শিক্ষকতাকে অনেকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করলেও একসময় তা অনেকের নেশা এবং জীবনের ব্রতে পরিণত হয়। বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে শিক্ষা ক্যাডার সম্পর্কিত আদেশ জারি হয়, ১৯৮০ সালে অ্যাক্ট হয়। এরপর ১৯৮২ সালে পঞ্চম বিসিএসের মাধ্যমে প্রথম শিক্ষা ক্যাডার নিয়োগের সার্কুলার দেওয়া হয়, তারা যোগদান করেন ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৯ সালেই নিয়োগ হয় ডেমোদের। মূলত এ ক্যাডারের পথচলা শুরুর পর থেকেই অদৃশ্য শক্তির আঘাতে বঞ্চনারও শুরুটা হয় সমান্তরালে। তাদের লেকচারার হিসেবেই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়, অবশেষে ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে প্রথম প্রমোশন পান একেবারে সপ্তম থেকে ১৪তম বিসিএস পর্যন্ত এবং আত্তীকৃতরাসহ। ওদিকে ডেমো থেকে ক্যাডারে প্রবেশ ২০১০ সালে ৪% থেকে বৃদ্ধি করে ১০% করা হয়।
নানাবিধ সমস্যার গহ্বরে ফেলে ক্যাডারটিকে বনসাই করে রাখা হয়েছে ৪০ বছর ধরে। গত ৪০ বছরে দখল হয়েছে প্রায় সবকিছুই। কারিগরি, প্রাইমারি, ব্যানবেইজ, এনটিআরসিএ, মাদ্রাসা, উপানুষ্ঠানিক দখলের লিস্ট অনেক বড়। এমনকি বিভাগীয় শহরগুলোতে পোস্টিং দুর্নীতির অজুহাতে মন্ত্রণালয় নিজেদের হাতে নিয়ে নিয়েছে। অন্য ক্যাডারের কিছু ব্যক্তির দুর্নীতির অভিযোগ যখন আসে তখন কি দায়িত্ব অথবা দপ্তর সেই ক্যাডারের হাত থেকে নিয়ে নেওয়া হয়? হয় না। তবে শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রেই কেন ব্যতিক্রম! সামনে মাধ্যমিক আলাদা হলেই, এডুকেশন বিলুপ্ত হয়ে যাবে এমনিতেই। ৪০ বছরেও অন্য ক্যাডারের মতো ৬ স্তরবিশিষ্ট ক্যাডার তৈরি করা হয়নি। সেই পাকিস্তান আমলের সিনিয়র এডুকেশন সার্ভিস (অধ্যাপক, সহযোগী) আর জুনিয়র এডুকেশন সার্ভিস (সহকারী, প্রভাষক)-এর মাধ্যমে চার স্তরই রাখা হয়েছে। আজ ৩৬, ৩৭-এর অন্য ক্যাডারের ফাউন্ডেশন প্রশিক্ষণ হলেও এডুকেশনে কেন হচ্ছে না? অনেক নীতিনির্ধারকের মতে, শিক্ষা ক্যাডার সদস্যরা শুধুই শিক্ষক। তারা যদি শুধুই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকই হবেন, তবে সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি থেকে শুরু করে বাকি পদগুলোতে কেন পদায়ন দেওয়া হয় না। পদোন্নতির শর্তপূরণ সাপেক্ষে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো তাদের তিন বছরের মধ্যে পদোন্নতি দিয়ে সহকারী অধ্যাপক, ৭ বছরে সহযোগী অধ্যাপক, ১২ বছরে গ্রেড-৩ অধ্যাপক করা হয় না কেন। কেন অধ্যাপকদের ২৫ শতাংশ গ্রেড-১ এ পদোন্নতি দেওয়া হয় না? তারা শিক্ষা ক্যাডার এজন্য নবম গ্রেডে যোগদান করে চতুর্থ গ্রেডে উন্নীত হলেও তাদের গাড়ি অথবা সময়মতো পদোন্নতি কিছুই প্রয়োজন হয় না। অথচ অন্য ক্যাডার দূরে থাক ননক্যাডার সদস্যরাও পদোন্নতি ও গাড়ি পান। ৩১ বিসিএসে যোগদানকৃত শুধু অন্য ক্যাডার, ননক্যাডার নয় বরং একই সময়ে যোগদানকৃত ব্যাংকাররাও ষষ্ঠ ও পঞ্চম গ্রেডে চলে গেছেন।
শুধু শিক্ষা নয়, অনেক ক্যাডারেই কূল নেই, তার প্রমাণ প্রকৌশলী ও ডাক্তারদের সাধারণ ক্যাডারে যোগদান। ২০১২ সালেও প্রধানমন্ত্রী ক্যাডার বৈষম্য দূর করার নির্দেশনা দিলেও বাস্তবায়ন পরিলক্ষিত হচ্ছে না। প্রতিটি সমস্যায় আজীবন মামলা করে করেই কী পার করবে শিক্ষা ক্যাডার? আমরা প্রত্যাশা করি প্রধানমন্ত্রী শিক্ষা ক্যাডারের ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে বনসাই ক্যাডারকে পূর্ণাঙ্গ ক্যাডার করার ঘোষণা দেবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, শিক্ষা ক্যাডারে কর্মরত

মন্তব্য করুন