বছর ঘুরে ঈদুল আজহা এসেছে দুর্যোগের মধ্যেই। গত বছর এ সময়ে করোনা পরিস্থিতি যতটা উন্নতির দিকে ছিল, এবারের পরিস্থিতি তার চেয়েও নাজুক। তার পরও আমরা সমকালের পক্ষ থেকে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাই। ঈদুল আজহা আরবি জিলহজের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হয়; যখন সারাবিশ্বের মুসলমানরা পবিত্র হজ পালনে আল্লাহর ঘরে সমবেত হন। যদিও করোনা দুর্যোগের কারণে গত বছরের মতো এবারও পবিত্র হজ পালিত হবে সীমিতসংখ্যক তীর্থযাত্রী নিয়ে। বস্তুত করোনা অতিমারি পৃথিবী জুড়েই দৃশ্যমান; যেখানে 'ডেলটা ভ্যারিয়েন্টে'র শক্তিশালী প্রভাবে দেশে সাম্প্রতিক সময়ে শনাক্ত ও মৃত্যুভীতি জাগানিয়া। এর মধ্যেও একটু সুযোগে অনেকেই কোরবানির জন্য পছন্দের পশু কিনেছেন। দুর্যোগ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে কোরবানির হাটেও। সমকালের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, হাটগুলোতে পশু ও ক্রেতা দুই-ই কম। উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পশু অবিক্রীত থাকায় খামারিরাও রয়েছেন শঙ্কায়। তবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পশুর হাটে কেনাবেচার নির্দেশনা প্রদান করা হলেও ব্যত্যয় ঘটার যে খবর আসছে, সেটি উদ্বেগজনক। ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ শহরের মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হলেও, করোনায় সে প্রবণতা অনেকটা কমলেও অনেকেই গেছেন। এবার প্রশাসনের তরফ থেকে চলাচলে কোনো বিধিনিষেধ না থাকলেও গণপরিবহনে যাত্রীর নিরাপত্তায় প্রত্যেককে স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে। করোনার প্রাদুর্ভাব এখনও যেভাবে অব্যাহত রয়েছে তাতে এ ব্যাপারে প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি রাত পোহালেই নামাজ পড়া ও পশু কোরবানি করার ঈদের মূল যে আনুষ্ঠানিকতা, তার সবই করতে হবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে। দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীদের বসা ও প্রয়োজনীয় সতর্কতা মানা হচ্ছে কিনা সেটি তদারক করতে হবে ঈদের পরও। ঈদের দু'দিন পরই আবার কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় এ শঙ্কা অমূলক নয় যে, ঈদের পরদিনই বাড়ি ফিরতে মানুষের ব্যাপক চাপ থাকবে। এজন্য সেসময় অতিরিক্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা যায় কিনা প্রশাসন তা ভাবতে পারে। এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের দেশে সড়ক ও গণপরিবহন সংকটের কারণে ঈদুল আজহার পরের এক দিনে গ্রামের বাড়ি থেকে রাজধানী বা কর্মস্থলে পৌঁছানো অসম্ভব হতে পারে। তাছাড়া এক দিনে সবাই রাস্তায় নামলে যানজট, জনজট, গণপরিবহন, ফেরিঘাট, টার্মিনালে মানুষের গাদাগাদিতে ভোগান্তির পাশাপাশি করোনা সংক্রমণ বেড়ে যেতে পারে। তাই যাত্রীদের আরও দু'দিন সময় দেওয়ার বিষয়টিও ভেবে দেখা দরকার। আমরা জানি, মুসলমানদের কাছে পবিত্র ঈদুল আজহা এক ঐতিহাসিক উৎসব। প্রিয় সন্তান হজরত ইসমাইলকে (আ.) মহান আল্লাহর নির্দেশে কোরবানির পরীক্ষায় যেভাবে হজরত ইবরাহিম (আ.) উত্তীর্ণ হয়েছেন, তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের মুসলমানরা সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানির মাধ্যমে এ ঈদ উদযাপন করে থাকে। তাই ত্যাগ ও আনুগত্যের নিদর্শন এ ঈদ উদযাপনের মধ্যে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উভয় উদ্দেশ্যই সাধন হয়। কোরবানির মাংস ও পশুর চামড়ার অর্থ পাড়া-পড়শি-আত্মীয়-স্বজনের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেও ব্যক্তির ত্যাগ প্রস্ম্ফুটিত হয়। গরিব-দুঃখীর পাশে দাঁড়ানো এই কোরবানি আমাদের সহমর্মিতার শিক্ষাও দেয়। ত্যাগই যে উৎসবের মূল বিষয়, ভোগের কারণে যেন সেটি ম্লান না হয়। দুর্যোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার আগে যারা কোরবানি দিত, তাদের অনেকেরই হয়তো এবার সে সামর্থ্য নেই। তাই এ পরিস্থিতিতে অন্যদের মাঝে আরও বেশি পরিমাণে মাংস বিলিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থাকা চাই। সমাজের অসহায় মানুষের অধিকার হিসেবে কোরবানির চামড়ার বাজার রক্ষা করা জরুরি বলেও আমরা মনে করি। কয়েক বছর ধরে চামড়ার বাজার নিয়ে চলা অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটাতে হবে। তাই চামড়ার বাজার রক্ষায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। কোরবানির পশু জবাই, মাংস ও পশুর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়ও যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করা চাই। বাস্তবতার স্বার্থেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আমাদের অসচেতনতার কারণে আনন্দের ঈদ যেন নিরানন্দ না হয়।

বিষয় : ঈদুল আজহা

মন্তব্য করুন