নদীতে বিলীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

চাই টেকসই ও উদ্ভাবনীমূলক পদক্ষেপ

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

নদীভাঙন ও বন্যায় বিলীন হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রতি বছর যেভাবে বাড়ছে, তা আমাদের উদ্বিগ্ন না করে পারে না। সোমবার সমকালে প্রকাশিত ২০ বছরে নদীতে আট হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত ও বিলীন হওয়ার খবর বিস্ময়কর। আমরা জানি, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে কতটা কাঠখড় পোড়াতে হয়। ভবনের জন্য আবেদন, নির্মাণের অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ ও কার্যক্রম শেষ করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাতে ব্যয়কৃত অর্থের পরিমাণও কম নয়। এরপরও যদি ভবনটি টেকসই না হয়, সেটি দুঃখজনক। নদীমাতৃক দেশ হিসেবে প্রায় প্রতি বছরই যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার পরও ঝঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রচলিত ভবন নির্মাণ কেন বন্ধ হচ্ছে না? আমরা দেখেছি, বিলীন হওয়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশই চরাঞ্চলে অবস্থিত। এ বছর উদ্বোধনের অপেক্ষায় থাকা চাঁদপুর সদরের রাজরাজেশ্বর ইউনিয়নের ওমর আলী স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টারটি যেভাবে নদীতে বিলীন হয়, তা ব্যাখ্যাতীত। সোয়া দুই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই এলাকার বিদ্যালয় এর আগেও একাধিকবার নদীভাঙনের শিকার হয়। চরাঞ্চলে বিলীন হওয়া অন্যান্য বিদ্যালয়ের গল্পও নিশ্চয়ই এর চেয়ে ভিন্ন নয়। আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শিক্ষার্থীর ওপর। বিদ্যালয় ভবন একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা সংস্কারে দীর্ঘ দিন লেগে যায়, তাতে ঝুঁকি নিয়ে কিংবা খোলা আকাশের নিচেই শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নেয়। আর বিদ্যালয় ভবন একেবারে তলিয়ে গেলে তো দুর্ভোগের অন্ত নেই। চরাঞ্চলে এমনিতেই প্রয়োজনের তুলনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অপ্রতুল; তার ওপর এভাবে প্রতিষ্ঠান বিলীন হয়ে যাওয়ার প্রভাব যে সেখানকার সার্বিক শিক্ষার ওপর পড়ছে, তা বলাই বাহুল্য। একইভাবে সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাইক্লোন শেল্টার হিসেবে ব্যবহার হয় বলে প্রতিষ্ঠানটি ক্ষতিগ্রস্তের সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগে মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও সামনে চলে আসে। চলতি বছর দীর্ঘমেয়াদি বন্যার ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্তের হার অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি। রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নষ্ট হয়েছে বলে সমকালের সংশ্নিষ্ট প্রতিবেদনে এসেছে।

আমরা মনে করি এ বছর সব মিলিয়ে যে একুশ শতাধিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে তালিকা ধরে প্রথমত ক্ষতির পরিমাণ চিহ্নিত করা দরকার। ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা স্থানান্তরের মাধ্যমে নিরাপদ স্থানে ভবন নির্মাণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। চরাঞ্চলে বারবার প্রতিষ্ঠান স্থাপনের চেয়ে স্থানান্তরযোগ্য বা ভাসমান বিদ্যালয় নির্মাণ করার বিষয়টি ভাবা দরকার। আমরা মনে করি, চরাঞ্চলে কংক্রিটের বদলে কাঠের কাঠামো ব্যবহার করা শ্রেয়। নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন টেকসই করতে নদী খনন ও নদীর তীর বাঁধাইসহ সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। নদীভাঙন রোধ করতে না পারলে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, বসতিসহ ফসলের জমি বিলীন হয়ে মানুষ কীভাবে নিঃস্ব হয় তা আমরা দেখেছি। তবে প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ সময়ে আমরা মনে করি না এসব সমস্যার সমাধান অসম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যেভাবে আমাদের অভিযোজন হয়েছে একইভাবে চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে অভিনব ব্যবস্থা গ্রহণ করা চাই। বিষয়টি যে কর্তৃপক্ষ ভাবছে তা সমকালের কাছে দেওয়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের বক্তব্যেও উঠে এসেছে, 'চর এলাকায় নদীর চার কিলোমিটার দূরত্বে ভবন নির্মাণ করার পরও রক্ষা পায়নি। তাই ভবিষ্যতে এসব এলাকায় আর প্রথাগত উপায়ে ভবন নির্মাণ করা হবে না।' প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস প্রভৃতি মাথায় রেখেই শিক্ষাসহ সার্বিক পরিকল্পনা জরুরি। সুষম উন্নয়ন যেখানে কাঙ্ক্ষিত, শতভাগ শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করা যেখানে প্রত্যাশিত, সেখানে সবার সুরক্ষা নিশ্চিত করতেই হবে। এমনিতেই কয়েক মাস ধরে চলমান করোনা দুর্যোগে শিক্ষার্থীদের শ্রেণি কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও যেন তাতে অংশ নিতে পারে, সে জন্য ত্বরিত পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।