সামাজিক উদ্যোগ

আমার গ্রাম হোক আমার পরিবার

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

খন্দকার আরিফ

১৯৪৬ সালে লেখা 'পিরামিড বনাম সামুদ্রিক বৃত্ত' বইটিতে মহাত্মা গান্ধী লিখেছেন এক স্বর্গীয় পল্লীর কথা। তিনি বলেছেন, ভারতবর্ষের প্রতিটি গ্রাম হবে স্বনির্ভর এবং সমস্ত নিজস্ব বিষয় সামলাতে সক্ষম। এমনকি বাইরের সমস্ত জগৎ থেকে আত্মরক্ষা পর্যন্ত। এই স্বনির্ভর আর সুরক্ষিত গ্রামগুলোই হয়ে উঠবে স্বর্গীয় পল্লী। এ কথা বলার প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল পেরিয়ে গেলেও ভারতবর্ষের কোথাও তেমন স্বর্গীয় পল্লী তো দেখা যায়ইনি বরং ক্ষেত্রবিশেষে পল্লীগুলো নারকীয় হয়ে উঠছে। তবে এই করোনাকালে পুরো বিশ্ব যখন আক্রান্ত, বাংলাদেশ যখন উত্তরণের পথ খুঁজছে, শহরে-গ্রামে যখন খাদ্য সংকট প্রকট, ত্রাণের জন্য হাহাকার, বিতরণের ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনা, দিকে দিকে খেতে না পাওয়া মানুষের আত্মহত্যার খবরও পাওয়া যাচ্ছে অল্প আকারে;

তখন স্বনির্ভর গ্রামের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় বোতলারপাড় গ্রাম।

দেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একটি নিভৃত গ্রাম বোতলারপাড়। বর্তমানে করোনা সংকটকালে এই গ্রামটির বিশিষ্টতা হচ্ছে, গ্রামের সব মানুষকে তিন ভাগে ভাগ করে একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সোজা কথা- কে সহযোগিতা করতে পারবে আর কার সহযোগিতা দরকার। তালিকা থেকে বাদ পড়েনি গ্রামের একজন মানুষও। উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরা মিলে চাহিদা মোতাবেক জোগান দিচ্ছেন নিম্নবিত্তদের। তরুণদের কয়েকটি ছোট ছোট দল কাজ ভাগাভাগি করে নিয়েছে। একটি দল তালিকা মোতাবেক বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পৌঁছে দিচ্ছে এবং খেয়াল রাখছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ বা প্রবাসফেরত কেউ গ্রামে ঢুকছে কিনা। এমন কেউ থাকলে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখা, এমনকি তাকে দরকারি খাদ্য এবং ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থাসহ নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখছে। এমনকি করোনায় আক্রান্ত হয়ে গ্রামের কেউ মারা গেলে তার দাফন-কাফনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে একটি দলকে।

বেশি বেশি শাকসবজি চাষ করে গ্রামের চাহিদা যাতে গ্রাম দিয়েই পূরণ করা যায় তার জন্য রয়েছে তরুণদের আরও একটি দল। গ্রামের কোথাও পতিত জমির খোঁজ পেলেই সেখানে শুরু করে দিচ্ছে সবজি চাষ। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে চলছে সুবিধাভোগী নির্ধারণের কাজ। এ সবকিছুই করছে বোতলারপাড় গ্রাম সুরক্ষা কমিটি নামে একটি সংগঠন। 'আমার গ্রাম, আমার পরিবার'- এ স্লোগান সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছে সংগঠনটি। শিক্ষক, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্রসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রয়াসে চলছে সংগঠনটি!

