সমকালীন প্রসঙ্গ

কৃষকের স্বার্থ ও কাঁচা পাটের মূল্য

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. জাহাঙ্গীর আলম

পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। বর্তমানে দেশে পাটচাষির সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। জিডিপিতে পাটের অবদান ০.২৫ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১.৩ শতাংশ। মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১২ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে পাট উৎপাদনের কাজে। পাট শিল্পে জড়িত ১ লাখ ৬২ হাজার শ্রমিক। এর মধ্যে সরকারি সংস্থা বিজেএমসি ১৫ শতাংশ এবং বেসরকারি সংস্থা বিজেএসএ ও বিজেএমইএ মিলে ৮৫ শতাংশ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করছে। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৩ শতাংশ উপার্জিত হয় পাট ও পাটপণ্য রপ্তানি থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটি এখন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে। দেশের কৃষকদের জন্য নগদ অর্থের সংস্থান করে যাচ্ছে পাট। মহাজন বা ব্যাংক ঋণ পরিশোধ, ছেলেমেয়ের পড়ার খরচ, সন্তানের বিয়ে, বউয়ের শাড়ি-গহনা, শহরে জমি কেনা সবই হয় চাষিদের পাট বিক্রির অর্থ দিয়ে। গ্রামে ও শহরে আদিকাল থেকে পাটের জমজমাট ব্যবসা করছেন অনেক মানুষ। দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে বাজার, পাট গুদাম, পাটকল ও বাণিজ্যকেন্দ্র। যাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে অনেকের। তাছাড়া এই চরম জ্বালানি সংকটের যুগে গ্রামবাংলার রান্নার কাজে চমৎকার এক পুনরুৎপাদনক্ষম জ্বালানি হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে পাটকাঠি। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের কাঁচা পাট ও পাটজাত পণ্য যাচ্ছে যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, রাশিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারত, ব্রাজিল, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ অনেক দেশে। তাতে আয় হচ্ছে অনেক বৈদেশিক মুদ্রার। সম্প্রসারিত হচ্ছে আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক। পাটকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে এ দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। পাকিস্তান আমল থেকে অদ্যাবধি এখানকার রাজনীতির অঙ্গনও মুখর করে রেখেছে এ দেশের পাট। পাটকে ঘিরে অতীতে অনেক স্বপ্ন দেখেছে এ দেশের মানুষ। হয়তো  দেখবে ভবিষ্যতেও।

পাট গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অনেক সাফল্য আছে। সম্প্রতি সাদা পাটের ৬টি উচ্চফলনশীল জাত, তোষা পাটের ৮টি, কেনাফের ৪টি ও মেস্তার ৩টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করা হয়েছে। এগুলোর সম্প্রসারণ চলছে মাঠ পর্যায়ে। বর্তমানে সাদা ও তোষা পাটের গড় ফলন পৃথিবীর পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বেশি। গত অর্ধশতাব্দী ধরে এ দেশে পাটের ফলন বেড়েছে উল্লেখযোগ্য মাত্রায়। এর পেছনে দেশের কৃষিবিজ্ঞানী ও পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের অবদান অনস্বীকার্য। সম্প্রতি পাটের বংশগতি বিন্যাস (জেনম সিকোয়েন্স) উদ্ভাবিত হয়েছে। তাতে রোগ ও পোকা প্রতিরোধক আরও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনের সম্ভাবনা উন্মোচিত হয়েছে। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও আবহাওয়া পরিবর্তনের ফলে এ দেশে কৃষি পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এখন আমাদের এমন পাটের জাত উদ্ভাবন করতে হবে, যা খরা, লবণাক্ততা ও শীতসহিষ্ণু। সারাবছর উৎপাদন উপযোগী পাটের জাত উদ্ভাবন এখন আমাদের ভাবনায় নিয়ে আসতে হবে। গবেষণার মাঠে নতুন উদ্ভাবিত পাট জাতের ফলন বেশি, কৃষকের মাঠে তা কম। উদাহরণস্বরূপ, বর্তমানে উদ্ভাবিত পাট জাতগুলোর গড় ফলন সক্ষমতা ৩.৫ টন প্রতি হেক্টরে। কৃষকের মাঠে তার প্রকৃত ফলন প্রায় ২ টন। অর্থাৎ গবেষণার মাঠে ও কৃষকের মাঠে প্রাপ্ত উৎপাদনে বড় ধরনের ফারাক বিদ্যমান। এটি কমাতে হবে। এ জন্য গবেষণা ও সম্প্রসারণ কর্মীদের মধ্যে জোরালো সমন্বয় প্রয়োজন। পাট গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।

