মুজিববর্ষ

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা শেখ হাসিনার হাতে

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যাপক ড. মুনাজ আহমেদ নূর

রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, 'ঐ মহামানব আসে'। বাঙালির জাতীয় জীবনে মহামানব হিসেবে এসেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি এসে আমাদের উপহার দিয়েছেন স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশ, একটি জাতি। এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরের স্বপ্ন দেখেছিলেন (যা এখন ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হয়েছে)। তাই পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরেই দ্রুত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠন শুরু করেন এবং সফলভাবে অর্থনৈতিক এবং অর্থনীতির বাইরের উভয় খাতের গভীরে প্রোথিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন।
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে দেখলেন গুদামে খাদ্য নেই, মাঠে ফসল নেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ শূন্য। সড়ক, রেল ও নৌপথ বিচ্ছিন্ন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পরাজয় নিশ্চিত জেনে সম্ভাব্য সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু জোট নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশের স্বীকৃতি আদায় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করার দিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরে জাতির পিতা বাংলাদেশকে ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘসহ ২৭টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করিয়েছেন।
মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পরিবহন ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে। এমন একটি পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু পুনর্গঠন কাজে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বন্দরের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা, নৌপরিবহন উন্নয়ন এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের উদ্যোগ নেন এবং বেসামরিক বিমান চলাচল শুরুর ওপর গুরুত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধে বিদ্যুৎ-ব্যবস্থাও ভয়ংকর রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু ট্রান্সমিশন ও বিতরণ লাইন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কাজে জোর দেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় কৃষি খাতে যে ক্ষয়ক্ষতি হয় প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী তার পরিমাণ সেই সময়ের টাকায় প্রায় ৩৭৯ কোটি ৫ লাখ। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে যাতে একজন মানুষও না খেয়ে মারা না যায়, সেজন্য ব্যবস্থা নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। খাদ্য উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি ভর্তুকি দিয়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল। এই প্রতিষ্ঠান জাতীয় প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রেখে কৃষিবিষয়ক ইনস্টিটিউট এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে কৃষিসংক্রান্ত গবেষণা, পরিকল্পনা, সমন্বয়, পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন করে যাচ্ছে।
বঙ্গবন্ধু পরিবার পরিকল্পনায় জোর দিয়েছিলেন। দেশের ১২ থানায় জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির পাইলটিং শুরু করেছিলেন তিনি। আমরা এখন ৭ শতাংশের ওপরে প্রবৃদ্ধি নিয়ে কথা বলি। অথচ বঙ্গবন্ধুর সময়ই বাংলাদেশে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। তিনি তখনই বলতেন, বাংলাদেশ চিরদিন অনুন্নত থাকতে পারে না। অচিরেই উন্নত দেশের কাতারে যাবে। তিনি এই জনসংখ্যাকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার পরিকল্পনাও নিয়েছিলেন। সেজন্য তিনি জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন গঠন করেন। ১৯৭০ সালেই তিনি বলেছিলেন, আমাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের মেডিকেল কলেজ এবং মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে হবে, কারিগরি শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। বঙ্গবন্ধুকন্যাও আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করার জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসলীলায় শিল্পক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৪০ কোটি টাকার বেশি। এই ক্ষতি পূরণের জন্য জাতির পিতা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাঁচামাল ও খুচরা যন্ত্রপাতি জোগানের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেন। তিনি ১৯৭২-৭৩ সালের লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেন ৫৭৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তিনি ফ্যাক্টরি, মেশিনপত্র, গুদাম প্রভৃতি মেরামতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঋণদান, মূলধন বিনিয়োগে 'ইকুইটি' সহযোগিতা, কাঁচামাল ক্রয়, কারখানা চালু রাখার জন্য ব্যয় সংকুলানের জন্য চলতি মূলধন বাবদ স্বল্পমেয়াদি ঋণ, আমদানিকৃত ও স্থানীয় কাঁচামাল নিয়মিত সরবরাহ, সেক্টরভিত্তিক সংস্থাগুলোর অধীন কলকারখানা ও উৎপাদন যন্ত্রগুলো সক্রিয় করার ব্যবস্থা করেন।
