স্মরণ

সাংবাদিকতার অভিভাবক ও শিক্ষক

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক

প্রবীণ সাংবাদিক ও সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার একজন নিবেদিতপ্রাণ, দেশপ্রেমিক ও উচ্চ মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম সারওয়ার শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন এবং পাঁচ দশকেরও অধিক সময় তিনি বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় শুধু নেতৃত্বই দেননি বরং সাংবাদিকতায় নানা মাত্রা সংযোজন করেছেন। তিনি একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রছাত্রীসহ সাধারণ মানুষের মনোজগৎ সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারতেন। আমরা সাধারণভাবে বলে থাকি- একটি সংবাদপত্র এমনভাবে সম্পাদিত ও প্রকাশিত হতে হবে, যেটি ৮ বছরের শিশু থেকে শুরু করে ৮০ বছরের প্রবীণের জন্য উপযোগী হয়। অর্থাৎ বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণের জন্য বিভিন্নধর্মী উপাদান ও অনুষঙ্গের সমন্বয় করে সংবাদপত্রকে সাজাতে হয়। সম্পাদক গোলাম সারওয়ার ভাই এ বিষয়টি অনুসরণ করে সংবাদপত্রের পাতাকে সেভাবে সাজিয়েছেন বলেই তিনি নিজেকে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সম্পাদকে রূপান্তরিত করেছিলেন। শিক্ষক ও সাংবাদিকের সমন্বয় ঘটেছিল সারওয়ার ভাইয়ের নিজস্ব মনোজগতে।

একজন বহুমাত্রিক মানুষ গোলাম সারওয়ার তাঁর সৃষ্টিশীল লেখনীর সঙ্গে সাংবাদিকতার ভারসাম্য রক্ষা করে বার্তা সম্পাদক হিসেবে সংবাদ শিরোনাম রচনায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছিলেন। দৈনিক ইত্তেফাকে একনাগাড়ে ২৭ বছর দায়িত্ব সম্পাদনকালে তিনি সংবাদ শিরোনাম রচনাকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কত অল্প শব্দে ব্যাপকভাবে সংবাদ প্রতিবেদনের মূল ধারণাটি শিরোনামে উপস্থাপন করা যায় এবং একই সঙ্গে সংবাদবোধটি যাতে কোনোভাবে ক্ষুণ্ণ না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে তিনি বছরের পর বছর যেভাবে বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে গেছেন, সেটি আমাদের দেশের সাংবাদিকতার জন্য এক অনন্য ইতিহাস। গোলাম সারওয়ার বাংলাদেশের সেরা বার্তা সম্পাদক বলে সাংবাদিকতা জগতে স্বীকৃত। তিনি দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দৈনিক সমকালের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত যুগান্তর ও সমকাল অল্প সময়ের মধ্যেই যে জনপ্রিয়তা অর্জন করে, সেটিও আমাদের সাংবাদিকতা জগতে বিরল দৃষ্টান্ত।

সারওয়ার ভাই ছিলেন নির্লোভ ও নিরহংকার একজন মানুষ। যখন তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে কখনও আমরা সারওয়ার ভাইকে সম্ভাষণ জানাতে পারিনি। তিনিই প্রথম 'কেমন আছেন' বলে এগিয়ে এসেছেন এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। তিনি যখন যে পত্রিকায় ছিলেন সেখানে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে সেই অফিস থেকে যোগাযোগ করা হতো। সমকালের বিভিন্ন অনুষ্ঠান, যেমন- প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, গোলটেবিল আলোচনা, সেমিনারসহ যে কোনো অনুষ্ঠানে অফিস থেকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। শুধু অফিসের জানানোর বিষয়টি সারওয়ার ভাইকে সন্তুষ্ট রাখতে পারেনি। অবধারিতভাবে অনুষ্ঠানের দু-একদিন আগে তিনি টেলিফোন করবেন এবং বলবেন- আরেফিন ভাই, আপনাকে অনুষ্ঠানে আসতেই হবে। তাঁর এমন আন্তরিকতা কখনও না মেনে পারা যায়নি। এটি আমাদের জীবনে মধুর স্মৃতি হয়ে আছে। একই সঙ্গে বলতে চাই, কষ্ট করে এত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা কেবল গোলাম সারওয়ারের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে। তিনি সত্যিকার অর্থেই মানুষকে ভালোবাসতেন, বন্ধুত্বকে গুরুত্ব দিতেন এবং একই সঙ্গে সবার ওপর আস্থা রাখতেন।

