লাটাই ও নীল আকাশের স্বপ্ন

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফরিদুর রেজা সাগর

বঙ্গবন্ধু বহুমাত্রিক/তিনি সমুদ্রের মতো/তিনি আকাশের মতো/তিনি বিশাল।
মানবিক বঙ্গবন্ধু, শ্রদ্ধা-ভালোবাসার বঙ্গবন্ধু, পিতা বঙ্গবন্ধু, রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু, সন্তান হিসেবে বঙ্গবন্ধু, স্নেহশীল বঙ্গবন্ধু, বাঙালি বঙ্গবন্ধু- নানা বর্ণে নানা আলোয় তাকে আমরা আবিস্কারের চেষ্টা করি।
বিদেশে তিনি অনেকবার গেছেন। এই সফরে তিনি একটি জিনিস দেখে ভাবলেন, দেশে ফেরার সময় এটা সঙ্গে করে নিয়ে যাবেন। তার মনে হলো, এটা তার সন্তানদের হাতে দেবেন। এরপর তিনি ভাবলেন- তার সন্তানের প্রজন্মরা অনেকেই অনেক খেলা আজ ভুলে গেছে। তারা নানা রকম বিদেশি খেলার মধ্যে ডুবে আছে। অথচ ছেলেবেলায় নানা রকম মজার দেশি খেলায় তারা মগ্ন থাকত। একটা সময় হাডুডু খেলার খুব প্রচলন ছিল। ছেলেপুলেরা খেলত ডাংগুলি, ছি-কুতকুত, দাঁড়িয়াবান্ধা, সাতটি চাড়া পরপর সাজিয়ে খেলত সাতচাড়া। দূর থেকে বল ছুড়ে চাড়া ফেলতে হবে আর প্রতিপক্ষ এ মাথা ও মাথা ছুটে পয়েন্ট জোগাড় করবে।
রঙ-বেরঙের মার্বেল খেলার কথা তো এই প্রজন্মের শিশুরা ভুলেই গেছে। ছোট ছোট আঙুল দিয়ে মার্বেল খেলা হতো। মার্বেলটা বাঁ হাতের মধ্যমায় আটকে ডান হাত দিয়ে ছুড়ে মারা হতো নির্দিষ্ট গর্তের দিকে। আর সামনে যে মার্বেল থাকত সেটি ছুড়ে ছুড়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। আজকাল মার্বেল খেলার প্রচলন নেই। কত রঙের মার্বেল যে ছিল! সব মিলিয়ে কত যে দেশি খেলা ছিল আমাদের ছেলেবেলায় সেসব এখন স্মৃতি।
তিনি আরও ভাবলেন, দেশে-বিদেশে কত খেলাই তো আছে! কিন্তু আমাদের দেশের মতো এমন মজার ও আনন্দদায়ক খেলা আর কোনো দেশে আছে কি? দেশি খেলা কি হারিয়ে যাচ্ছে? দেশটাকে গড়ে তুলতে হবে। মাঠে-ঘাটে ফুটবল খেলার প্রচলন আগের মতো কি আছে? ভেজা মাঠ, সবুজ ঘাস, খোলা ধানক্ষেত, বর্ষার বৃষ্টি আর এর মধ্যে ফুটবল খেলার আনন্দ কি এই প্রজন্ম পাবে?
সেই অনেক বছর আগে সেই মানুষটি প্রতি মুহূর্তেই দেশ ও দেশের মানুষের কথা ভাবতেন। দেশের সংস্কৃতি, দেশের কৃষ্টি, দেশের খেলাধুলা, দেশি খাবার- এসবের প্রচার প্রয়োজন। তিনি ওই সফরে সেই দেশ থেকে পরম মমতায় দুই ছেলের জন্য দুটি জিনিস কিনে আনলেন।
দেশটার নাম চীন। আর জিনিসটার নাম লাটাই। ঘুড়ি ওড়ানোর লাটাই। আমাদের দেশের মতো বাঁশ-বেতের লাটাই নয়। কিছুটা অন্যরকম। বাড়িতে লাটাই নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেল। সবাই আগে ওড়াতে চায়। তিনি তখন দরাজ কণ্ঠে বলে উঠলেন- তোমরা সবাই মিলে ঘুড়ি ওড়াবে।
তারা পাঁচ ভাইবোন। তিন ভাই, দুই বোন। ভাইবোনদের সম-অধিকার। সেই পরিবারে ছেলেমেয়ের কোনো পার্থক্য নেই। বড় ছেলে লাটাই হাতে ছাদে উঠল। সঙ্গে চার ভাইবোন। পেছনে পেছনে আনন্দে হুল্লোড় করছে তারা। সবার ছোট ছেলের আনন্দ আরও বেশি। সে লাফাচ্ছে আর হাততালি দিচ্ছে। ছোট বলেই সবাই তাকে একটু বেশিই ভালোবাসে।
সন্তানদের বাবা ভাবলেন, একটি ঘুড়ি কী সুন্দর আকাশে ওড়ে। আর আনন্দের বান ডেকে যায় ছোটদের মনে। তার মনে পড়ে... তিনি চলে যান স্মৃতির অতলে। সবার সঙ্গে দেশি খেলা খেলতে, দেশি খাবার কিনতে ভালোবাসতেন। কটকটি, মুড়ির নাড়ূ, চিড়া ভাজা, চিড়ার নাড়ূ, মুরালি- এসব খাবার তিনি কিনে আনতেন।
ছেলেমেয়েরা খোলা আকাশের নিচে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। লাল-সবুজ ঘুড়ি। এক আনা দামের ঘুড়ি। ঘুড়ি ওড়ানো অতি আনন্দের ব্যাপার। মন উৎফুল্ল হয়। আর নীল আকাশে যেন সবাই হারিয়ে যায়। সুন্দর একটি ঘুড়ি। চীন থেকে আনা বাবার উপহার দেওয়া লাটাই।
খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে ওরাও স্বপ্ন দেখে। ওরাও আকাশের মতো হবে। নীল আকাশ ওদের স্বপ্নময় করে তোলে? ছোট ছেলেটি খুশিতে বারবার হাততালি দিচ্ছে। আর লাল-সবুজ ঘুড়িটা পতপত করে পতাকার মতো উড়ছে।
লেখাটি এখানেই শেষ।
ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে ওরা কোনো স্বপ্ন দেখেছিল। কোন আনন্দে পাঁচ ভাইবোন ভেসেছিল তা হয়তো আমাদের জানা নেই। তবে যাদের কথা লেখা হলো তাদের পরিচয় দিই। তারা হলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার পাঁচ সন্তান- শেখ কামাল, শেখ জামাল, কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল আর দুই মেয়ে শেখ রেহানা এবং আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা; ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চ্যানেল আই

বিষয় : লাটাই ও নীল