রোহিঙ্গা সংকট

চোরাবালি নয়, পা রাখুন পাথরে

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

করোনা পরিস্থিতিতে সবকিছু যখন থমকে গেছে, তখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সচল হবে- এ দুরাশা আমরা করি না। কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতেও যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাবিরোধী নির্যাতন চলতে থাকবে- এমন আশঙ্কাও আমরা করিনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেটাই ঘটছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে প্রত্যাবর্তন দূরে থাক; সীমান্তের ওপাশে এই জনগোষ্ঠীর যেসব সদস্য মাটি কামড়ে পড়ে ছিল, তাদেরও অস্তিত্ব সংকট দেখা দিয়েছে। আমরা গভীর উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মিয়ানমার সরকার ইতিবাচক কথা বললেও মাঠ পর্যায়ে তারা আগের নিপীড়নমূলক অবস্থানই বজায় রেখেছে। বুধবার সমকালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বরং উঠে এসেছে, পরিস্থিতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০১৭ সালের চেয়েও কঠিন। মহামারি পরিস্থিতিতে এখন সেখানে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্রও উঠে আসছে না সংবাদমাধ্যমে। এই সম্পাদকীয় স্তম্ভে আমরা আগেও মিয়ানমারের দ্বিমুখী চরিত্র সম্পর্কে সাবধান করে দিয়েছি। এমনকি চলতি বছরের জানুয়ারিতে যখন আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে মিয়ানমার দৃশ্যত পরাজিত হয়েছিল, তখনও আমরা সতর্ক থাকতে বলেছিলাম। আলোচ্য প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, মিয়ানমার এক 'চোরাবালি কূটনীতি' গ্রহণ করেছে। যেখানে রোহিঙ্গা ইস্যুর ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের বদলে তারা পুরো ইস্যুই ছলচাতুরীর চোরাবালিতে ডুবিয়ে দিতে চায়। আমরা মনে করি, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অবস্থান নিতে হবে শক্ত পাথরে। মিয়ানমারের চোরাবালিতে পা রাখার কোনো অবকাশ নেই।

স্বীকার করতে হবে, আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালত প্রদত্ত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ছিল। রায়পরবর্তী সময়ে মিয়ানমার এর আদেশ প্রতিপালনে 'সদিচ্ছা' দেখাতেও চেয়েছে। কিন্তু গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি সেই তিমিরেই। আমরা মনে করি, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া প্রতিবেশী দেশটির সম্বিত ফিরবে না। একমাত্র নিরাপত্তা পরিষদই পারে রায় মানতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে। কিন্তু গত তিন বছরে যতবারই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে, ততবারই ভেটো প্রদান করেছে দুই স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া। সন্দেহ নেই, চীন বাংলাদেশেরও ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র। বেইজিংয়ের দূতিয়ালিতেই ২০১৭ সালের নভেম্বরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন নিয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হয়েছিল। বাস্তবে ওই প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া কখনোই কার্যকর হয়নি মূলত মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাবে। আমরা জানি, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ এখনও চীনের ওপর আস্থা হারায়নি। অপরদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে নীতি ও আদর্শিক দিক থেকে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ অনেক ঘনিষ্ঠ ছিল; আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। বর্তমান রাশিয়া সোভিয়েত আমলের ভূমিকায় থাকবে না, বলা বাহুল্য।

কিন্তু দেশটির সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা বিবেচনায় রোহিঙ্গা সংকটে যে কূটনৈতিক ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল; দুর্ভাগ্যবশত সেটা দেখা যায়নি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে আমরা দেখতে চাইব, বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক মনোযোগ নিরাপত্তা পরিষদেই নিবদ্ধ করবে। চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এ ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে। বিশেষত চীন যখন তার এশীয় হিসাবনিকাশে বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার মনে করছে, তখন বাংলাদেশের দিক থেকে রোহিঙ্গা ইস্যুর সমাধানে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে আসিয়ান এবং ওআইসিভুক্ত যেসব দেশ রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে উত্থাপনে নেপথ্য ভূমিকা রেখেছিল, তাদেরও সক্রিয় করতে হবে। বাংলাদেশ ছাড়াও ওই দেশগুলোর সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার নিবিড় ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। আমরা নিশ্চয়ই চাই রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বোঝাপড়া অব্যাহত থাকুক। কিন্তু মনে রাখতে হবে- মিয়ানমারের চোরাবালি কূটনীতিতে পা দিয়ে কখনোই কার্যকর সমাধান আসবে না। ঢাকার উচিত হবে যথাসম্ভব কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ অব্যাহত রেখেই সমাধান খুঁজতে হবে বহুপক্ষীয় বোঝাপড়ার মাধ্যমে। করোনা পরিস্থিতিতেও এ ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সামান্য সুযোগ নেই। কারণ করোনা পরিস্থিতিই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, সামনের দিনগুলো কতটা কঠিন হতে চলেছে। বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বোঝা কাঁধে নিয়ে সেই কঠিন সময় পাড়ি দেওয়া কঠিনতর হয়ে উঠবে।