সুশাসন

যার কাজ তাকে করতে দেওয়া সমীচীন

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবদুল মান্নান

বাংলাদেশে যেসব মন্ত্রণালয় আছে তার মধ্যে অন্যতম দুটি মন্ত্রণালয় হচ্ছে স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র। দুটো ভিন্ন ভিন্ন এবং প্রচলিত অর্থে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান কিছুটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপরে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন চলাফেরা করেন, তার নিরাপত্তা প্রটোকল মনে হয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিধি পৃথক। সব মন্ত্রণালয় মিলে ক্যাবিনেট এবং তার প্রধান প্রধানমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অন্য সব মন্ত্রণালয়ের চেয়ে পৃথক; কারণ তারা জনগণের নিরাপত্তা বিধানে কর্তব্যরত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় চার-পাঁচ মাস ধরে, বিশেষ করে বাংলাদেশে করোনার কারণে গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে এবং বলা যেতে পারে সব নেতিবাচক কারণে। শুরুর দিকে করোনা মোকাবিলায় তাদের ব্যর্থতা, স্বাস্থ্য খাতে লাগামহীন দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়া- সব মিলিয়ে মানুষের মনে ধারণা হয়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন অথর্ব মন্ত্রণালয় বুঝি আর কখনও ছিল না। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাতারাতি দেশে বিশেষ করে বৃহত্তর ঢাকায় গড়ে উঠে কিছু বেসরকারি হাসপাতাল আর ডায়াগনস্টিক ক্লিনিক, যাদের কাজ হচ্ছে করোনা টেস্টের নামে মানুষকে ঠকিয়ে অর্থ উপার্জন।
বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই র‌্যাবের সহযোগিতায় এসব ডায়াগনস্টিক সেন্টার অথবা বেসরকারি হাসপাতাল, ভেজাল মিশ্রিত ওষুধ ও কারখানা এবং বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। কখনও কখনও র‌্যাব নিজে ম্যাজিস্ট্রেটের সহায়তায় এসব দুর্নীতি বা অপকর্ম দমনে উদ্যোগ নিয়েছে। এসব অভিযানের ফলে এমনও দেখা গেছে, ঢাকা শহরে দু-একটি বেশ নামকরা ডায়াগনস্টিক ক্লিনিক দুই বছরের পুরোনো রিএজেন্ট দিয়ে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রিপোর্ট দেয় এবং সে রিপোর্টের ভিত্তিতে রোগীর চিকিৎসা চলে এবং বলা বাহুল্য, তা হয় ভুল চিকিৎসা, যা সাধারণত রোগী জানতে পারে না।
এমন একটি অবস্থার মধ্যে মানুষের মধ্যে একটু স্বস্তি ফিরেছিল, যখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা যারা নকল ওষুধ তৈরি করে বা বিক্রি করে, যেসব ডায়াগনস্টিক ক্লিনিক মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু করেছে। এ ব্যবস্থার কারণে আমরা দেখেছি, যেসব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ক্লিনিক মানুষের সঙ্গে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করছিল, দুর্নীতি করছিল তাদের সব কর্মকাণ্ড জনসমক্ষে উদ্‌ঘাটিত হতে। উদ্‌ঘাটিত হলো রিজেন্ট হাসপাতালের অপকর্ম আর তার বাটপারখ্যাত মালিক সাহেদ আর জেকেজি নামক ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকের ডা. সাবরিনা আকতার ও তার স্বামী আরিফের যত সব কুকীর্তি। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হলো, সিল করে দেওয়া হলো হাসপাতাল। এর মধ্যে হঠাৎ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, যার নিজের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলের অনেক অভিযোগ, যাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়, যাদের নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিদিন সোচ্চার থাকে; দেখা গেল তাদের একটি অনুরোধপত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বলা হলো, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অভিযান চালানো থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত যেন বিরত থাকে। পত্রে বলা হয়, কোনো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালানোর প্রয়োজন মনে হলে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে চিকিৎসা শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এটি একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় হিসেবে তার দায়িত্ব পালন করছে। তাদের অনেক দায়িত্বের মধ্যে একটি দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের নিরাপত্তা বিধান করা। প্রয়োজনে তারা অন্য মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নিতে পারে, কিন্তু দায়িত্ব পালনে অন্য আর একটি মন্ত্রণালয় খবরদারি করবে, তা একটি নজিরবিহীন ঘটনা।

