১৫ আগস্ট

স্বাধীন বিচার কমিশন সময়ের দাবি

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. এম এ আজিজ

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য একটি নিকৃষ্টতম দিন, এক কলঙ্কিত অধ্যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের নজির থাকলেও শিশুসহ সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের নজির কোথাও নেই। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করা, আত্মস্বীকৃত খুনিদের পুনর্বাসন ও পুরস্কৃত করা, অধ্যাদেশ বাতিলের পর বিচারকাজে বিচারকদের বিব্রত হওয়াসহ নানা কারণে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড ও এর বিচার প্রক্রিয়া।

গত ৫ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে আবাহনী ক্রীড়াচক্র মাঠে তার প্রতিকৃতিতে ও বনানী কবরস্থানে তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করার পর মনটা বেশ ভারাক্রান্ত ছিল। খবরের কাগজে বিভিন্ন লেখা ও প্রবন্ধে চোখ বুলাচ্ছিলাম। ১৫ আগস্টে প্রথম শহীদ হন শেখ কামাল। মাত্র ২৬ বছর বয়সে একজন তরুণ কীভাবে এমন প্রতিভা ও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন আবাহনী ক্রীড়া চক্র, স্পন্দন সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা থিয়েটার! সব মিলিয়েই তার মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। তিনি বেঁচে থাকলে আমরা হয়তো আজ অন্য এক বাংলাদেশ দেখতে পেতাম। বঙ্গবন্ধু পরিবারের যে ছবিটি আমরা দেখে আসছি তা দেখলেই মনের ভেতরে এক অন্যরকম অনুভূতির জন্ম হয়। ছবির ওই পরিবারটি যেন প্রত্যেক বাঙালির আপন।

হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিল তাদের বিচারের রায় আমরা দেখেছি, কিন্তু তাদের পেছনে মদদদাতা কারা ছিল, তাদের ব্যাপারে জনগণ জানতে চায়। এটি এখন সময়ের দাবি। একটি বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন করা গেলে হত্যাকাণ্ডের পেছনের কুশীলবদের চিহ্নিত করা যাবে। আমরা জানি, একটি গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিবিদরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে সরকার পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক দলের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা কর্মপরিকল্পনা যদি সরকারের প্রশাসনযন্ত্রের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে না পারে, তাহলে সরকার ব্যর্থ হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় অনেক সিভিল কর্মকর্তা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, আবার অনেকে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকের মনে প্রশ্ন ছিল পাকিস্তানি আমলা দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন চলবে কিনা। এই সংশয়ই পরবর্তীকালে সত্য হয়।

বঙ্গবন্ধু মানুষকে সহজেই অনেক পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন এবং ছিলেন উদার প্রকৃতির। জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনের সময় ফিদেল কাস্ত্রো বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- 'আপনার দেশ কেমন চলছে?' বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'দেশ ভালো আছে। অনেক ভালো সিএসপি অফিসার আছে।' ফিদেল কাস্ত্রো তখন বলেছিলেন, 'এত ভালো অফিসার থাকতে পাকিস্তান রক্ষা করতে পারল না কেন। আমাকে ৩১ বার মারার চেষ্টা করেছে, আমার খাবার খেয়ে অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে। ভালো অফিসার হলেই হবে না, আনুগত্য আছে কিনা তা দেখতে হবে।' মাহবুব আলম চাষী, এম কেরামত আলী, হোসেন আলীসহ তাদের মতো আরও অনেকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন এবং ষড়যন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন।

ব্রিগেডিয়ার এম সাখাওয়াত হোসেন তার 'বাংলাদেশ রক্তাক্ত অধ্যায়' বইয়ে লিখেছেন, ১৫ আগস্ট সকালে ৪৬ ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল সাফায়াত জামিলের কক্ষে সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ, ডেপুটি জিয়াউর রহমান, সিজিএস খালেদ মোশারফ, ডিজিএফআই প্রধান আব্দুর রউফ প্রবেশ করেন। সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ এগিয়ে প্রচলিত রীতিনীতি ভেঙে ব্রিগেড কমান্ডার সাফায়াত জামিলের চেয়ারে বসে পড়েন। এই সময় ডিজিএফআই প্রধান ব্রিগেডিয়ার রউফ বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল খালিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, ফোনটি সেনাপ্রধানের হাতে দিলে তিনি খলিলকে জিজ্ঞেস করেন- রেডিওতে তার আনুগত্য প্রকাশের বক্তব্য শুনেছে কিনা? খলিলকে বলেন, তুমি এখনই রেডিওতে গিয়ে সরকারের আনুগত্য স্বীকার করো। আমরা সবাই এর সঙ্গে আছি। রক্ষীবাহিনী তখনও সারেন্ডার করেনি, কোনো ঘোষণাও দেয়নি। রক্ষীবাহিনীর প্রধান কর্নেল নূরুজ্জামান দেশের বাইরে ছিলেন। খালেদ মোশারফ রক্ষীবাহিনীর মেজর শরীফকে রেডিওতে গিয়ে আনুগত্য স্বীকার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করেন। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশারফ রাজেন্দ্রপুর থেকে ট্যাঙ্কগুলোতে গোলাবারুদ আনার ব্যবস্থা করেন।

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত তার বইয়ে লিখেছেন :আমার স্পষ্ট মনে আছে, আমার কমান্ডার কর্নেল সাফায়াত জামিল ১৫ আগস্ট ভোরে সর্বপ্রথম যখন খবরটি পান তখন উপ-প্রধানের বাড়িতে গিয়ে জানান, তখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নিরুত্তাপ অভিব্যক্তিতে রাষ্ট্রপতি নিহত হওয়ার খবর শুনে বলেছিলেন, 'সো হোয়াট! ইফ প্রেসিডেন্ট ইজ কিলড ভাইস প্রেসিডেন্ট ইজ দেয়ার।' ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত তার বইয়ে আরও উল্লেখ করেন, ১৮ আগস্ট তিনি মেজর ডালিমকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- জুনিয়র অফিসারদের মাত্র দুটি ইউনিট নিয়ে এত বড় একটা ঝুঁকি নেওয়া কতটুকু যুক্তিসংগত ছিল। এর জবাবে ডালিম হাসতে হাসতে বলল, সিনিয়র অফিসার সবাই আমাদের সঙ্গে আছে। সুতরাং এর মাধ্যমেই বোঝা যায় সামরিক বাহিনী, সিভিল আমলা এবং কুখ্যাত খুনি মোশতাকের রাজনৈতিক আশ্রয়ে তারা সেদিন এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

১৫ আগস্ট সকালে যখন বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ সিঁড়িতে পড়ে ছিল, এরা কেউ তাকে দেখতে ৩২ নম্বরে যায়নি। বরং তারা ব্যস্ত ছিল রাষ্ট্রপতির আনুগত্য নিয়ে এবং সবাই গিয়েছিল রেডিও স্টেশনে। দুঃখ হয়, পরবর্তী সময়ে এই সফিউল্লাহ, জিয়াউর রহমান, এ কে খন্দকার, খুনি ফারুক, রশিদ, হুদা, ডালিম, আজিজ পাশা, মহিউদ্দিন, নূর, খাইরুজ্জামান ও মোছলেমদের বিভিন্নভাবে পুরস্কৃত করা হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল করেন এবং তার পরিকল্পনা মোতাবেক ১ সেপ্টেম্বর যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত গভর্নররা দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারতেন তাহলে আমলাদের গুরুত্ব অনেক কমে আসত। বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীকেও দেশের জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে চেয়েছিলেন। যা ছিল একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ এবং তা বাস্তবায়িত হলে এদেশ হতো বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ কিন্তু বিশ্বাসঘাতকরা জাতির পিতার সেই স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেয়নি। তার সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই ষড়যন্ত্রের কাছে হেরে যান তিনি। তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়িত হচ্ছে। তারই নেতৃত্বে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার হয়েছে। স্বল্প আয়ের দেশ থেকে আজ মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০৪১ সালে দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ এবং ২১০০ সালের ডেল্টা প্ল্যানের লক্ষ্য বাস্তবায়নের অদম্য লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মানুষকে একের পর এক স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এবং সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যেমন '৭৫-এর খুনিদের বিচার হয়েছে, তেমনি তারই নেতৃত্বে স্বাধীন বিচার কমিশনের মাধ্যমে এই হত্যাকারীদের পেছনের কুশীলবদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হবে- সেই প্রত্যাশায় জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

মহাসচিব, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