করোনা সংকট

ঔপনিবেশিক যুগে মহামারি ও আজকের জনস্বাস্থ্য

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শাহমান মৈশান

করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্ব আজ নাকাল, পর্যুদস্ত, বিধ্বস্ত। এই উপমহাদেশের অন্য প্রতিবেশীদের মতো বাংলাদেশেও প্রত্যেক মানুষ যেন বাঁচার লড়াইয়ে এক অদ্ভুত যুদ্ধযাত্রায় শামিল। এ পরিস্থিতিতে মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে রোগনিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা। অর্থাৎ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা। পরিস্থিতিটা এমন যে, ব্যক্তি একা ভালো থাকলে হচ্ছে না। সবাইকেই ভালো থাকতে হচ্ছে। নইলে কেউই ভালো থাকবে না। মহামারি ব্যাপারটাই এমন। একজন আক্রান্ত তো তার থেকে আরেকজন। এর পর আরও পাঁচজন, তো এর পর আরও দশজন।

জনস্বাস্থ্য, ছোঁয়াছে রোগ, সুস্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি সম্পর্কে আধুনিকতম ধারণা এ অঞ্চলে ইংরেজরাই আমদানি করেছিল; উপনিবেশ বিস্তার করে শক্ত হাতে শাসন-পেষণের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থেই। গরমের দেশে উপনিবেশ পত্তন করতে আসা ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর কাছে দিনে দিনে সংক্রামক ব্যাধি হয়ে উঠেছিল এক প্রধান আতঙ্ক। বিশেষ করে কলেরায় ভুগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যরা ব্যাপক হারে মারা যাচ্ছিল। ১৮১৭ সালে মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ডে স্বাধীনতাকামীদের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় কলেরায় মাত্র এক সপ্তাহে অন্তত ৭৬৪ জন কোম্পানি সৈন্য মারা যায়। এই কলেরা মহামারি ১৮২১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। ১৮১৭ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত কোম্পানির সৈন্য ও অফিসারদের মধ্যে মাত্র ৬ শতাংশ মারা গেছেন যুদ্ধজনিত কারণে। বাকি ৯৪ ভাগই কলেরা, ম্যালেরিয়া ইত্যাদি ছোঁয়াচে রোগে ভুগে। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর মহামারিতে মারা পড়া সৈনিকদের ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর ১০ হাজার নতুন সৈন্য ইংল্যান্ড থেকে আনা হতো। সে সময় মহামারি থেকে শ্বেতাঙ্গ সৈন্যদের স্বাস্থ্য ও জীবন রক্ষার বিষয়টি ঔপনিবেশিক শাসকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছিল।

ইংরেজ শাসকদের চোখে আমাদের বাজার, মেলার স্থান, উৎসবস্থল, তীর্থস্থানগুলো রোগের আখড়া হয়ে দেখা দেয়। সংক্রামক রোগ নিয়ে শাসকগোষ্ঠী এতই উদ্বিগ্ন ছিল, ১৮৬১ সালে ইস্তাম্বুলে তারা একটি আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সম্মেলনের আয়োজন করেছিল। সম্মেলনে ভারতবর্ষের ছোঁয়াচে রোগ ছিল প্রধান আলোচ্য বিষয়।

এর পর শুরু হয় জনসমাগমস্থল নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার নানা সরকারি আয়োজন। দক্ষিণ এশিয়ায় জনগণের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে অগ্রণী তাত্ত্বিক এবং 'কমিউনিটি, স্টেট অ্যান্ড দ্য বডি :এপিডেমিকস অ্যান্ড পপুলার কালচার ইন কলোনিয়াল ইন্ডিয়া' প্রবন্ধের লেখক দীপেশ চক্রবর্তী নিজে সে সময়কার উৎসব ব্যবস্থাপনা বা ভিড় নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুলিশ ম্যানুয়াল দেখেছেন- জনতার ভিড় সামাল দিতে কত দড়ি, কত গামলা পানি, কত ডাক্তার, কত পুলিশ, কত ওষুধ, কত বাঁশ, কত পায়খানা বানানো লাগবে। সেসব বিবরণ থেকে স্পষ্ট- ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের 'উচ্ছৃঙ্খল' ভিড় দমনের মাধ্যমে মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। সেসব ব্যবস্থার অনেক কিছুই জনগণ মানতে চায়নি। এ নিয়ে কলকাতা, মুম্বাই নানান জায়গায় ইংরেজদের সঙ্গে দেশীয়দের সংঘর্ষ হয়েছে। জনগণ ইংরেজদের গৃহীত নানান ব্যবস্থা নিয়ে মশকরা করেছে, গুজব রটিয়েছে।

