স্বাস্থ্য খাত ঢেলে সাজাতে হবে যেভাবে

করোনাদুর্যোগ

প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ডা. এম এ আজিজ

কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভাবে আজ বদলে যাচ্ছে পৃথিবী, মানুষের জীবনযাপন, রাজনীতি, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, এমনকি সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে আজ সময় এসেছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ভাবার, কথা বলার। করোনা মহামারিতে সব দেশই তাদের নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রকৃত রূপ দেখতে পেয়েছে। যারা নিজেদের শক্তিশালী মনে করত তারাও আজ অসহায়। আর তাই সবার নজর এখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর দিকে।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ঢেলে সাজিয়েছিলেন স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। চিকিৎসকদের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা ও ইন-সার্ভিস ট্রেনিং প্রথা চালুর মাধ্যমে চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন সাব-সেন্টার, নিপসম, বিএমআরসি, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজসহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আরও অনেক কিছু। পরবর্তী সময়ে আমরা চিকিৎসক সমাজ একুশ বছর ২১ দফা ও ২৩ দফা নিয়ে আন্দোলন করেছিলাম। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ডা. মিলন শহীদ হওয়ার পর আমরা আশা করেছিলাম পরবর্তী গণতান্ত্রিক সরকার চিকিৎসকসহ সব পেশাজীবীর দাবিদাওয়া পূরণ করবে, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর আমাদের আরও অনেক উন্নয়ন লক্ষ্য করেছি। জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি, কমিউনিটি ক্লিনিক, মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষায়িত হাসপাতালসহ অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। ২০০১ সালের পর কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দেওয়া হয়, অন্যান্য ক্ষেত্রেও অর্জনগুলো পিছিয়ে পড়ে। ২০০৯ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য সেক্টর আবার উন্নয়নের গতি ফিরে পেল। প্রতিষ্ঠা হতে লাগল আরও বিশেষায়িত হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ। আবারও চালু হলো কমিউনিটি ক্লিনিক। আন্তর্জাতিক অনেক সূচকেও এগিয়ে গেল স্বাস্থ্য খাত। ফলে নানা পুরস্কারে ভূষিত হন জননেত্রী শেখ হাসিনা।
গত এক যুগে স্বাস্থ্য খাতে যে উন্নয়ন হয়েছে তার ফলেই কভিড-১৯ মহামারিও মোকাবিলা করে যাচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। স্বল্প সময়েও অনেক উন্নত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেখানে ভেঙে পড়েছে, সেখানে আমরা গত পাঁচ মাস আমাদের বিদ্যমান স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে সফলতার সঙ্গে কভিড-১৯ মোকাবিলা করে যাচ্ছি। এর মধ্যেও অনেক আলোচনা, সমালোচনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্নীতির জন্ম হয়েছে স্বাস্থ্য খাতে। জনগণের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী; আর এখনই সময় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর।
আমাদের দেশের প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেই গুটিবসন্ত, কলেরা/ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে সফলতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের মাধ্যমে। প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কমিউনিটি ক্লিনিক আজ সারাবিশ্বে নন্দিত ও প্রশংসনীয়। আমাদের দেশে এখন শহরাঞ্চলে প্রাইমারি হেলথ কেয়ারকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। আজকের বাস্তবতায় এমন এক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দরকার, যা মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা করবে। সে জন্য কমিউনিটি ক্লিনিককে আরও শক্তিশালী করতে কমিউনিটি ক্লিনিকে মাতৃত্ব ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত বাস্তবায়ন করা যেতে পারে; উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার পদমর্যাদা উন্নীত করা যেতে পারে; উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও), মেডিকেল অফিসার এবং ডেন্টাল সার্জনের পদ সৃষ্টি করে বহির্বিভাগ সেবাকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে; উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ২৪ ঘণ্টা মাতৃত্ব ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা চালু করা যেতে পারে; জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনের পদমর্যাদা উন্নীত করতে হবে; সেইসঙ্গে কমপক্ষে তিনটি অতিরিক্ত সিভিল সার্জনের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে (অতিরিক্ত সিভিল সার্জন প্রাইমারি হেলথ কেয়ার, অতিরিক্ত সিভিল সার্জন প্রশাসন, অতিরিক্ত সিভিল সার্জন স্বাস্থ্যসেবা)।
জেলা সদর হাসপাতালগুলোকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে জেলার স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা দরকার। সেখানে নতুন পদ সৃষ্টি করে জনবল বৃদ্ধি করা যেতে পারে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার (ইএমও), মেডিকেল অফিসার, ডেন্টাল সার্জনসহ জনসাধারণের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব বিভাগে স্পেশালিস্ট পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে স্বয়ংসম্পূর্ণ আইসিইউ, সিসিইউ, অপারেশন থিয়েটারের সঙ্গে সিটি-এমআরআইসহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যেতে পারে।
