করোনাভাইরাস যখন বিশ্বব্যাপীই ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাইকে সংক্রমিত করে চলছিল, তখন অনেকে এই দুরাশা করেছিল যে- মন্দের ভালো হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যে খানিকটা রাশ টানা হবে। বাস্তবে যত দিন গেছে, এ ধরনের প্রত্যাশার পারদ ক্রমে নিচে নেমেছে। বরং দেখা যাচ্ছে, বৈষম্য ক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশেও বেড়েছে দারিদ্র্য ও অতিদারিদ্র্যের হার। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতি সূচকের হাত ধরে আমরা দারিদ্র্যমুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তাও যেন ফিকে হয়ে আসছে। বিশেষত করোনা পরিস্থিতি শিক্ষা খাতে দিয়েছে বড়সড় ধাক্কা। সংক্রমণ রোধে গত বছর মার্চে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পর টানা ১৪ মাসে শিক্ষার গুণগত ও সংখ্যাগত সূচক ক্রমেই নিম্নমুখী। পরীক্ষা ও ক্লাস স্থগিতের পাশাপাশি সর্বজনীন পরীক্ষায় 'অটো পাস' প্রদানের মতো বিশেষায়িত ব্যবস্থার 'পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া' তো রয়েছেই; গ্রামাঞ্চল থেকে পাওয়া যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের ঝরেপড়া ও বাল্যবিয়ের মতো উদ্বেগ-জাগানিয়া সংবাদ। স্বীকার করতে হবে, করোনা পরিস্থিতিতেও শিক্ষা ব্যবস্থা সচল রাখতে সরকারের পক্ষে উদ্যোগের ঘাটতি ছিল না। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠদান সংসদ টেলিভিশনে সম্প্রচার শুরু হলেও তা কতটা কাজে এসেছে, এ নিয়ে উঠেছে সংগত প্রশ্ন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এবং কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে যদিও 'অনলাইন ক্লাস' চলেছে, তার সুফল নিয়েও রয়েছে নানামুখী আলোচনা।

আমরা দেখেছি- গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত 'এডুকেশন ওয়াচ' প্রতিবেদনে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে এ ধরনের ব্যবস্থার আংশিক কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়েছে। এতে বলা হয়েছে- দূরশিক্ষণ বা অনলাইন পাঠদান প্রক্রিয়ায় মাত্র ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছে। এর অর্থ, দুই-তৃতীয়াংশের বেশি শিক্ষার্থী রয়ে গেছে এ ব্যবস্থার আওতার বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে সোমবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যথার্থই বলা হয়েছে যে, অনলাইন শিক্ষা বরং শহর ও গ্রামের মধ্যে সৃষ্টি করেছে 'ব্যাপক বৈষম্য'। রাজধানীর একটি খ্যাতনামা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সঙ্গে জেলা সদরের অপর শিক্ষার্থীর তুলনা করে সেখানে দেখানো হয়েছে- প্রথমজন যখন পাঠ্যক্রমের দু-তৃতীয়াংশই সম্পন্ন করেছে, তখন দ্বিতীয়জন 'নতুন' পাঠ্যবইয়ের ধুলা ঝেড়েই সময় কাটাচ্ছে। আলোচ্য প্রতিবেদনের এই চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না যে, রাজধানীর খ্যাতনামা বিদ্যালয়গুলো তো বটেই, অখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও যখন নিয়মিত অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, তখন মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো রয়ে যাচ্ছে অন্ধকারেই। সরকারি নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে কোথাও কোথাও শিক্ষকরা দায়সারাভাবে ক্লাস ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছেড়ে দিলেও সেই সংখ্যা খুবই কম। আবার ওই ভিডিও ক্লাস কত শতাংশ শিক্ষার্থী দেখছে বা আদৌ দেখতে পারছে কিনা, তা জানার উপায় নেই।

বস্তুত এটা বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, অনলাইন শিক্ষা গ্রহণের জন্য মফস্বলের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর প্রযুক্তিগত উপকরণ নেই। বিজ্ঞাপন বার্তায় তথ্যপ্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও সম্প্রসারণের যে চিত্রই তুলে ধরা হোক না কেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিপুল অংশ এখনও এর বাইরে রয়ে গেছে। ফলে গ্রামাঞ্চলের জন্য অনলাইন শিক্ষার উপযুক্ত বিকল্প নির্ধারণের বিকল্প নেই। মনে রাখা জরুরি, শিক্ষার্থীদের বিপুল অধিকাংশ আসলে মফস্বলেরই বাসিন্দা। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা তাদের পড়াশোনার জন্য মফস্বলের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই নির্ভর করে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সূত্রে আমরা দেখেছি, দরিদ্র পরিবারের অনেক সন্তানই আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রমের বিরতিতে অনানুষ্ঠানিক ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাচ্ছে।

তাদের কতজন ফিরতে পারবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিশেষত বাল্যবিয়ের শিকার কন্যাশিশুদের আমরা ফেরাব কীভাবে? দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি স্বল্প মেয়াদ কীভাবে শিক্ষার্থীদের পাঠমুখী করা যায়, সে ব্যাপারে ভাবতেই হবে। সরকারের পাশাপাশি বিদ্যালয় পর্যায়েই শিক্ষক, ব্যবস্থাপনা পর্যদ ও সংগতিপূর্ণ অভিভাবকদের চিন্তা ও তৎপরতা দেখতে চাই আমরা। শিক্ষা নিয়ে কর্মরত বেসরকারি উন্নয়ন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও সুপারিশ ও সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। ভুলে যাওয়া চলবে না যে, সময় দ্রত ফুরিয়ে যাচ্ছে। সময়ে এক ফোঁড় দিতে না পারলে অসময়ে দশ ফোঁড় দিয়েও লাভ হবে না।

মন্তব্য করুন