 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে মোটামুটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটু অস্বস্তিতে ছিল এটা ঠিক। কারণ যেসব প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমাণ আদালত অনিয়ম পেয়েছেন, তার কয়েকটির সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো কোনো কর্মকর্তার সম্পর্ক ছিল। অনেক বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকের মালিক, যাদের প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা সেবার নামে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছিল তারাও আতঙ্কে ছিল। তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের অভিযান বন্ধ করার জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। বোঝা গেল তাদের এই চেষ্টা  বিফলে যায়নি, তাদের সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছে খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যেভাবে অভিযান পরিচালনা করতে বলেছে, বলা বাহুল্য, সেভাবে কোনো অভিযান সফল হবে না। কারণ অভিযানের খবর আগেই টার্গেট হাসপাতালে বা ক্লিনিকে চলে যাবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, যেভাবে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেন তাতে নাকি চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক ও হাসপাতালগুলোয় আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে এবং এতে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। বাস্তবতা হচ্ছে, র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত এযাবৎ এমন কোনো প্রতিষ্ঠানে অভিযান পরিচালনা করেননি, যেখানে সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছিল। আর নির্দেশ যদি দিতেই হয় তাহলে তা দেওয়ার একমাত্র ক্ষমতা সরকারের, অন্য কারও নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সরকারের অধীনে একটি মন্ত্রণালয় মাত্র। তাদের নিজস্ব দায়দায়িত্ব নির্ধারিত আছে, আর তারা সেটাই পালন করবে বলে সবাই প্রত্যাশা করে। এখন এই ধরনের একটি অনুরোধ বা এ ধরনের একটি পত্র দিলে মানুষের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন উঁকি দিতে থাকবে। তাহলে কি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যারা দুর্নীতি করছেন বা অন্যকে করার সুযোগ দিচ্ছেন, তাদের রক্ষা করার চেষ্টা চলছে? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কি একটি সমান্তরাল সরকার চালু করল? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কথায় যদি অভিযান বন্ধ হয় তাহলে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আগে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেবে? অথবা চাল মজুতকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার আগে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের? এটি একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশের নিয়ম হতে পারে না।
সাধারণ মানুষ মনে করে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এমন একটি তুঘলকি কাণ্ড স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি চালু রাখার একটি অবাধ লাইসেন্স দেওয়া। এই যে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করা হলো, সে অভিযান সফল হয়েছিল। কারণ তা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে না জানিয়ে করা হয়েছিল। এই হাসপাতালের সঙ্গে কভিড রোগী চিকিৎসার জন্য যখন চুক্তি করা হয় সেখানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মন্ত্রীসহ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাহলে কীভাবে বলা যাবে যে, তাদের জানিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান পরিচালনা করলে সেটি সফল হতো? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের করা উচিত এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। কোনো পক্ষেরই এখানে বিভ্রান্তিমূলক অনুরোধ, পরামর্শ বা নির্দেশ দেওয়া উচিত নয়। তেমনটি প্রয়োজন হলে তা সরকার দেবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ না করে তাদের স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে দেওয়াটাই প্রত্যাশিত। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ঘিরে মানুষের মনে যত ধরনের সন্দেহ আর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে, তা দূর করাই হবে তাদের প্রধান কর্তব্য আর তা সম্ভব তাদের কর্ম দ্বারা, অন্য আর একটি মন্ত্রণালয়কে অযাচিত পত্র লিখে নয়।
বিশ্নেষক ও গবেষক

বিষয় : সুশাসন