আইসোলেশন 'সুবিধা'

নাকের বদলে নরুন!

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০     আপডেট: ০৬ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

অস্বীকার করার অবকাশ নেই যে- কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের জন্যই করোনা-যুদ্ধ এক নতুন পরিস্থিতি। যে কারণে বৈশ্বিক এই দুর্যোগ মোকাবিলা করতে গিয়ে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বিপাকও পুরোনো। কিন্তু ঈদুল আজহার ছুটি শুরুর মাত্র এক কর্মদিবস আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ যে পরিপত্র জারি করেছে, তা কতখানি অনিয়ম আর কতখানি অবিমৃশ্যকারিতা তার মীমাংসা সহজ নয়। বুধবার সমকালে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আলোচ্য পরিপত্রে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য আইসোলেশন আবাসন সুবিধা সম্পর্কে যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তা নানা দিক থেকেই অসুবিধাজনক। বিভিন্ন হাসপাতালে দায়িত্বরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এতদিন টানা এক সপ্তাহ ডিউটি করে দুই সপ্তাহের আইসোলেশন সুবিধা পেতেন। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ নির্ধারিত যাতায়াত, খাদ্য ও আবাসন সুবিধা ছিল। বস্তুত করোনা মোকাবিলার সঙ্গে জড়িতদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে এটাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, টানা দুই সপ্তাহ ডিউটি করে পরবর্তী দুই সপ্তাহের আইসোলেশনে থাকতে হবে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়। এর অর্থ, বেশিরভাগ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরে যেতে হবে দুই সপ্তাহের জন্য। এতে করে স্পষ্টতই সংশ্নিষ্টদের পরিবারও করোনা সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়বে। নিজ ব্যবস্থাপনায় যাতায়াতের যে কথা বলা হয়েছে, সেটাও সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়াবে বৈ কমাবে না। একজনের সুরক্ষার নামে অনেকের জন্য ঝুঁকি তৈরির এই উদ্যোগ যেন নাকের বদলে নরুন প্রাপ্তি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম সমকালকে যথার্থই বলেছেন যে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের এই পরিপত্র যেমন অবৈজ্ঞানিক, তেমনই অমানবিক। আমরা তার এই আশঙ্কার সঙ্গেও ঐকমত্য পোষণ করি যে, পরিপত্রটি জারি করার আগে উপযুক্ত চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করা হয়নি। আমরা অস্বীকার করি না যে, বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত। চাইলেই চিকিৎসকদের করোনা যুদ্ধকালীন 'পাঁচ তারকা আবাসন' দেওয়া যাবে না। কিন্তু তাদের নূ্যনতম সুবিধা নিশ্চিত করতেই হবে। নিশ্চিত করতে হবে সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যবিধি। আমরা দেখছি, স্বাস্থ্য খাতে কর্তাদের ঔদাসীন্য ও দায়িত্বহীনতার কারণে বিপুল দুর্নীতির খবর বের হয়ে আসছে। দুর্মুখরা যদি বলে যে, সাশ্রয়ের এই মনোভাব তখন কোথায় ছিল, কী জবাব দেবেন সংশ্নিষ্টরা? বলা বাহুল্য, ওই অর্থ সাশ্রয় করা হলে করোনা যোদ্ধাদের সুরক্ষা ও সুবিধা নিয়ে এই টানাটানির প্রয়োজন হতো না। যারা আক্ষরিক অর্থেই জীবন বাজি রেখে অন্যের জীবন রক্ষায় দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের সপরিবারে করোনা সংক্রমণ ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়ার আয়োজন কেবল অনিয়ম নয়, অবিমৃশ্যকারিতা। কেউ যদি বলেন, যারা এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, তাদের জন্যও এমন দায়িত্ব ও আবাসন বরাদ্দ করা উচিত- তা অত্যুক্তি হতে পারে না। সমকালের প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষ পরিপত্রটি এখনই কার্যকর না করার যে অজুহাত দেখিয়েছে, তা আরও অসংগত। সরকারি পরিপত্রটি তাহলে ছেলেখেলা মাত্র? ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর খেয়ালখুশির ব্যাপার? আমরা দেখেছি, বাস্তবে মুগদা হাসপাতালে এ নিয়ে বিভ্রান্তি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা। কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে সুরাহা হলেও দেশের অন্যত্রও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আমরা মনে করি, এই নির্দেশনার মধ্য দিয়ে বিভাগটির নীতিনির্ধারকরা যথার্থ সংবেদনশীলতা প্রদর্শনেও ব্যর্থ হয়েছেন। এ ব্যাপারে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে তা সংগত। তাদের সমর্থন করে আমরাও বলতে চাই, অবিলম্বে পরিপত্রটি প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্ম ও সংগনিরোধকালীন সব ধরনের সুবিধাও। বেদনার বিষয়, সর্বব্যাপ্ত এই দুর্যোগে যেখানে কর্তৃপক্ষের তরফে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত প্রত্যাশিত ছিল, সেখানে তারা তাৎক্ষণিকতায় পরিচালিত হচ্ছেন। যেখানে গোটা স্বাস্থ্য বিভাগের করোনা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা, সেখানে যদি চিকিৎসকদের নিজের সুরক্ষা ও আবাসন সুবিধা নিয়ে লড়াই করতে হয়, তাহলে আসল যুদ্ধে জয় আসবে কীভাবে?