প্রতি বছরই বাজেটে একটা খাতে নতুন কর আরোপ করা হয়। সেটা টেলিযোগাযোগ খাত। প্রায় দশ বছর ধরে বাজেট হলেই বাজেটকেন্দ্রিক যতগুলো খবর হয়, তার একটা শিরোনাম একেবারে নিয়মিত। 'মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ বাড়ছে'- এ শিরোনামে একটা রিপোর্ট প্রতিটি সংবাদপত্র-সংবাদমাধ্যমেই দেখা যাবে। সর্বশেষ গত বছর ২০২০-২১ অর্থবছরেও মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবায় সম্পূরক শুল্ক্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। এমনিতেই গ্রাহককে মোবাইলে কথা বলা কিংবা মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারসহ অন্যান্য ভ্যালু অ্যাডেড সেবার জন্য ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। এর সঙ্গে আছে ১ শতাংশ সারচার্জ। আবার ভ্যাট হিসাব করা হয় কলচার্জ কিংবা ইন্টারনেট প্যাকেজ চার্জের সঙ্গে অন্যান্য কর যোগ করে তার ওপর। ফলে প্রত্যেক মোবাইল গ্রাহককে বর্তমানে সেবা নিতে মোট ৩৩ দশমিক ৫৭ শতাংশ কর দিতে হয়। বিগত বছরে কর বাড়ানোর ধারাবাহিক হিসাবের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোবাইল সেবার ওপর ১ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আরোপ হয় ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট ও ৩ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক্ক। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক্ক বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়। ২০১৯-২০ অর্থবছরে সম্পূরক শুল্ক্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এরপর ২০২০-২১ অর্থবছরে করোনা মহামারিতে জীবিকার সংকটজনক পরিস্থিতির মধ্যেও সম্পূরক শুল্ক্ক আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়। যদি আগের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আসছে ২০২১-২২ অর্থবছরেও মোবাইল গ্রাহকদের ওপর করের হার আরও বাড়বে।

প্রশ্ন উঠছে, মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবায় কেন প্রতি বছর কর বাড়ানো হচ্ছে? এর সহজ-সরল উত্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড করারোপের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহজে আদায় করা যায় এমন খাতকেই বেশি পছন্দ করে। মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাত সংশ্নিষ্ট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যেহেতু নিয়মকানুন মেনে চলে বেশি, কর আরোপ করা নিয়ে সমালোচনা করলেও সময়মতো কর পরিশোধ করে কোনো ঝুটঝামেলা ছাড়াই, অতএব এই খাতে কর বাড়ালে বছরের লক্ষ্যপূরণে অনেকখানি এগিয়ে থাকা যায়। আর আমজনতা গ্রাহকের কথা তো বাদ দিলাম। তারা তো সুচ কেনা থেকে শুরু করে প্রতিদিনের কেনাকাটার সবক্ষেত্রে, সরকারি সেবার প্রতি মাসের বিলের সঙ্গে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক্ক, সারচার্জের মতো পরোক্ষ কর উচ্চহারে দিয়েই যাচ্ছে, বছর শেষে প্রত্যক্ষ কর হিসেবে আয়করও দিচ্ছে, করের হিসাব করার তাদের সময় নেই, হিসাব করেও তো লাভ নেই। যেমন খুশি, যত খুশি করারোপ করা হোক, চাহিদা অনুযায়ী সেবা পাওয়া যাক বা না যাক, কর দিতেই হবে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু নিজেরা কর দেয় না, তারা গ্রাহকের কাছ থেকে কর আদায় করে মাত্র। বরং অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায় করা ভ্যাট কিংবা অন্যান্য কর সরকারি কোষাগারে ঠিকমতো জমাও করে না অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অন্যান্য খাতের কর পরিশোধ নিয়ে 'বকেয়া' শব্দটা প্রচলিত হলেও টেলিযোগাযোগ খাতে যারা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের সময়মতো কর পরিশোধ করতেই হয়। গ্রাহকসেবার মান নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর হোক বা না হোক, টেলিযোগাযোগ খাতের কর আদায়ের ক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই কঠোর।