বিশ্বে (২০১৮ সালের তথ্য) পাটের মোট উৎপাদন ৩.৯ মিলিয়ন টন। ২০০৭-১৮ সালের মধ্যে ১১ বছরে গড়ে প্রতি বছরে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ১.৮ শতাংশ হারে। ওই বছর ভারতের উৎপাদন ছিল ২.১ মিলিয়ন টন এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ছিল ১.৬ মিলিয়ন টন বা প্রায় ৮৯ লাখ বেল। ভারত ও বাংলাদেশ মিলে বিশ্বের ৯৩ শতাংশ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। ২০১৮ সাল নাগাদ ১১ বছরে বাংলাদেশের পাট উৎপাদন ৫.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৪.৪ শতাংশ  হারে। হেক্টরপ্রতি পাটের ফলনও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে এখনও বাংলাদেশের আধিপত্য বিরাজমান। বিশ্বের মোট পাট রপ্তানির ৭৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ। তা ছাড়া ভারত ৪.৮ শতাংশ এবং তাঞ্জানিয়া, বেলজিয়াম, কেনিয়া ও মালয়েশিয়া মিলে ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কাঁচা পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শরিকানা ৯৭ শতাংশ এবং পাটজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশেরও বেশি। বাংলাদেশি কাঁচা পাট প্রধানত রপ্তানি করা হয় ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইউরোপ, আইভরি কোস্ট, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য দেশে। পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করা হয় ইউরোপ, তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া, মিসর, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, জাপান, সুদান, ঘানা, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশে। বর্তমানে পাটের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে পৃথিবীর আরও অনেক দেশে। তার কারণ পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী এখন নিরুৎসাহিত করছেন পরিবেশবাদীরা। পলিথিন ও সিনথেটিক দ্রব্য পচনশীল নয়। পরিবেশের জন্য এগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে পাট পরিবেশবান্ধব। তাই এর চাহিদা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। ২০১৮ সালে প্রতি টন পাটের রপ্তানি মূল্য ছিল ৭৩৪ মার্কিন ডলার। ২০০৭ সাল থেকে পরবর্তী ১১ বছরে তা প্রতি বছর গড়ে ৫.৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে আগামীতেও। ইতোমধ্যে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে পাটের থলে ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কেনিয়া ও রুয়ান্ডায় পাটের বস্তার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপে পাটপণ্যের ব্যবহার উৎসাহিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের ৭৪৩তম সাধারণ পরিষদে দ্বিতীয় কমিটিতে 'প্রাকৃতিক তন্তুর উদ্জ্জি ও টেকসই উন্নয়ন' শিরোনামে পাটসহ প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহার বিষয়ক একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা ও মূল্য বৃদ্ধির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারেও পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে সরকার দেশে উৎপাদিত ১৯টি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ, থলে, বস্তা ব্যবহারের নির্দেশ প্রদান করে আইন প্রণয়ন করেছে। এ আইনের পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হলে দেশের অভ্যন্তরে পাটের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। বর্তমানে সারাবিশ্বে পাটের ব্যবহার প্রতি ১০০০ জনে ৫১২ কেজি। ভারতে তা ১ হাজার ৫৫২ কেজি, পাকিস্তানে ৪৫৩ কেজি ও চীনে ৫৪ কেজি। বাংলাদেশে বার্ষিক ব্যবহার প্রতি ১০০০ জনে ৮ হাজার ১৫৪ কেজি। ভবিষ্যতে তা আরও বাড়বে। এই বিপুল পরিমাণ চাহিদা মেটানোর জন্য পাটের উৎপাদন বাড়ানো, পাটপণ্য উৎপাদনে বৈচিত্র্যকরণ নিশ্চিতকরণ এবং পণ্যের মান বাড়াতে হবে। এ জন্য পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন দরকার। শ্রমিকদেরও দক্ষতা বাড়ানো দরকার।

সরকারি পাটকলগুলো বন্ধের প্রক্রিয়া চলাকালে কাঁচা পাট উঠতে শুরু করেছে বাজারে। এখন পাট কাটা, জাগ দেওয়া, আঁশ ছাড়ানো, শুকানো এবং পাট বিপণনের সময়। শুরুতে বাজারে মণপ্রতি পাটের দর ছিল ২০০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা। এখন তা নেমে এসেছে এক হাজার ৮০০ থেকে এক হাজার ৯০০ টাকায়। পাট বিক্রি পুরোদমে শুরু হলে এ মূল্য আরও কমে আসবে। এবার পাটের উৎপাদন খরচ মণপ্রতি এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৬০০ টাকা। দেশের অঞ্চল ও পাটের প্রকারভেদে পাটের ক্রয়মূল্য ও উৎপাদন খরচের পার্থক্য আছে। তবে মোটামুটি হিসেবে এখনও পাট কৃষকদের জন্য লাভজনক। বিজেএমসি বাজারে না এলে এবং একচেটিয়াভাবে ব্যক্তি খাতের মিলগুলো পাট ক্রয় করলে কৃষক পাটের ন্যায্যমূল্য নাও পেতে পারেন। তাদের জন্য কী বিধান করেছে সরকার?

কাঁচা পাটের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে এর ইউনিটপ্রতি মূল্য নির্ধারণের সুযোগ আছে। ভারতে তা উৎপাদন মৌসুম শুরুতেই ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশে ২০১৭ সালে প্রণীত জুট অ্যাক্ট এবং পরে প্রস্তুতকৃত পাট নীতিতে পাটের সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণের কথা বলা আছে। এর বাস্তবায়ন দরকার। এবার পাটের ইউনিটপ্রতি উৎপাদন হবে কম। মাঘ মাসে বৃষ্টির দেখা মেলেনি দেশের অনেক অঞ্চলে। জমিতে জো এসেছে বিলম্বে। কৃষক পাট বুনেছে দেরি করে। তদুপরি বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাঠে দাঁড়ানো পাট। তাতে বিঘাপ্রতি পাটের ফলন ও লাভ কম হবে। তার ওপর কাঁচা পাটের বাজারমূল্য হ্রাস পেলে কৃষকদের লোকসান গুনতে হবে। এ করোনাকালে আর্থিক সংকটে পড়বেন কৃষক। এ পরিস্থিতিতে কৃষক যাতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন তার বিধান ও পাটের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা দরকার।

কৃষি অর্থনীতিবিদ