আন্তর্জাতিক জীববিজ্ঞান উৎসবে অর্ধযুগ

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ১১ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মো. শহীদুর রশীদ ভূঁইয়া

বিশ্বব্যাপী জীববিজ্ঞান চর্চায় মেধাবী তরুণ শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার মাধ্যমে জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আগামী দিনে নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী, গবেষক সৃষ্টি ও আন্তর্জাতিক যোগসূত্র গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ৩১ বছর আগে চেকোশ্নোভাকিয়ার ওলোমাওক সিটিতে শুরু হয়েছিল প্রথম আন্তর্জাতিক বায়োলজি অলিম্পিয়াড (আইবিও) তথা জীববিজ্ঞান উৎসব। অংশগ্রহণ করেছিল ৬টি দেশের ২২ জন মাত্র প্রতিযোগী। বাংলাদেশ জীববিজ্ঞানের এই বৃহত্তর আন্তর্জাতিক আসরে যোগ দিতে পেরেছে ২৬তম আসরে, ২০১৫ সালে। সে আসর বসেছিল ডেনমার্কের অরহস সিটিতে। বাংলাদেশ জীববিজ্ঞান অলিম্পিয়াড কমিটির সভাপতি হিসেবে আমাকে সে আসরে যোগ দিতে হয়েছিল।

কেবল যোগদান ছিল তা নয়, এক বিরাট অভিজ্ঞতা। যখন রিপোর্ট করতে গেলাম সংশ্নিষ্ট ডেস্কে লক্ষ্য করলাম প্রতিযোগীদের মোবাইলসহ সব ধরনের ব্যক্তিগত ডিভাইস জমা নিয়ে নিল। জুরিদের সঙ্গে প্রতিযোগীদের সব ধরনের যোগাযোগ পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত বন্ধ। সব পরীক্ষা শেষ হলে এসব ফিরিয়ে দেওয়া হবে। কীভাবে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলো গ্রহণ করা হয়, জীববিজ্ঞানের কী কী বিষয় তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকে, কোন কোন বিষয়ে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়া হয়, কী রকম যন্ত্রপাতি ও পরীক্ষার নমুনা সরবরাহ করা হয়, কতটা প্রস্তুতি থাকলে পরে সাফল্য লাভ করার সুযোগ আসতে পারে এমনি কত কিছুই না সে ক'দিন পর্যবেক্ষণ করতে হয়েছে। আমরা কম্পিউটারে তাত্ত্বিক ও ব্যবহরিক প্রশ্নগুলো পেলাম, প্রশ্ন নিয়ে মন্তব্য করতে পারলাম, সংশোধন করতে পারলাম।

আন্তর্জাতিক বায়োলজি অলিম্পিয়াডের একটি নির্দিষ্ট সিলেবাস আছে। সেটি বেশ বড় ও বিস্তৃত। তবে তার চেয়েও বড় কথা, প্রায়োগিক জীববিজ্ঞান ও সাম্প্রতিক জীববিজ্ঞান পরীক্ষার জন্য বড় বেশি প্রাধান্য পায়। এই যেমন প্রাণরসায়ন, আণবিক জীববিদ্যা, বায়োইনফরমেটিকস ইত্যাদি। ব্যবহারিক পরীক্ষার এক ল্যাবে দেখলাম ৪০টা পিসিআর দেওয়া আছে প্রতিযোগীদের ডিএনএ পৃথক্‌করণের কাজে লাগবে বলে। আমাদের জীববিজ্ঞান পাঠের অসম্পূর্ণতা বোঝার জন্য সেটাই যথেষ্ট ছিল। সাধারণ একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্রে আমাদের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর চোখ রাখার সুযোগ ঘটে না একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে যখন পা রাখছি তখনও। পিসিআর তো আমাদের দেশে বহু জীববিজ্ঞানের অনার্সের শিক্ষার্থীর কাছেই এখনও অধরা। করোনার কালে কভিড-১৯ পরীক্ষার কাজে পিসিআর বা আরটি পিসিআর অনেকেই কেবল যন্ত্রের নামগুলো জানতে পারছে। কেবল সমালোচনার জন্য এসব কথা বলা নয়। জীববিজ্ঞান বলি, বিজ্ঞান বলি আমাদের অবস্থান জেনে এগোনোর উপায় নির্ধারণ করা এবং জীববিজ্ঞানের বর্তমান ধারার সঙ্গে যুক্ত হওয়া যে জরুরি সেটি বলার জন্যই এসব কথার অবতারণা।