বিজ্ঞানবিষয়ক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। আণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি, শিক্ষা, শিল্পসহ জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে সহায়তা করার কথা ভেবে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে এ-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেন। ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠান বর্তমানে দেশের বৃহত্তম বিজ্ঞান গবেষণা প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণার উন্নয়ন, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রয়োগ এবং বৈজ্ঞানিক আবিস্কার ও শিল্পপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭৩ সালে 'বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর) গঠন করেন। শুরুতেই ঢাকায় কেন্দ্রীয় গবেষণাসহ চট্টগ্রাম ও রাজশাহীতে আঞ্চলিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করেন।
মাত্র সাড়ে তিন বছরে এ দেশের প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে বিদ্যুৎ, কৃষি ও সমবায়, শিল্প ও বিজ্ঞান, গৃহনির্মাণ, অর্থনীতি ও বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্প ব্যবস্থাপনা জাতীয়করণ, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, ভূমি ব্যবস্থাপনাসহ নানান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছিলেন তিনি। আজও বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো কাজ করতে গেলে আমরা দেখতে পাচ্ছি হয় প্রতিষ্ঠানটি জাতির পিতা নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন, না হয় এই প্রতিষ্ঠানটি যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে, তার শুরুটা জাতির পিতা করে দিয়ে গেছেন। তিনি অসংখ্য নীতি, পরিকল্পনা ও আইনের উদ্যোক্তা।
বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব ক্ষেত্রে একটি শক্ত নীতিমালা, পরিকল্পনা, অবকাঠামো রেখে গেছেন। ১৯৭২-এর ৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু তৎকালীন আইপিজিএমআরে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) কেন্দ্রীয় রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগ ও নতুন মহিলা ওয়ার্ড উদ্বোধন করেন। অন্যান্য সব ক্ষেত্রের মতো যুদ্ধের সময় সরকারি ও বেসরকারি আবাস ও সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এই সমস্যা সমাধানে বঙ্গবন্ধু পুনর্গঠন কাজকে ১০টি সেক্টরে ভাগ করেন এবং প্রত্যেক সেক্টরের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেন।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি তিনি যখন এই দেশের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিজার্ভ ছিল শূন্য। এত কিছুর পরও এত অল্প সময়ের মধ্যে তিনি ৭৮৬ কোটি টাকার বাজেট থেকে ১০৮৪.৩৭ কোটি টাকার বাজেট প্রদান করেছেন। এত অল্প সময়ে বাংলাদেশের এত উন্নতি দেখে দেশি এবং আন্তর্জাতিক চক্রান্ত শুরু হয় এবং দেশের ভেতরে এক ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারলেন যে, এই অবস্থা চলতে থাকলে বাংলাদেশকে তিনি যে লক্ষ্যে নিয়ে যেতে চান, সেই লক্ষ্যে নিয়ে যেতে অনেক সময় লেগে যাবে। তখন তিনি ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা করলেন। এই দ্বিতীয় বিপ্লবে তিনি চেয়েছিলেন দুর্নীতিমুক্ত সমাজ, কৃষি এবং শিল্পের উৎপাদন বৃদ্ধি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণকে একটি জনমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা উপহার দেওয়া।
বাংলাদেশ যেন সামনের দিকে এগিয়ে যেতে না পারে সেজন্য নরপিশাচরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের ২০ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। বস্তুত তারা চেয়েছিল এই আদর্শ যাতে বাস্তবায়িত না হয় এবং আদর্শের যাতে চিরতরে মৃত্যু ঘটে।
জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পাচ্ছি, জাতির পিতার সেই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ফলে আজ বাংলাদেশের জনসংখ্যা পাকিস্তানের চেয়ে কম। বঙ্গবন্ধুর খাদ্য উৎপাদন নীতি এখন বাস্তবায়ন করছেন শেখ হাসিনা। ফলে বাংলাদেশ এখন খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বঙ্গবন্ধুকন্যার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে জনমুখী একটি সরকার ব্যবস্থা। তার দক্ষ নেতৃত্বে এখন আমরা বৈশ্বিক দুর্নীতির সূচকে অনেক পেছনে আছি। প্রধানমন্ত্রী সব সময় সরকারের সংশ্নিষ্ট সবাইকে জনগণের জন্য কাজ করার কথা বলছেন। এসব কারণেই আজ করোনার মতো দুর্যোগের মধ্যেও বাংলাদেশ শক্ত অর্থনীতির ভিত দেখাতে পেরেছে। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ভেঙে পড়ছে, সেখানে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি এখনও ৫ শতাংশের ওপরে। বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা- দেশ ও জাতির জন্য বড় প্রাপ্তি। বঙ্গবন্ধু যদি আজ বেঁচে থাকতেন তাহলে আমরা অনেক আগেই উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশে পৌঁছে যেতাম। কিন্তু দেরিতে হলেও তার সুযোগ্য কন্যা জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লব চালু রেখে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে নিয়ে যাবেন- এই আমাদের প্রত্যাশা।
উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ডিজিটাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ

বিষয় : মুজিববর্ষ