'পাহাড়ে রক্তপাত' বন্ধ করতে হলে

প্রতিক্রিয়া

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

প্রীতিবিন্দু চাকমা

দৈনিক সমকালে গত ১২ জুলাই প্রকাশিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও আদিবাসী জনগণের বন্ধু ড. রাহমান নাসির উদ্দিনের 'পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হোক' শীর্ষক লেখাটি মন দিয়ে পড়েছি। তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ যুগোপযোগী প্রবন্ধ লেখার জন্য। পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের স্বার্থে পাহাড়ে রক্তপাত বন্ধ হওয়া নিঃসন্দেহে জরুরি।
বলা বাহুল্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা শান্তিচুক্তি নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করেছে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরের পর সরকার চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেনি। চুক্তির অনেক ধারা বাস্তবায়ন করলেও চুক্তির মৌলিক ধারাসমূহ, যেগুলোর ওপর পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যবস্থার ভিত্তি নির্ভর করে এবং যে ধারাগুলোতে পার্বত্যাঞ্চলের জুম্ম জনগণ ও স্থায়ী বাঙালি অধিবাসীদের স্বশাসনের অধিকার নিহিত রয়েছে, সেসব ধারা বিগত ২৩ বছরে বাস্তবায়ন হয়নি।
একদিকে যেমন চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নে রাষ্ট্রযন্ত্র নানা টালবাহানা চালাতে থাকে, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। সেই ষড়যন্ত্রেরই ফসল পাহাড়ে রক্তপাত। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর হতে না হতেই পিসিপির একটা অংশ চুক্তির বিরোধিতা শুরু করে, যারা পরে ১৯৯৮ সালে ইউপিডিএফ নামে আত্মপ্রকাশ করে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার জন্য স্থানীয় ও উচ্চ পর্যায়ে অনেকবার বৈঠক হয়েছে। সমঝোতা চুক্তিও হয়েছে। কিন্তু পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাবে, সর্বোপরি শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের কারণে বারবার সমঝোতা ভেঙে যেতে থাকে।
২০০৭-০৮ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালে তথাকথিত 'সংস্কার' করার নামে যেভাবে জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছিল ও রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরে ভাঙন ধরিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতির ওপরও দমন-পীড়ন চালিয়েছিল এবং সমিতির নেতৃত্বের মধ্যকার বিভাজনকে উস্কে দিয়েছিল। সেই দুর্দিনে দলের মধ্যে ঐক্য-সংহতি বজায় রাখার পরিবর্তে জেএসএসের কতিপয় নেতাকর্মী উপদলীয় চক্রান্তে মেতে ওঠে। ফলে জেএসএস ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সম্মেলনে সেসব সংস্কারপন্থি নেতাকর্মীকে বহিস্কার করে। পক্ষান্তরে পাল্টা হিসেবে একই বছর সংস্কারপন্থিরা এক কর্মী সম্মেলনের মাধ্যমে 'জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)' নামে পৃথক রাজনৈতিক দল ঘোষণা করে।
এভাবে জেএসএস-ইউপিডিএফের মধ্যকার তথা পার্বত্য চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষের মধ্যকার দ্বিমুখী সংঘাতের সঙ্গে আরেক পক্ষ হিসেবে সংস্কারপন্থি গোষ্ঠী যুক্ত হয়ে পড়ে। সংঘাতের মেরুকরণ হয়ে দাঁড়ায় একপক্ষে জেএসএস এবং অন্যপক্ষে ইউপিডিএফ ও সংস্কারপন্থি। এক পর্যায়ে বিদ্যমান বাস্তবতা এবং তিন পক্ষের আগ্রহের ফলে জেএসএসের সঙ্গে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের সঙ্গে সংস্কারপন্থিদের পৃথক দুটি সমঝোতা সংলাপ শুরু হয়। এর ফলে তিন পক্ষের মধ্যে সংঘাত ও হানাহানি অনেকটা বন্ধ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ২০১৫ সাল থেকে হানাহানি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়।
