সমাজ

শিক্ষিত মানুষ কি সুখী হতে পারছে

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ইকরাম কবীর

কদিন আগে একগুচ্ছ 'হ্যাপিনেস টিপস' বা সুখী হওয়ার উপায় সামাজিক মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। এই উপায়গুলো এসেছে হার্ভার্ডের এক শিক্ষকের ক্লাস থেকে। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে 'পজিটিভ সাইকোলজি' বা ইতিবাচক মনোবিজ্ঞান পড়ান। অনেক নাম করেছেন তিনি। বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয় ছাত্রছাত্রীদের সুখ ও আত্মবিশ্বাসের ওপর, যা তাদের জন্য জীবনে সার্থক হওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। তারা জীবনকে আরও সুন্দর করে উপভোগ করবে এবং আনন্দ নিয়ে কাজ করবে।
কিছু উদাহরণ দিই :ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানাতে হবে। তার অর্থ হচ্ছে কৃতজ্ঞ হতে শিখতে হবে। ব্যায়াম করতে হবে। সাহসের সঙ্গে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। সব মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হবে। নিজের শিরদাঁড়া ও স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে হবে। পুষ্টিকর (পুষ্টিকর অর্থ হচ্ছে 'পুষ্টিকর'; আমরা যা পুষ্টিকর মনে করি তা নয়) খাবার খেতে হবে। গান শুনতে হবে এবং হাসিখুশি থাকতে হবে। আরও অনেক ছিল। আমি এ কয়টির কথাই বললাম।
এই পরামর্শগুলো যখন পড়ছিলাম আমার মনে অন্য আরেক চিন্তা ঘোরাফেরা করছিল। হাজার হাজার বছর ধরে নবীগণ, যোগীরা এবং বুদ্ধিমান মানুষেরা এই একই উপদেশ প্রচার করে এসেছেন। আমরা শুনেও শুনিনি। এখনও তাই করি। শুনেও শুনি না, পড়েও পড়ি না। এগুলো মানবের কাছে নতুন নয়। কিন্তু যখনই হার্ভার্ডের মতো এক প্রতিষ্ঠান এ কথাগুলো বলে, আমরা উত্তেজিত হয়ে পড়ি। নড়েচড়ে বসি; অন্যকে জানাতে চাই; আমাদের সন্তানদের হার্ভার্ডের কথা বলে উদাহরণ দিই। কারণ হার্ভার্ডের গল্গ্যামার আছে।
আসলে, আমাদের দুঃখগুলোর কারণ কী? আমরা কেন অসুখী হই? একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন তাদের ছাত্রছাত্রীদের ইতিবাচক মনস্তত্ত্ব শেখানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল? তাহলে কি শিক্ষায় মনস্তত্ত্ব নিয়ে চিন্তা করার সময় এসেছে? এর আগে মনস্তত্ত্ব নিয়ে কথা বলা হতো না? হার্ভার্ডের মতো প্রতিষ্ঠান তো দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করে। শুধু হার্ভার্ড নয়, বিশ্বের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই তাই করে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে ছেলেমেয়েরা চাকরি করবে, ব্যবসা-বাণিজ্যে সাহায্য করবে, নিজের আর্থিক উন্নতির জন্য চাকরির ক্ষেত্রে ইঁদুর-দৌড়ে শামিল হবে। আমি মনে করি এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমন এক জনগোষ্ঠী তৈরি করে যারা ইঁদুর-দৌড়কেই সুখ মনে করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো তা-ই চায়। এরা করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মী জোগানের কাজ করে আসছে।
স্কুল-কলেজ আমাদের একে-অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় মাতিয়েছে। আমাদের শিক্ষকরা শিখিয়েছেন আমরা যেন আমাদের সহপাঠীদের চেয়ে ভালো ফল করি। সবাইকেই তা শেখানো হয়েছে। ইদানীং বোধ হয় প্রতিযোগিতা আরও বেড়েছে। আমরা বেড়ে উঠেছি এই মানসিকতা নিয়ে, যেন আমাদের চারপাশের মানুষের চেয়ে এগিয়ে থাকতে পারি। যখন পেশাগত জীবনে আসি, তখনও দেখি প্রতিযোগিতায় আমাকে সহকর্মীদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে হবে, ভালো করতে হবে। কর্মক্ষেত্রেও এক ইঁদুর-দৌড় শুরু হয়। এই ইঁদুর-দৌড়ের বীজ ছোটবেলায়ই রোপিত হয়ে গেছে, যা চলেছে বিশ্ববিদ্যালয় পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রেও। প্রতিযোগিতা মানুষকে উন্মত্ত করে। মনের ওপর অসম্ভব চাপ সৃষ্টি করে, যা অনবরত নিজের অজান্তেই গ্রহণ করে মানুষ মনে করে যে, সে জীবনে সার্থক হয়েছে। এই চাপ আমাদের মনে এবং শরীরে অপূরণীয় ক্ষতি করে যায়। আমরা আর্থিক অতি-উন্নতি ও পেশাগত দক্ষতাকে সার্থকতা মনে করে পরিশেষে একদল অসুখী ও অপ্রসন্ন মানুষে পরিণত হই।