সম্পাদক গোলাম সারওয়ার সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রেখে যেমন বিভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তেমনি একজন ভালো সাংবাদিকের ভালোমানুষ হওয়ার বিষয়টি আমরা তাঁর জীবন থেকে শিখতে পারি। আসলে যে কোনো পেশায় ভালো করার পূর্বযোগ্যতা হলো ভালোমানুষ হওয়া। সে ক্ষেত্রে গোলাম সারওয়ারের দৃষ্টান্ত আমাদের সকলের জন্য অনুকরণীয়। তিনি দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে নতুন নতুন বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। তিনি রঙিন ঈদসংখ্যা বাজারে এনেছেন। তথ্যের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বিনোদন চাহিদা আছে এবং সেই চাহিদা পূরণও যে গুরুত্বপূর্ণ- গোলাম সারওয়ার তাঁর সাংবাদিকতা জীবনে বিনোদনমূলক পত্রিকা সম্পাদনা করে সেটি দেখিয়ে গেছেন। যে কারণে আমরা দেখি ইত্তেফাকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিনোদন পত্রিকা পূর্বাণী সম্পাদনা করেছেন। আমরা সাংবাদিকতাকে একের মাঝে তিন বলে আখ্যায়িত করি। অর্থাৎ সাংবাদিকতার মাধ্যমে তথ্যের চাহিদা পূরণ হয়, বিনোদনের চাহিদা পূরণ হয় এবং সাংবাদিকতার মাধ্যমে শিক্ষার ক্ষেত্রে মানুষকে সমৃদ্ধ করা হয়। এই তিনটির সমন্বয় করে গোলাম সারওয়ার সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

গোলাম সারওয়ার যে বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সেটাকে অকালমৃত্যুই বলব। কারণ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তাঁর বহু কিছু দেওয়ার ছিল। তিনি সেভাবেই নেতৃত্ব দিয়ে চলছিলেন। কিন্তু দুই বছর আগে আমরা আকস্মিকভাবে খবর পাই, তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। সঙ্গত কারণেই তাঁর এই মৃত্যু আমাদের কাছে অকালমৃত্যুই মনে হয়েছে। কারণ সাংবাদিকতা ও সমাজে তিনি নানা অবদান রেখেছেন। আরও কিছুদিন বেঁচে থাকলে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা, সমাজ ও সংস্কৃতি আরও নানাভাবে উপকৃত হতে পারত। কারণ তিনি শুধু সাংবাদিকতারই অভিভাবক ছিলেন না, বরং সমাজেরও অভিভাবক ছিলেন। তাঁর মতো অভিভাবকসম মানুষ যখন চলে যান তখন আমরা অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ি। গোলাম সারওয়ার বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাতিঘর হিসেবে কাজ করবেন। নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা তাঁর অবদান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের সেভাবে প্রস্তুত করবেন- সেটাই আমরা প্রত্যাশা করি।

গোলাম সারওয়ার তাঁর সৃষ্টিশীল লেখার জন্যও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। প্রখর সংবাদবোধসম্পন্ন এ মানুষটি তাঁর সৃষ্টিশীল লেখা এবং সাংবাদিকতা পেশার মধ্যে সমন্বয় করে যেভাবে এগিয়ে গেছেন তাতে আমরা বুঝতে পারি, সৃজনশীল রচনার প্রতি তাঁর কতটা আগ্রহ ছিল এবং তিনি কতটা পারঙ্গম ছিলেন সৃষ্টিশীল রচনায়। তাঁর ছড়ার গ্রন্থ 'রঙিন বেলুন' পাঠ করলে বোঝা যায়, তিনি বয়সের কারণে প্রবীণ হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু তাঁর মন-মানসিকতা ছিল শিশুসুলভ। এই শিশুসুলভ মন-মানসিকতার জন্যই তিনি সহজ-সরল জীবনযাপন করেছেন। শিশুদের মতো কৌতূহল নিয়ে সাংবাদিকতা করেছেন তিনি। সম্পাদনার টেবিলে তিনি কৌতূহল নিয়ে শিরোনাম রচনা করেন এবং পাঠক জানতে চায় এমন প্রশ্নের উত্তরগুলো প্রতিবেদনে যুক্ত করেন। গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে যাঁরা ঘনিষ্ঠ ছিলেন তাঁরা তাঁর অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জানতেন। তিনি দুঃখের ঘটনায় যেমন আপ্লুত হন, দেশের ভালো কোনো সংবাদে তেমনি আনন্দিত হন। ইতোপূর্বে বিভিন্ন আলোচনায় এ বিষয়গুলো উঠে এসেছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর মানসিক অবস্থার কথা তিনি বিভিন্ন সময় আলোচনা করেছেন। গোলাম সারওয়ারকে অল্প শব্দে আলোচনা করা যাবে না। তিনি আজীবন বেঁচে থাকবেন আমাদের অনুভূতিতে।

বাংলা ভাষা-সাহিত্যের কৃতী ছাত্র এবং দেশের একজন বিশিষ্ট প্রয়াত সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে রবীন্দ্রনাথের দুটি পঙ্‌ক্তির মাধ্যমে তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। 'একদিন এই দেখা হয়ে যাবে শেষ/পড়িবে নয়ন-'পরে অন্তিম নিমেষ।' সারওয়ার ভাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করব এবং তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের পরিচালিত করব। সেটিই হবে গোলাম সারওয়ারের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদন।

গণযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়