এমনি এক অবস্থায় ইউপিডিএফের কিছু হঠকারী কর্মসূচির ফলে বিশেষ মহল ইউপিডিএফে সংস্কারপন্থিদের সমর্থন দিতে থাকে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে ইউপিডিএফ থেকে বহিস্কৃৃত ও নিষ্ফ্ক্রিয় সদস্যদের নিয়ে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) নাম দিয়ে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়। ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) গঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউপিডিএফ সদস্যদের ওপর সশস্ত্র হামলা শুরু করে। ফলে থেমে যাওয়া সংঘাত ও হানাহানি আবার শুরু হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তথাকথিত ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। বিশেষ মহলের মদদে কয়েকটি গ্রুপ বান্দরবান এলাকায় অবাধে চাঁদাবাজি, অপহরণ, হত্যা ইত্যাদি সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
বলা বাহুল্য, যে কোনো জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে যেমনি আত্মবলিদানে উৎসর্গিত দেশপ্রেমিক লোক থাকে, তেমনি থাকে মীরজাফর বা রাজাকারের দলও। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে রক্তপাত বন্ধ না হয়ে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। আশার দিক হলো, পার্বত্য চুক্তির পক্ষ-বিপক্ষ মূল গ্রুপগুলোর মধ্যে এখন সংঘাত বন্ধ রয়েছে। শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে তারা আবার সংঘাতে জড়িয়ে না পড়ূক, সেটাই সবাই কামনা করছে। কিন্তু গভীরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, একটি মহল কখনোই চায় না পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক জুম্ম জনগণ স্বশাসনের অধিকার ফিরে পাক। তারা চায় না যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য অটুট থাকুক। তাই পার্বত্য চুক্তিকে ভণ্ডুল করতেই একটি মহল পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাত ও হানাহানিতে মদদ দিয়ে চলছে।
এখানে ড. রাহমান নাসির উদ্দিন যথার্থই বলেছেন যে, যখনই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটবে, তখনই এটিকে 'চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস এবং আধিপত্য বিস্তারের' বয়ান দিয়ে একটি ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সংঘাত ও হানাহানির পেছনে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের বিষয়টি যে মোটেই নেই তা নয়। যে কোনো সংগ্রামে অর্থশক্তি একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বিপ্লবী দল হোক কিংবা সশস্ত্র দুর্বৃত্ত গোষ্ঠী হোক অর্থ ছাড়া তাদের কোনো কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী চাঁদা তুলবেই। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামে বনজ সম্পদ আহরণ ও পরিবহনে ঘাটে ঘাটে যে চাঁদা দিতে হয় তার তুলনায় আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদা আদায়ের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য, তা নির্দি্বধায় বলা যায়। আর টেন্ডারবাজি ও উন্নয়ন কার্যক্রমে অফিস-আদালতে যে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হয় তার তুলনায় আঞ্চলিক দলগুলোর চাঁদাবাজির পরিমাণ সামান্য। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘাতের পেছনে চাঁদাবাজি নয়, বড় বিষয় হচ্ছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে যতই দমন-পীড়ন ও ষড়যন্ত্র হোক না কেন সুকৌশলে বুঝেও না বোঝার ভান করে এড়িয়ে যাওয়া হয়।
ষড়যন্ত্রে পা দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দলগুলো যে হানাহানিতে জড়িয়ে পড়ছে তার দায় অবশ্যই আঞ্চলিক দল নামধারী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও এড়িয়ে যেতে পারে না। তবে একটি মহলের ইন্ধনেই থেমে যাওয়া সংঘাত ও হানাহানি বারে বারে ঘুরেফিরে জীবন্ত হয়েছে। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে হানাহানি ও রক্তপাত বন্ধ করতে হলে এই ষড়যন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ও জুম্ম স্বার্থ পরিপন্থি সব ধরনের প্রতিক্রিয়াশীলতা ও ষড়যন্ত্র নির্মূল করার মাধ্যমে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারকে বাধ্য করার মধ্য দিয়েই কেবল পার্বত্যাঞ্চলে সংঘাত ও রক্তপাত বন্ধ হতে পারে।
priti_chakma@yahoo.ca
কানাডা প্রবাসী ও মানবাধিকার কর্মী