ধরুন, আমাদের দেশের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা আইবিএ বা ব্যবসা-ব্যবস্থাপনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চারপাশে খেয়াল করলে দেখবেন, আমাদের সন্তানেরা আইবিএ থেকে ডিগ্রি নেওয়ার জন্য ছুটছে। বিবিএ, এমবিএ হবে ওরা। মনে করছে, আইবিএ থেকে পাস দিলেই ভালো একটি চাকরি হবে, তারপর তারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে।
আসলে তাই কি হচ্ছে? সেই মানসিক চাপ এবং বিফলতার ম্লানালোকে ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলো কিন্তু আমাদের সন্তানদের লোভ দেখিয়েই যাচ্ছে যে তাদের কাছে শিক্ষা নিলে ওরা সুখী জীবন পাবে। হ্যাঁ, আমরা বলতেই পারি যে একজন মানুষের সুখ নির্ভর করে তার নিজের চাওয়ার ওপর। সে কেমন করে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিজের জীবনে ব্যবহার করবে তার ওপর। কেউ ডাক্তার হতে পারলে সুখী, কেউ অনেক অর্থ উপার্জন করতে পারলে সুখী, কেউ একটি বাড়ি বানাতে পারলে সুখী, কেউ শুধু দু'বেলা খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারলেই সুখী। অবশ্যই শিক্ষা আমাদের নিজের মতো করে চিন্তা করে নিজেকে তৈরি করতে সাহায্য করে। আমাদের মানস উন্মোচনে সাহায্য করে।
আমাদের মতো দেশে শিক্ষা যদি মানুষকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থেকে বাঁচাতে পারে, তাহলে অবশ্যই শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আমরা যদি একজন গরিব কৃষককে শেখাতে পারি তিনি কেমন করে তার জমিতে আরও বেশি ফসল ফলাবেন, সেটি তার জন্য হবে এক ইতিবাচক শিক্ষা। তার মানসিক চাপ হচ্ছে ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য। তারা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করেন না। বিশ্বজুড়ে শতকোটি মানুষের সুখ হলো তারা কেমন করে একটু অর্থ উপার্জন করে দুধে-ভাতে থাকবে। এটিই তাদের সুখ। তাদের জন্য এসব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন আছে, তারা সবাই চাকরিপ্রার্থী। ইঁদুর-দৌড়ে শামিল হতে চায় এবং তাদের জন্যই এই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এই ইঁদুরগুলোকেই সুখ ও শান্তির উপায় বাতলে দিতে চায়। তাহলে কি আমরা ভেবে নিতে পারি যে, হার্ভার্ড তাদের ছাত্রছাত্রীদের যেমন করে সুখের সংজ্ঞা বোঝাচ্ছে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তা শেখাতে চাইবে এবং এই ছাত্রছাত্রীরা যেসব কোম্পানিতে কাজ করবে, তারাও এসব বুঝবে? আমরা কি এমন এক পরিবেশে কাজ করতে পারব, যেন কাজকে ভালোবাসতে পারি এবং তা উপভোগ করতে পারি?
গবেষকরা বলেন, সুখ এমন এক মানসিক অবস্থা যা আমাদের খুশি মনে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে উৎসাহ দেয়। অনেক গবেষককে এও বলতে শুনেছি যে, সুখ এক ধরনের পরিক্রম, গন্তব্য নয়। সুখকে যখনই গন্তব্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তখনই তা মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের শিক্ষিত হওয়ার প্রক্রিয়াটিও তাই। শিক্ষা আমাদের কাছে একটি গন্তব্য হয়ে গেছে। পরিভ্রমণের মাধ্যমে জ্ঞানার্জনের কথা ভুলে গেছি। পরিভ্রমণেই রয়েছে খুশি মনে কাজের উৎসাহ। শিক্ষক এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে আমার সবিনয় অনুরোধ, ছাত্রছাত্রীদের শুধু পরীক্ষা ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার মাঝে আটকে না রেখে তাদের জ্ঞানের পরিধিটা বাড়িয়ে দিন। শিক্ষা যেন জ্ঞানার্জনের বাহন হয়। তাদের মধ্যে জ্ঞানার্জনের মোহ তৈরি করুন, তাহলে জীবনে তারা সব পাবে। অর্থও পাবে, সুখও পাবে।
গল্পকার; যোগাযোগ পেশায় নিয়োজিত

বিষয় : সমাজ