এই গ্রামে ত্রাণের জন্য মানুষকে হাহাকার করতে হচ্ছে না। তালিকা অনুযায়ী অসচ্ছলদের ঘরে ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে; চিকিৎসার কথা ভেবে অস্থির হতে হচ্ছে না; প্রবাস থেকে কেউ ফিরলে মুহুর্মুহু পুলিশকে ফোন করতে হচ্ছে না; অভাবের কারণে কেউ সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে না। এপ্রিলের শুরুতেই এই গ্রামের জল-হাওয়ায় বেড়ে ওঠা শিক্ষক ও নদীগবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদের উদ্যোগে গঠিত হয় এই গ্রাম সুরক্ষা কমিটি। একজন আহ্বায়ক এবং একজন সদস্য সচিব এবং বাকি সবাইকে সদস্য করে গঠিত হয়েছে এই কমিটি। দেশের প্রতিটি গ্রামেই যদি এমন পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে গ্রাম দিয়েই গ্রাম বাঁচবে, সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলেও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। অভাবের কারণে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে উঠতে পারবে না। ছোট ছোট সামাজিক অপরাধ, যেমন- চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ঠেকানো যাবে।

এমন সুরক্ষিত গ্রাম নির্মাণের ক্ষেত্রে বোতলারপাড় হতে পারে পরীক্ষাক্ষেত্র। উল্লেখ্য, আজ চারপাশে যখন মৃত্যুর হাতছানি; করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন যখন বেড়ে চলেছে; অনির্দিষ্টকাল ধরে সংকট চলমান থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে; ঠিক তখনই পরিসংখ্যান ব্যুরোর একটি তথ্য আমাদের শিহরিত করেছে। দেশের সবচেয়ে কম দরিদ্র যে নারায়ণগঞ্জ জেলায়, সেখানে দরিদ্র জনসংখ্যার জন্য মাথাপিছু চাল বরাদ্দ করা হয়েছে ২২ কেজি ৫৫৫ গ্রাম এবং মাথাপিছু অর্থ বরাদ্দ ৮৮ টাকা ১৭ পয়সা। অন্যদিকে দেশের সর্বোচ্চ দারিদ্র্য যে কুড়িগ্রাম জেলায়, সেখানে দরিদ্র জনসংখ্যার জন্য মাথাপিছু চাল বরাদ্দ ৮৭৪ গ্রাম এবং অর্থ বরাদ্দ ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। ত্রাণ বিতরণে এমন বৈষম্য সংকটকে ঘনীভূত করবে। এমতাবস্থায় বৈষম্য নিরসনের পাশাপাশি গ্রামে গ্রামে 'গ্রাম সুরক্ষা কমিটি' গঠনই আমাদের গ্রামগুলোকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।

লক্ষ্য করা যেতে পারে, যে কুড়িগ্রামের ৭০.৭১ ভাগ মানুষ গরিব সেখানে যদি সামর্থ্যবানদের চেষ্টায় একটি গ্রামকে সুরক্ষিত রাখার উদাহরণ তৈরি হতে পারে, তাহলে যে জেলাগুলোতে দারিদ্র্য কম সেগুলোতে আরও অল্প আয়াসেই কাজ করা সম্ভব। এভাবে বোতলারপাড়ের অনুকরণে একই প্রক্রিয়ায় কাজ করলে মাসখানেকের মধ্যেই হয়তো দেশের সব গ্রামকে সুরক্ষিত করে তোলা খুবই সম্ভব।

নীহাররঞ্জন রায় বলেছেন, উনিশ শতক পর্যন্ত বাংলাদেশ ও বাঙালির বাস্তব সভ্যতার রূপ গ্রামীণ। তখন শহর যেগুলো ছিল সেগুলোও ছিল যেন সমৃদ্ধিশালী গ্রামেরই বিস্তৃতি। জনসাধারণ বলতে তখন প্রধানত এই অগণন গ্রামবাসীকেই বোঝাত। শহরায়ন এখনও আমাদের গ্রামগুলো পুরোপুরি গ্রাস করতে পারেনি। এখনও এদেশের প্রায় ১১ কোটি মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। এই গ্রামগুলো সুরক্ষিত থাকলে পুরো দেশ সুরক্ষিত থাকবে।

সংগঠক, গণকমিটি, কুড়িগ্রাম