চারদিক

মর্মস্পর্শী সলিলসমাধি

প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

দেবব্রত চক্রবর্তী বিষুষ্ণ

আনন্দ বিনোদনের অন্যতম অনুষঙ্গ পর্যটন। বর্তমান দুনিয়ায় পর্যটনের ক্ষেত্র যেমন ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনি উন্মোচিত হচ্ছে পর্যটনের নতুন নতুন দিগন্তও। দেশ ও দেশের বাইরে প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই সমচিত্র। ভূ-ক্ষেত্রে যেমন, পানির ক্ষেত্রেও তেমনই। আমরাও এর বাইরে নই। আনন্দ ভ্রমণে গিয়ে নৌ-দুর্ঘটনায় অনেকের প্রাণহানির খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন অনেকের সলিলসমাধি অত্যন্ত মর্মন্তুদতার বিষয়। শুধু যে নৌকায় আনন্দ ভ্রমণে গিয়েই এমন সলিলসমাধির ঘটনা ঘটেছে কিংবা ঘটছে তা নয়; পুরো নৌপথই কতটা যে অনিরাপদ হয়ে রয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মনুষ্যসৃষ্ট কারণে, তারই জলজ্যান্ত প্রমাণ মিলেছে সম্প্রতি বুড়িগঙ্গায় ঘটে যাওয়া লঞ্চ দুর্ঘটনায়। বিগত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে নৌযান দুর্ঘটনায় এমন দুঃসহ বেদনার মুখোমুখি হতে হয়েছে অনেক পরিবারকে।

বর্ষাকালে জীবনানন্দের এই রূপসী বাংলার ভাটি অঞ্চল আনন্দ ভ্রমণের অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ভাটি অঞ্চল অর্থাৎ হাওরাঞ্চলে তখন ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় লক্ষ্য করা যায় ব্যাপকভাবে। পাল তোলা কিংবা রশিটানা-দাঁড়টানা নৌকায় ভ্রমণ এখন যেন শুধুই স্মৃতি। এর জায়গা নিয়েছে ইঞ্জিনচালিত নৌযান। গত এক সপ্তাহে নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার উচিতপুর, হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার শিবপাশা, সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা হাওরে নৌযানডুবির ফলে সৃষ্ট মর্মান্তিক পরিস্থিতি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে- এসব ঘটনার দায় বর্তায় কার ওপর? সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রাথমিকভাবে যা জানা গেছে, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নৌযান-সংশ্নিষ্টদের দায়িত্বহীনতা, উদাসীনতা কিংবা স্বেচ্ছাচারিতা। জীবনের এমন মর্মন্তুদ পরিণতি এর আগেও ঘটেছে। কিন্তু বিষয়গুলো থেকে গেছে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিকারহীন।

পর্যটনের বিকাশ কিংবা পর্যটন ক্ষেত্রের বিস্তৃতি বর্তমান জীবনযাত্রার চাহিদার অন্যতম অনুষঙ্গ। এর প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও মূলত মানসিক আনন্দ লাভই মূল লক্ষ্য। ৫ আগস্ট নেত্রকোনা জেলার মদন উপজেলার উচিতপুরে আনন্দ ভ্রমণপিপাসু যে ১৭ জনের সলিলসমাধি ঘটেছে, তা এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। হাওরে ইঞ্জিনচালিত নৌযানডুবিতে প্রাণহানির ঘটনার শিকার যারা, একটি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী। অনেকেই সাঁতরে তীরে উঠলেও ১৭ জনের জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার মতো মর্মস্পর্শী ঘটনাটি অনভিপ্রেত-অনাকাঙ্ক্ষিত। সতর্কতা ও নৌযানে জীবনরক্ষা সহায়ক উপকরণের অভাবই ওই মর্মস্পর্শী অধ্যায়ের প্রধান কারণ। এই কারণগুলো অতীতেও চিহ্নিত হয়েছে। একেকটি ঘটনা ঘটার পর প্রতিকার-প্রতিরোধের অনেক কথা বলা হয়েছে; সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল কিংবা বিশেষজ্ঞ মহলের সুপারিশও করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি; উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনা তারই সাক্ষ্যবহ।

এ রকম মর্মন্তুদতার পথ রুদ্ধ কিংবা সংকুচিত করার উপায় হলো যথাযথ প্রতিকার-প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তা হচ্ছে না বিধায় এমন বেদনাহত হওয়ার মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বারবার। পর্যটন কিংবা আনন্দ ভ্রমণের দিগন্ত ক্রমবিস্তৃত হোক, এটা অবশ্যই কাম্য। কিন্তু একই সঙ্গে এও প্রত্যাশিত- এ ক্ষেত্রে যথাযথ নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। নৌযানে লাইফ জ্যাকেট, ত্রুটিমুক্ত ইঞ্জিন, সতর্কতামূলক অন্যান্য ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের দায় প্রশাসনও এড়াতে পারে না। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই চলনবিধি কিংবা নিয়ম মেনে চলার অপরিহার্যতা কতটুকু; এরই তাগিদ ফের মিলেছে ঘটে যাওয়া মর্মস্পর্শী ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে। নিয়ম ভাঙার অসুস্থ প্রতিযোগিতা কিংবা শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে চলার ক্ষেত্রে বহু স্তরেই আমাদের অনেক ঘাটতি রয়েছে। আর এ ঘাটতিই জীবনের সর্বনাশ ডেকে আনছে অনেক ক্ষেত্রে।

বর্তমান বাংলাদেশের জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। এও উল্লেখ করা যেতে পারে, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর এক-তৃতীয়াংশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন শিল্প। আমাদের পর্যটন ক্ষেত্র ব্যাপকভাবে বিকশিত করার বিপুল অবকাশ থাকা সত্ত্বেও নানা কারণে এ পথে এখনও জিইয়ে আছে প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতার অনেক বাধা। উল্লিখিত ঘটনাগুলো এরই খণ্ডিত দৃষ্টান্তমাত্র। পরিস্থিতি উন্নতকরণের পাশাপাশি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে নিরাপত্তার বিষয়টিও সমভাবে ভাবা সময়ের অন্যতম দাবি।

লেখক ও সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com