২০১৬ সালে আইবিওর ২৭তম আসর বসে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ টিমের নেতৃত্ব আমার কাঁধে পড়েছিল। সেবার আইবিওর ২৮তম আসর বসেছিল যুক্তরাজ্যের কভেন্ট সিটির ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয়ে। যোগ দিয়েছিল এতে ৬৪ দেশের ২৪৫ জন প্রতিযোগী। আমাদের দু'জন নির্বাচিত প্রতিযোগী যুক্তরাজ্যের ভিসা না পাওয়ায় আইবিওতে অংশগ্রহণ করতে পারল না। বিষয়টি আমরা আইবিও কর্তৃপক্ষের নজরে নিলেও এতে তাদের সরাসরি হাত নেই বলে আমরা তাদের দু'জনকে সঙ্গে নিতে পারিনি। ফলে দু'জন প্রার্থী নিয়েই আমাদের আইবিওতে যোগদান করতে হয়। মায়সা মনোয়ারা প্রমি এবং নাজমুস সাদাত সে আসরে মেরিট সার্টিফিকেট অর্জন করে। অবস্থাটা এমন ছিল যে, আর একজন অধিক যদি ব্রোঞ্জ পদক পেত তাহলে বাংলাদেশের মায়সা মনোয়ারা প্রমি তা পেত। আর তিনজন অধিক পেলে নাজমুস সাদাতও ব্রোঞ্জ পদক পেত। একদম ব্রোঞ্জ পদক যেন ছুঁয়ে এসেছি সেবার। আর দু'জন প্রতিযোগী আমাদের সঙ্গে নিতে পারলে হয়তো ফলাফল অন্যরকম হতে পারত।

২০১৮ সালে আইবিওর ২৯তম আসর বসে ইরানের তেহরানে। সে আসরে ৬৪টি দেশের ২৪৫ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছিল। সেখানে দেশের জন্য প্রথম অর্জন ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে অদিতি নাগ। সেবার বাংলাদেশ টিমের নেতৃত্ব দেন প্রফেসর ড. রাখহরি দাস। ২০১৯ সালে আমার নেতৃত্বে এবার বাংলাদেশ টিম যোগ দেয় আইবিওর ৩০তম আসরে। সে আসর বসেছিল হাঙ্গেরির সেজেড নগরীতে। সেখানে ৭২টি দেশের ২৮৫ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছিল। সেটি ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে সেরা সাফল্যের আসর। বাংলাদেশের তিনজন সেবার ব্রোঞ্জ পদক পেল। রাফছান রহমান রায়ান, মাধব বৈদ্য শংকর ও অদিতি নাগ। অদিতি নাগ পরপর দু'বার বাংলাদেশের হয়ে ব্রোঞ্জ পদক পেল। বহু দেশের জুরিরা আমাদের সঙ্গে এসে করমর্দন করে, অভিনন্দন জানায়।

জাপানের নাগাসাকিতে আইবিওর ৩১তম আসর বসার কথা ছিল। আমরা সেভাবেই প্রস্তুতিও শুরু করে দিয়েছিলাম। আগের মতো খোলামেলা পরিবেশে প্রতিযোগীদের সরাসরি অংশগ্রহণে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক উৎসবও আমরা সম্পন্ন করতে পেরেছিলাম। সে কাজে বাদ সাধল কোনো জীব নয় বরং এক অতি ক্ষুদ্র জীবাণু, নাম যার কভিড-১৯। জীববিজ্ঞানের গভীরতর পড়াশোনা আর গবেষণা কত জরুরি সে যেন তার অদৃশ্য উপস্থিতি দিয়ে জানান দিয়ে গেল। আমরা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাকি আঞ্চলিক এবং জাতীয় জীববিজ্ঞান উৎসব সম্পন্ন করি। এবার ইন্টারন্যাশনাল বায়োলজি অলিম্পিয়াডও অনুষ্ঠিত হবে অনলাইনে পৃথিবীর অংশগ্রহণকারী প্রতিটি নিজ নিজ দেশে। কভিড-১৯-এর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে গিয়ে আইবিওর উৎসবের নামও এবার পাল্টে হয়ে গেল আইবিও চ্যালেঞ্জ-২০২০।

বাংলাদেশেও আমরা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সে রকম আয়োজন সম্পন্ন করেছি মূলত বুয়েটের কম্পিউটার ল্যাবে। আমাদের সহযোগিতা করার জন্য বুয়েট কর্তৃপক্ষকে সাধুবাদ জানাই। ধন্যবাদ জানাই এরকম একটি আয়োজনে বিডিবিও, সমকালসহ যারা এর পেছনে কাজ করছেন প্রতিনিয়ত তাদের। আমাদের জুরিরা প্রস্তুত, প্রস্তুত আমাদের কারিগরি টিম এবং প্রস্তুত আমাদের প্রতিযোগীরাও। ১১ আগস্ট থেকে চলবে সে পরীক্ষা ১২ তারিখ বিকেল পর্যন্ত। ফলাফল প্রকাশ হবে ২৪ আগস্ট। প্রতিবারই আইবিওর বাংলাদেশি টিমের জন্য আমরা এক একটি নতুন স্লোগান ঠিক করি। এবার আমরা যখন সমকাল-বিডিবিও আঞ্চলিক ও জাতীয় জীববিজ্ঞান উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজনের লক্ষ্যে সমকালে বসেছিলাম তখন জাপানের নাগাসাকির কথা মাথায় রেখে আমাদের আইবিও টিমের জন্য 'সূর্যোদয়ের দেশে হোক নতুন সূর্যোদয়' স্লোগান ঠিক করেছিলেন সমকাল সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে স্লোগান এখন আর হুবহু কাজে লাগছে না বটে, তবে আমাদের ধারাবাহিক সাফল্যের আলোকে তা একটু বদলে নিয়ে এটুকু তো বলতেই পারি- 'এবার হোক নতুন সূর্যোদয়'।

সভাপতি, বাংলাদেশ বায়োলজি অলিম্পিয়াড কমিটি এবং অধ্যাপক শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়