বীর মুক্তিযোদ্ধা, খ্যাতিমান সাংবাদিক, বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা, উদ্যমী সমাজসেবী- কতই না পরিচয় রণেশ মৈত্রের! মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল চল্লিশের কাছাকাছি। প্রিয় বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করার সংকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়লেন সশস্ত্র সংগ্রামে। তরুণ বয়সেই ভাষা আন্দোলনে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সাংস্কৃতিক আন্দোলন করেছেন। আওয়ামী লীগ গঠন করেছেন। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির হাল ধরেছেন। করোনাকালে তিনি লিখে ফেললেন তিনশ পৃষ্ঠার আত্মজীবনী। এতে ৫০-এর দশকের রাজনীতি ও সংস্কৃতি, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের ঐতিহাসিক বিজয় এবং পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে তার আকস্মিক অবসান, সাংবাদিকতার বর্ণাঢ্য জীবন, আইন পেশা, বিদেশ ভ্রমণ, পারিবারিক জীবন, ৬০-এর দশকে পাবনায় ভুট্টা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর দশকের ভূমিহীন কৃষক আন্দোলন- এসব রয়েছে গ্রন্থটিতে। চলার পথে যাদের সান্নিধ্যে এসেছেন তাদের কথাও বলেছেন বিভিন্ন স্থানে।
১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করা রণেশ মৈত্রের দেশসেবা শুরু হয়েছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। ১৯৫০-এ 'শিখা সংঘ' গঠন করে তারা কাজে নেমেছিলেন। এই সংঘের প্রথম কাজই ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রাখা। তার পর থেকে দেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক যে কোনো সমস্যা মোকাবিলা করতে এগিয়ে গেছেন।
আমার প্রত্যাশা তরুণ প্রজন্মের কাছে- সুদীর্ঘ একটি সময়ের কথা জানার জন্য রণেশ মৈত্রের 'আত্মজীবনী' পাঠ করুন গভীর মনোযোগ সহকারে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'কারাগারের রোজনামচা' গ্রন্থে ১৯৬৬ সালের ১১ জুলাই লিখেছেন, "আজ পাবনার রণেশ মৈত্রের সাথে আমার হঠাৎ দেখা হলো। ল' পরীক্ষা দিতে পাবনা থেকে আনা হয়েছিল। দুই একদিনের মধ্যে চলে যাবেন এখান থেকে। বললাম, 'আপনার ছেলেমেয়ের কি খবর?' বললেন, 'কি আর খবর, না খেয়েই বোধ হয় মারা যাবে। স্ত্রী ম্যাট্রিক পাশ। কাজ কর্ম কিছু একটা পেলে বাঁচতে পারতো; কিন্তু উপায় কি! একে তো হিন্দু হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তারপর রাজবন্দি, কাজ কেউই দিবে না। একটা বাচ্চা আছে। বন্ধু-বান্ধব সাহায্য করে কিছু কিছু, তাতেই চালাইয়া নিতে হয়। গ্রামের বাড়িতে থাকার উপায় নাই।' মৈত্র কথাগুলি হাসতে হাসতে বললেন। মনে হলো তাঁর মুখ দেখে এ হাসি বড় দুঃখের হাসি।" [পৃষ্ঠা ১৫৭]
বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে খুব কমই আছেন, যারা জীবনের কথা লিখে গেছেন। বঙ্গবন্ধু ব্যতিক্রম। যেমন তথ্যবহুল, তেমনি সব শ্রেণি ও পেশার এবং সব বয়সের পাঠকের উপযোগী সহজ-সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় তা লেখা। যুগ যুগ ধরে তা আমাদের জানার বাইরে ছিল। একইভাবে হিমাগারে লুকিয়ে রাখা ছিল তাকে নিয়ে পাকিস্তানের দুই যুগের গোয়েন্দা প্রতিবেদন। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে এসব গোয়েন্দা প্রতিবেদন এখন উন্মুক্ত। রণেশ মৈত্রও অদম্য। পাকশী চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠের চাকরি গেছে পাকিস্তানের গণবিরোধী শাসকদের চাপে। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান ও মোনায়েম খানের চক্রান্তে যে সাম্প্র্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়; তাতে গোটা পরিবার নিয়ে মৃত্যুঝুঁকিতে পড়েছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধকে বলেছেন 'জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়'। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঢাকায় গণহত্যার খবর পেয়ে পাবনার রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে নাগরিক সমাজ, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী- একযোগে অমিত বিক্রমে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাথমিক পর্যায়ের যুদ্ধে জয়ী হয়। এ সময়ে আরও অস্ত্র সংগ্রহের জন্য পাবনার সে সময়ের জেলা প্রশাসক নুরুল কাদের ৩০ মার্চ আওয়ামী লীগ নেতা আমজাদ হোসেন ও রণেশ মৈত্রকে ভারতে পাঠান। যাওয়ার পথে মোটরগাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান। কিন্তু তিনি যে অদম্য! পাবনা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের দায়িত্ব পালনরত অবস্থাতেই জানতে পারেন, এলাকাটি হাতছাড়া হয়ে গেছে। এখন নতুন পর্যায়ের লড়াই- গেরিলা যুদ্ধ সংগঠিত করা, তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে বাংলাদেশে পাঠানো। তিনি নব-উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্ত্রী পূরবী বসু ও সন্তানরা কোথায়, জানেন না। দু'জনের দেখা জুলাই মাসের শেষদিকে। চার মাস কেউ কারও খবর জানেন না। স্ত্রী বিয়ের আংটি পর্যন্ত জলের দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। ১৪ দিন একটানা হেঁটেছেন একটি নিরাপদ স্থানে পৌঁছাতে। রণেশ মৈত্র লিখেছেন, 'পূরবীর দিকে তাকানোই যাচ্ছিল না। ... যে চেহারা দাঁড়িয়েছিল আজও ভাবতে শিউরে উঠি। শিশুরা শুকিয়ে হাড় জিরজিরে। ... অনেক দিন এক কাপড়ে থাকায় সেগুলো পরিস্কার হয়নি। তেলবিহীন চুলের দিকেও তাকানো যায় না, চোখগুলো কোটরাগত।' [পৃষ্ঠা ২৭৮-২৭৯]
শিক্ষকতার মতো সাংবাদিকতা জীবনেও রণেশ মৈত্র সফল। তিনি আরও পাঁচটি বই লিখেছেন। সংবাদপত্রে লিখছেন নিয়মিত। করোনার মধ্যেও যোগাযোগ রাখেন বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে। তার সুস্থ জীবন কামনা করি। আমাদের আশা থাকবে- অনাকাঙ্ক্ষিত ও অভাবনীয় করোনা-সময় নিয়েও তিনি লিখবেন। সবার প্রতি অনুরোধ- রণেশ মৈত্রের লেখা আত্মজীবনী গ্রন্থটি নিজে পড়ুন,অন্যকে পড়তে উৎসাহিত করুন। যে পথ তিনি অতিক্রম করেছেন, তার পরতে পরতে এত চিত্তাকর্ষক ঘটনা, তা জানার পাশাপাশি পরিচিত অনেক মানুষ এবং অনেক এলাকার কথাও চোখের সামনে ভেসে উঠবে।

আত্মজীবনী, লেখক :রণেশ মৈত্র, প্রকাশকাল :২০২১, প্রকাশক :অনুপম প্রকাশনী, মূল্য :৪৫০
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

মন্তব্য করুন