ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো জয় পেয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস। সব মিলিয়ে ২১৩ আসনে জয়ী হয়েছে তারা। নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হয়েছে ৭৭ আসনে। এ নির্বাচনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যেভাবে মাঠে নেমেছিলেন, তাতেই এ লড়াই শেষ পর্যন্ত মোদি বনাম মমতার যুদ্ধে পরিণত হয়। শেষ পর্যন্ত দিদিকেই বেছে নিল বাংলার মানুষ। মাসব্যাপী আট ধাপের নির্বাচনযজ্ঞে শুধু বাংলাদেশ নয়; প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোরও দৃষ্টি ছিল এই নির্বাচনের দিকে।

বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় জয় নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মাঝে স্বস্তি এনেছে। একই সঙ্গে কিছুটা স্বস্তি এনেছে বাংলাদেশের জন্যও। কারণ এ নির্বাচনে যদি বিজেপি জয়ী হতো, তাহলে দলটির হিন্দুত্ববাদী ও বিভাজনের রাজনীতি আরও পাকাপোক্ত হতো। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিজয় এ অঞ্চলের রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে, ভারতের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এর প্রভাব দৃশ্যমান হবে। এ নির্বাচনে তৃণমূল হেরে গেলে বিজেপির দ্বিজাতিতত্ত্ব তথা মৌলবাদী রাজনীতি আরও প্রভাব বিস্তার করত। আমরা জানি, পশ্চিমবঙ্গে যদি কোনো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসে, তাহলে তা বাংলাদেশের জন্য ক্ষতি ও হুমকির কারণ হবে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি বিজয়ী হলে হয়তো বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী খুশি হয়ে ইতোমধ্যে মিষ্টি বিতরণ শুরু করত। ভারতে বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসার প্রভাব সন্দেহাতীতভাবে বাংলাদেশের ওপর পড়বে। এর আগে বিজেপি প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর আমরা দেখেছি, সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী বিজেপিকে আদর্শ মেনে এদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ছক আঁকতে শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা বিজেপিকে ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছে যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের রাজনীতির মাধ্যমে ভারতবর্ষের উন্নয়ন করা যাবে না।

ভারতে এমন সময় এ নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো, যখন- এক. দেশটিতে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত কয়েকদিন ধরে সংক্রমণ ও মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে সেখানে। প্রতিদিন গড়ে কমবেশি চার লাখ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। দেশটির হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের তীব্র সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধেরও যথেষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। মোদি সরকারের অব্যবস্থাপনার ফলে সেখানে জনজীবন বিপন্ন হচ্ছে। দুই. ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা তেমন ভালো যাচ্ছে না। অবশ্য করোনার আগে থেকেই দেশটিতে অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল। এ নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করলে মোদি সরকারের পক্ষে কথা বলার সুযোগ থাকত। তারা বলত- দেশের উন্নয়ন হচ্ছে এবং তারা কভিড পরিস্থিতি ভালোভাবে মোকাবিলা করছে বলেই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তাদের ভোট দিয়েছে। এতে দেশটিতে চলমান মহামারি সামাল দেওয়া আরও কঠিন হয়ে যেত।

তৃণমূলের বিজয় বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের জন্য স্বস্তির। সাধারণত বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্কের মধ্যে তিস্তা ইস্যুটি বড় ফ্যাক্টর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। বলা হয়ে থাকে- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের কারণে তিস্তা চুক্তি হচ্ছে না। এই বিষয়টি পরিস্কারভাবে উপস্থাপন করা দরকার। আমরা দেখে এসেছি- ভারতের কেন্দ্রীয় সব সরকারই তিস্তা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে 'রাজনীতি' করে এসেছে। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালেও চুক্তি না হওয়ার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসকে দায়ী করেছে, বর্তমান বিজেপি সরকারও সেই একই সুরে কথা বলছে। কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকাকালে বিজেপি নেতারা বলতেন, তারা ক্ষমতায় এলে তিস্তা চুক্তি করবেন। কিন্তু পর পর দু'বার ক্ষমতায় এলেও বিজেপি তিস্তা চুক্তির বিষয়ে তেমন কিছুই করেনি।

আমাদের বুঝতে হবে, তিস্তার সঙ্গে সিকিম জড়িত। তিস্তার সূচনা হয়েছে সিকিম থেকে। সিকিম থেকেই তিস্তায় পানি আসে। সেই সিকিমে কমবেশি ২০টি হাইড্রো ড্যাম তৈরি করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, এসব মাধ্যমে পানি আটকে রাখা হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর সেই পানি ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু হিসাবে দেখা যায়- পানি আটকে রাখলে সেই পানি কমে যায়। আর নদীর সঙ্গে শুধু পানির সম্পর্ক নয়। এর সঙ্গে জীববৈচিত্র্যসহ অনেক বিষয় জড়িত। পানি আটকে রাখলে শুধু পানিই কমে যায় না, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে নদীর সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সবকিছুর ওপর। ফলে দেখা যায়, শুস্ক মৌসুমে তিস্তার পশ্চিমবঙ্গ অংশে খুব বেশি পানি থাকে না। আর না থাকা সেই পানি ভাগাভাগি করতে বলছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে যারাই ক্ষমতায় আসুক না কেন, কেন্দ্রীয় সরকারের এ প্রস্তাবে তারা রাজি হবে না। বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে হলে রাজ্য সরকারের ওপর দায় না চাপিয়ে প্রথমে সিকিমের সেই হাইড্রো ড্যামগুলো ভাঙতে হবে। কিন্তু তা না করে তারা দীর্ঘদিন ধরে একই রাজনীতি করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ আজীবন তিস্তা চুক্তির আশায় বসে থাকতে পারে না। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। তিস্তায় শীতের মৌসুমে পানি কম থাকলেও বর্ষায় কিন্তু পানিতে টইটম্বুর থাকে। সুতরাং তিস্তার বাংলাদেশ অংশে ড্যাম তৈরি করে যদি বর্ষার সেই অতিরিক্ত পানি ধরে রাখতে পারি, তাহলে শুস্ক মৌসুমে প্রয়োজনমতো সেই পানি ব্যবহার করা যাবে। অবশ্য এটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। এক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা পাওয়ার প্রত্যাশা করছে বাংলাদেশ। সেটি হলে আমরা নিজেরাই তিস্তা সমস্যার সমাধান করতে পারব। কোনো সন্দেহ নেই, এতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও বড় হবে। তবে, এর জন্য বাংলাদেশ দায়ী নয়। কারণ আমরা বছরের পর বছর পানির দাবি করে আসছি। পানির অভাবে কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলের ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফসল উৎপাদনের স্বার্থে আমাদের চিন্তা করতে হচ্ছে।

মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের সম্পর্ক শুধু অর্থনৈতিক ও পানিকেন্দ্রিক নয়। দুই বাংলার মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতিসহ বড় ধরনের সম্পর্ক রয়েছে। কাজেই পশ্চিমবঙ্গে যদি ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় না আসত, তাহলে বাংলাদেশের ওপর বড় চাপ আসত। বিজেপি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এখানকার সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। সেই জায়গা থেকে এই নির্বাচনী ফলাফল দুই বাংলার জন্যই স্বস্তির। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের দেখে হয়তো গোটা ভারতবর্ষ শিক্ষা নেবে এবং ভারতে বিজেপি সরকার যেভাবে হিন্দুত্ববাদ ও বিভাজনের রাজনীতি তৈরি করছে আগামীতে হয়তো তারা তা প্রত্যাখ্যান করবে। 

অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন