সদ্ব্যবহার হোক থোক বরাদ্দের

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

সংসদ সদস্যদের অনুকূলে দেওয়া থোক বরাদ্দ সদ্ব্যবহারের বদলে বরং দুর্নীতি ও স্বজনতোষণে ব্যবহার হচ্ছে- টিআইবির গবেষণায় উঠে আসা এমন তথ্যে আমরা উদ্বিগ্ন হলেও বিস্মিত নই। বস্তুত দেড় দশক আগে যখন সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নে থোক বরাদ্দের প্রচলন হয়, তখনই
নাগরিক সমাজ থেকে এর এমন পরিণতির ব্যাপারে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। অস্বীকার করা যাবে না যে, তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকার এই বরাদ্দ থোক বলা হলেও তা সংসদ সদস্যদের জন্য নগদ খরচের তহবিল নয়। আইআরআইডিপি বা গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প নামে একটি কাঠামোর মধ্য দিয়ে এই অর্থ ব্যবহার হয়। কিন্তু দেখা গেছে, এর আওতাধীন প্রকল্পগুলো
এমনভাবে সম্পন্ন করা হয়, যেখানে নয়ছয়ের সুযোগ থেকে যায়। এ ধরনের প্রকল্পের উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভেও আমরা একাধিকবার থোক বরাদ্দের সদ্ব্যবহারের তাগিদ দিয়েছি। বুধবার প্রকাশিত টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনে এর প্রয়োজনীয়তাই আরেকবার স্পষ্ট হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতাসীন বর্তমান সরকারের আমলে দুই দফায় থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রথমবার তিন কোটি করে এবং দ্বিতীয়বার পাঁচ কোটি করে। টিআইবির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, আইআরআইডিপি প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকল্পের দুইবারই বরাদ্দ অর্থের ৬০ ভাগের বেশি ব্যয় হয়েছে রাস্তাঘাট নির্মাণে।
গ্রামীণ জনপদে তাৎক্ষণিক রাস্তাঘাট মেরামতের প্রয়োজনীয়তা আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু দেখা গেছে, একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার 'সাব-কন্ট্রাক্ট' দিয়েছে। সোজা কথায়, আরেকজনের কাছে 'বিক্রি করে' দিয়েছে। যে কারণে 'উপ-ঠিকা' সম্পর্কিত কোনো তথ্য নথিপত্রে থাকে না। প্রশ্ন হচ্ছে,
কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তাহলে কাকে ধরা হবে? এমনকি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রকল্প বাস্তবায়নে তথ্য-ফলক থাকার যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তাও প্রতিপালিত হচ্ছে না এসব ক্ষেত্রে। অনুমান করা কঠিন নয় যে, নয়ছয় লুকায়িত রাখার উদ্দেশ্যেই এমন অস্পস্টতা।
এমনকি একটি অংশে কারা প্রকল্প তদারকি বা পর্যবেক্ষণে যুক্ত ছিল, সেই তথ্যও নেই। বিষয়টি যে নিছক 'রাজনৈতিক' নয়, ৭৬ শতাংশ প্রকল্প বা কর্মসূচির পর্যবেক্ষণে পঁচাশি ভাগের বেশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ জড়িত থাকায় তা প্রমাণ হয়। আমরা আশঙ্কা করি, সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত থোক বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে রাজনীতিক, ঠিকাদার ও কর্মকর্তাদের একটি চক্র গড়ে উঠেছে। এতে করে থোক বরাদ্দের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। আমরা মনে করি, থোক বরাদ্দের ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এক্ষেত্রে সংসদ সদস্যদের সদিচ্ছা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে- বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঘাটে ঘাটে 'খরচ' করার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার অবসান না হলে ঠিকাদারদের পক্ষেও বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহার কঠিন। আমরা টিআইবির গবেষণা প্রতিবেদনের সুপারিশের সঙ্গে একমত যে,
থোক বরাদ্দের আওতাধীন প্রকল্পগুলোর পৃথক মূল্যায়ন হতে হবে। প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই করাও জরুরি। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের যুক্ত রাখলে কাজের গতি ও মান নিশ্চয়ই বাড়বে। বিশেষত প্রকল্প ও কর্মসূচিগুলোর তথ্য-ফলক থাকা খুবই জরুরি। তাতে করে জনসাধারণ যেমন তথ্য জানতে পারবে, তেমনই নয়ছয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারবে। আমরাও চাই থোক বরাদ্দ চালু  থাকুক, কিন্তু এর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নীতিগতভাবে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও রাষ্ট্রীয় অর্থঘনিষ্ঠ উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের অনিয়ম ও স্বজনতোষণের কারণে ভেস্তে যেতে পারে না।

বিষয় : সদ্ব্যবহার