স্বাস্থ্যসেবাকে যুগোপযোগী, সুশৃঙ্খল ও কার্যকর সেবা প্রদানের লক্ষ্যে উন্নত দেশের মতো রেফারেল সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। বিভাগীয় পরিচালকের পদমর্যাদা উন্নীত করতে হবে এবং উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালক পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ, বিশেষায়িত হাসপাতালের পরিচালক ও অধ্যাপকের পদমর্যাদা উন্নীত করা যেতে পারে। দেশে স্বাস্থ্য সেক্টরের কাজকে গতিশীল করতে একটি স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটট স্থাপন জরুরি যা অতি দ্রুত করা যেতে পারে।
মন্ত্রণালয়ে চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব থাকতে হবে এবং আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈষম্য দূর করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর অধীন সব অধিদপ্তরকে একই ভবনে এনে স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনিক 'ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রবর্তন করা গেলে তা হবে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। বিসিএসে বিদ্যমান একটি ক্যাডারকে নিম্নলিখিত চারটি স্তরে সাজাতে হবে, যেমন- বিসিএস স্বাস্থ্য প্রশাসন, বিসিএস স্বাস্থ্য শিক্ষা, বিসিএস স্বাস্থ্যসেবা, বিসিএস স্বাস্থ্য পরিবার পরিকল্পনা। এবং সব ক্যাডারের ডিজিকে গ্রেড-১ পদমর্যাদা দেওয়া যেতে পারে। বিসিএস লিখিত পরীক্ষাকে যুগোপযোগী করতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের স্বতন্ত্র সিলেবাস প্রণয়ন করা যেতে পারে।
আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করতে ও অপচয় রোধ করে দ্রুত, সঠিক ও প্রয়োজনমাফিক কেনাকাটার জন্য সব স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা যেতে পারে। চিকিৎসাসেবা জনগণের জন্য সহজলভ্য ও নিশ্চিত করতে দেশে ক্রমান্বয়ে হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু করা যেতে পারে।
পরিবার-পরিকল্পনা সব দেশেই ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথভিত্তিক সেবা এবং এই সেবায় চিকিৎসকের বিকল্প চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। কাজেই চিকিৎসকদের প্রাধান্য দিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে এবং মন্ত্রণালয়কে সেভাবে বিন্যস্ত করা যেতে পারে। বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণ করে। বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক একটি অধিদপ্তর প্রয়োজন। দেশে একটি ডেন্টাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ডেন্টাল সার্জনের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে।
হাসপাতালগুলোর ওষুধ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত বিএসসি-ফার্মাসিস্টের পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। দেশের ওষুধ শিল্প ও বিভিন্ন ফার্মেসির কথা চিন্তা করে ঔষধ প্রশাসনে নতুন পদ সৃষ্টি করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। নার্সিং অধিদপ্তরে পেশাদার নার্সিং কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি করে নার্সিং অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজাতে হবে। হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিককে আরও যুগোপযোগী করতে হবে। ইতোমধ্যে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে পদায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে ঢেলে সাজিয়ে আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কাজ করানো হয়। তাতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ব্যয় অধিক হয় এবং সময়ও বেশি লাগে। সেইসঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে কোনো জবাবদিহি থাকে না। কাজেই, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকেই করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতে সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে বাজেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এবার স্বাস্থ্য খাতে ২৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবিলায় ১০ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্মানী বাবদ ৪৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ হলো দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাব, দক্ষ জনবলের অভাব, লালফিতার দৌরাত্ম্য এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেট। এক্ষেত্রে সব প্রতিবন্ধকতা দূর করে বাজেটের যথাযথ ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সঠিক বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই।
কভিড-১৯ জনগণের দৃষ্টি উন্মোচন করে দিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে স্বাস্থ্য সেক্টরসহ দেশের সব উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই হয়েছে। আমাদের চিকিৎসকদের প্রত্যাশা- সময়ের দাবি, জনগণের দাবি, বিগত দিনের উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরেই এই দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে একটি গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, কভিড-উত্তর বাংলাদেশ এটাই প্রত্যাশা করে।
মহাসচিব, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