অতএব টেলিযোগাযোগ খাতে যত পার কর চাপাও, কারণ সময়মতো আদায় হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত। আরও অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, টেলিযোগাযোগ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নূ্যনতম আয়কর আরোপ করা হয়েছে ২ শতাংশ হারে। এই নূ্যনতম কর দেওয়ার সাধারণ নীতিটি হচ্ছে, সরকার যেসব পণ্যের উৎপাদন নিরুৎসাহিত করতে চায়, কিন্তু একবারে বন্ধ করতে চায় না, সেসব ক্ষেত্রে নূ্যনতম আয়কর চাপানো হয়। যেমন তামাকজাত পণ্য, অ্যালকোহলিক বেভারেজ- এ ধরনের পণ্য। বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিবেচনায় তামাকাজাত শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নূ্যনতম কর ১ শতাংশ। অথচ মোবাইল অপারেটরদের জন্য এই হার ২ শতাংশ। এ ধরনের করারোপ কোন যুক্তিতে সম্ভব? তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকার সিগারেটের চেয়েও ডিজিটাল সেবাকে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মনে করছে?

জিএসএমের (গ্লোবাল সিস্টেম ফর মোবাইল কমিউনিকেশন) রিপোর্ট অনুযায়ীই বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের গ্রাহক এবং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, পুরো বিশ্বেই সবচেয়ে বেশি কর দেয়।

করের হার বেশি হলে গ্রাহকসেবার ওপর প্রভাব পড়ে। কারণ সরকার যখন অপারেটরের কাছ থেকে বাড়তি কর আদায়ে মনোযোগী হয়, অযৌক্তিক এবং অতিরিক্ত করের বোঝা চাপিয়ে দেয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য চাপ কিংবা নজর কোনোটাই দিতে পারে না। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকাণ্ডেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। কল ড্রপ নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা যে পরিসংখ্যান দেয়, তা গ্রাহকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলে না। এই ফোরজির যুগে এসে খোদ ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় দেশের শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটরের নেটওয়ার্ক পেতে সেই ২২ বছর আগের গাছের ডালে ওঠার অভিজ্ঞতার কথা কেন মনে করতে হয়, সে প্রশ্ন কখনই তোলে না কিংবা কারণ অনুসন্ধান করে দেখে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। ফোরজি সেবায় কেন এত ফ্লাকচুয়েশন, সেটা কখনও খতিয়ে দেখা হয় না। একটা টেকনিক্যাল অডিট কখনও করা হয় না। মোবাইল ইন্টারনেটে এক দিন, দুই দিন, তিন দিন মেয়াদে ৩ থেকে ১০ জিবি ডাটা ভলিউমের হাস্যকর প্যাকেজ অনুমোদন দেওয়া হয়। শুধু একটি অ্যাপ যেমন ফেসবুক, টিকটক ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ডাটা ভলিউমের অদ্ভুত প্যাকেজ অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। উচ্চহারে করারোপের এসব জটিলতার নিট ফলাফল হচ্ছে, সাধারণ গ্রাহকসেবা গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়ে ব্যয় সংকোচন করে। ফলে করের হার বাড়িয়ে রাখলে খুব বেশি বাড়তি করও কিন্তু আদায় হয় না। বরং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সেবার মান বাড়াতে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হয় না, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন ডিজিটাল সেবাও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ বাধাগ্রস্ত হয়, গ্রাহকরাও নিম্নমানের সেবা উচ্চমূল্যে কিনতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় শুধু ২০০ টাকার সিমট্যাক্সই ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের কতটা পিছিয়ে দিচ্ছে, সে হিসাব কখনোই করে দেখা হয়নি।

শুধু তাই নয়, দেশে টেলিযোগাযোগ খাতে যতগুলো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আছে, তাদের সঙ্গে মোবাইল অপারেটরদের বাণিজ্যিক এবং কারিগরি সমন্বয়ের বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে। টেলিযোগাযোগ খাতে সার্বিকভাবে যৌক্তিক কর কাঠামো তৈরি করুন, ডিজিটাল সেবায় দ্রুততম সময়ে দেশ আরও এগিয়ে যাবে। 

সাংবাদিক

মন্তব্য করুন