বস্তুত, ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থানীয়দের 'দূষিত পরিবেশ ও সংক্রমণ' থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রেখে ভারত শাসন করা। ব্রিটিশ সৈনিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই গড়ে তোলা হয়েছিল ক্যান্টনমেন্ট। ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত সামরিক-বেসামরিক আমলাদের জন্য একটা বিশেষ বাস্তু সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিল। সেই সাম্রাজ্যবাদী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্ণগত পার্থক্য রক্ষা করা হয়েছে। সেখানে সাদা বর্ণ মানে ছিল শাসকের রঙ। ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে ইংরেজদের জনস্বাস্থ্যনীতি ছিল একচোখা। একদিকে বর্ণবাদী, আবার শ্রেণি পরিচয়ের দিক থেকে বৈষম্যবাদী। ওই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নেটিভ বা স্থানীয় ক্ষমতাহীন জনগণ ছিল অচ্ছুত। ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্য নীতির দর্শন স্পষ্ট- ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের জীবনের চেয়ে ব্রিটিশদের জীবনের দাম অনেক বেশি।

এই করোনায় জর্জরিত আকালের দিনে কিছু প্রশ্ন অজগরের মতো হাঁ করে আমাদের দিকে ধেয়ে আসে। ঔপনিবেশিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে আমরা কতদূর এগিয়েছি? আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় আপামর মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা কতটুকু আমরা আদতে করতে পেরেছি? এদেশ থেকে ইংরেজ গেছে প্রায় ৭৫ বছর হয়ে গেল। পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে মুক্তিযুদ্ধের রক্তস্নানে আমরা হটিয়েছি ৫০ বছর হতে চলল। আর করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিল বেসরকারি খাতের হাসপাতাল ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর, জনগণবিমুখ, পলাতক মনোবৃত্তির, মুনাফালোভী ও দুর্নীতিগ্রস্ত। সেই তুলনায় আমরা শেষ পর্যন্ত ভরসা তো করছি সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থায়। যদিও সেখানে দুর্নীতির মচ্ছব নিয়ে বিস্তর কথা আছে। তবুও সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা ও কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালসহ সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলো মূলত এখন সেবাকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু তা কতটুকু হয়েছে? এ ব্যবস্থায় সবার প্রবেশাধিকার কি আছে?

১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু তরুণ সৈনিকদের উদ্দেশে একটি ভাষণ দেন। 'মনে রেখো জনগণ কারা? তোমার বাপ, তোমার ভাই। তোমাদের মাইনে কোত্থেকে আসে?...সরকারি-বেসরকারি কর্মচারী তাদের সকলের বেতন আসে বাংলার দুখী মানুষের ট্যাক্সের টাকা দিয়া। তোমরা তাদের মালিক নও, তোমরা তাদের সেবক।' বাংলাদেশের 'দুখী মানুষের' সেবার জন্য, সবার জীবনের জন্য স্বাস্থ্যব্যবস্থা কি গড়ে উঠেছে কিছু? মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতিগুলো ভুলে না গিয়ে দেশের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা ও কাজে হাত দেওয়ার এখনই সময়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলে, মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দিতে হয়। তাহলে এখানে ততটুকু বরাদ্দ কি আছে? আবার যতটুকু বরাদ্দ, এর কতটুকু লোপাট হয়ে যায়, সেই হিসাব কি মেলে? এর পরও কি আমরা মিলিয়ে দেখব না কিউবা কিংবা ভিয়েতনামের মতো সবার জন্য একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমাদের কী নেই? একদিন নিশ্চয় এই সঙ্গরোধী, এই জীবনঘাতী করোনাকাল কেটে যাবে। এসব প্রশ্নের জবাব কি আমরা খুঁজব না? কে দেবে জবাব?

বাংলাদেশ কি শুধু থাইল্যান্ডের বামরুনগ্রাদ, সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ আর ভারতের চেন্নাই, মুম্বাইনির্ভর এক ধনবাদী পরনির্ভরশীল চিকিৎসা ব্যবস্থার নীরব দর্শক ও গ্রাহক হয়ে থাকবে? এই ঘোর বিপদের দিনে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া চরম মুনাফানির্ভর ক্লিনিকগুলোরই দ্বারস্থ হতে থাকব আগামীতেও? কিন্তু নিতান্তই যারা দিন আনে দিন খায় তারা কোথায় যাবে? কোথায় যাবে 'বাংলার দুখী মানুষেরা'? ঔপনিবেশিক শাসনামলের গুটিকতক অভিজাতের জীবন বাঁচানো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ফাঁদেই কি আমরা আটকা পড়ে থাকব? নোবেল লরিয়েট গীতিকবি বব ডিলানের গানের ভাষা ধার করতে পারি। আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে, আকাশের দিকে একটু মুখ তুলে তাকাতে, আমাদের আর কতকাল, এভাবেই মুখ তোলার অপেক্ষায় কেটে যাবে?

লেখক ও গবেষক; সহকারী অধ্যাপক, থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়