিদ্যমান একটি আইনি অধিকার, যাতে কোনো মৌলিক সৃষ্টিকর্মের মূল সৃষ্টিকর্তা ছাড়া অন্য কোনো পক্ষ সেই সৃষ্টিকর্ম ব্যবহার করতে পারবে কিনা কিংবা কোনো শর্তে ব্যবহার করতে পারবে, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার ব্যাপারে ওই মূল সৃষ্টিকর্তাকে একক ও অনন্য অধিকার দেওয়া হয়। মেধাস্বত্ব সাধারণত একটি সীমিত মেয়াদের জন্য কার্যকর হয়। ওই মেয়াদের পর কাজটি সবার জন্য উন্মুক্ত হয়ে যায়। কিন্তু উন্নত বিশ্ব সীমিত সময়ের জন্য সংরক্ষিত এই মেধাস্বত্ব আইনটি নিজেদের টিকা-কর্তৃত্ব স্থায়ী করার লালসায় মেধাস্বত্ব এখনই অন্য গরিব দেশগুলোকে দিতে চাচ্ছে না। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেধাস্বত্ব পেলে পৃথিবীর অনেক দেশ নিজেরাই টিকা উৎপাদনে সক্ষম।
ধনী দেশগুলোয় মৃত্যুর সংখ্যা এ বছরের জানুয়ারিতে সরকারিভাবে প্রকাশিত বিশ্বের মোট মৃত্যুর ৫৯ শতাংশ ছিল। টিকা দেওয়ার হার অনেক বেশি হওয়ার বদৌলতে ২০২১ সালের মে মাসে এ হার বিশ্বের মোট মৃত্যুর ১৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু নিজেদের টিকা দিয়ে উন্নত বিশ্ব মৃত্যুর হার কমিয়ে, টিকা মজুদ করে গরিব বিশ্বকে টিকা থেকে বঞ্চিত করার কারণে যে মৃত্যুর ৮৫ শতাংশ এখন উন্নয়নশীল ও গরিব দেশে ঘটছে, তা তো এই টিকা বৈষম্যের কারণেই। নৈতিকতার মানদণ্ডেও এ আচরণ মেনে নেওয়া যায় না। নিকট অতীতে বিল গেটস বলেছেন, 'ভ্যাকসিন পাওয়ার দৌড়ে শুধু ধনী দেশগুলো এগিয়ে থাকবে, এমনটা হাওয়া মোটেই উচিত নয়। ভ্যাকসিনের অসম বণ্টনের ফলে মৃত্যুহার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে গরিব দেশগুলোতে।' এ কারণেই জাতিসংঘের মহাসচিব ধনী দেশগুলোকে সতর্ক করেছেন এই বলে, 'টিকার ন্যায্যতা আমাদের সময়ের বৃহত্তম নৈতিক পরীক্ষা। এটি একটি অবশ্য করণীয় প্রয়োজনীয়তাও। সবাইকে টিকা না দেওয়া পর্যন্ত প্রত্যেকেই হুমকির মধ্যে রয়েছে।'
অধিকাংশ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী দেশে টিকা ডোজের আধিক্য বিরাজমান। শিগগিরই ব্যবহার না করলে মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যাবে। উন্নত দেশগুলো যৌক্তিক কারণে গরিব বিশ্বকে কোভ্যাক্সের মাধ্যমে দান করতে পারে। দ্বিতীয়ত, ইউনিসেফ শঙ্কিত, কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন-প্রতিরোধী অন্যান্য টিকা কার্যক্রম যেভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে তাতে শিগগিরই বিশ্ববাসী আরও অনেক রোগের ঝুঁকিতে পড়ে যাচ্ছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ৬৯২ কোটি ডোজ কভিড-১৯ ভ্যাকসিন ডোজ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্বের ৪৫.১ শতাংশ মানুষের ইতোমধ্যে পুরো দুটি ডোজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু উন্নত বিশ্ব নিম্ন আয়ের দেশগুলোর চেয়ে ২০ গুণ দ্রুতগতিতে তাদের ভ্যাকসিন কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এ টিকা দেওয়ার হার মাত্র ৪.৩ শতাংশ। ফলে বিশ্ব ইকুইটির বিষবাষ্পে জড়িয়ে যাচ্ছে। মানবিক এবং দায়ভারের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করলে এর কোনো জবাব উন্নত বিশ্ব দিতে পারবে না। চতুর্থত, ভ্যাকসিন ইকুইটি বিশ্বে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়িয়ে দেবে, জন্ম হতে পারে নতুন ভ্যারিয়েন্টের, যা কাউকেই ছেড়ে কথা বলবে না। এখনই সময় উন্নত বিশ্বকে গরিব বিশ্বের প্রতি আন্তরিকতার প্রমাণ দেওয়া।
সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।