ব্যাংক খাত

প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে 'ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম'

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০     আপডেট: ২৮ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সেলিম রেজা ফরহাদ হোসেন

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটাতে এবং দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা হিসেবে সরকার ১৯টি ভিন্ন ভিন্ন 'প্রণোদনা প্যাকেজের' আওতায় এক লাখ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ দিয়েছে। এটি আমাদের জিডিপির প্রায় ৩.৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকও ব্যাংকিং খাতের তারল্য বৃদ্ধিতে বিভিন্ন নীতি-পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারের এই প্রণোদনা প্যাকেজ একটি বিশেষ উদ্যোগ, যার কার্যকর বাস্তবায়ন অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে বিশেষ অবদান রাখতে পারে।

প্রণোদনা প্যাকেজের বড় অংশটি এমনভাবে দেওয়া হবে যেন ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তা হ্রাসকৃত হারে ঋণ পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় এই অর্থ ব্যাংকগুলোকে দেবে। ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব হবে ক্ষতিগ্রস্ত তালিকাভুক্ত গ্রাহকদের পালাক্রমে এই ঋণ দেওয়া- যার অর্থ দাঁড়ায়, সব গ্রাহকের ঋণের ঝুঁকি ব্যাংকিং খাতকেই বহন করতে হবে।

এমন এক সময়ে করোনা মহামারি এসেছে যখন বাংলাদেশের ব্যাংক খাত বহু বছরের উচ্চ অনুৎপাদনশীল ঋণ ও তারল্য সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে। আবার ১ এপ্রিল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণের সুদ ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ায় ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহক ঋণের সুদ থেকে আয় হারিয়েছে ২০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত।

ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়ার ফলে ব্যাংক খাতে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ঝুঁকি নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে খুব কম ব্যাংকই সবসময় ঝুঁকির মধ্যে থাকা কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগে (সিএমএসএমই) নতুন করে ঝুঁকি নিতে চাইবে। এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম (সিজিএস), যা কোনো তৃতীয়পক্ষ দ্বারা ঋণদাতাদের ঋণ ঝুঁকি প্রশমন করে। কোনো গ্রাহক ঋণখেলাপি হয়ে পড়লে ঋণদাতার ক্ষতির একটি অংশ নির্ধারিত ফির বিপরীতে পুষিয়ে দেওয়া হয়।

সিজিএস বা ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম তুলনামূলক ঝুঁকিপূর্ণ উদ্যোগে ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করে। বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই সিএমএসএমইর জন্য এক ধরনের ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা যদি শুধু দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে তাকাই তাহলে ধারণা পেয়ে যাব ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম ব্যবহার করে কীভাবে ব্যাংকগুলোকে ঋণ দিতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সিএমএসএমই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে।

আমাদের ব্যাংক খাত দীর্ঘদিন ধরে ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমের কথা বলে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা আরও প্রাসঙ্গিক। জানা গেছে, বিশ্বব্যাংক সিএমএসএমইর জন্য ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম গঠন করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্র্রতি এর একটি প্রাথমিক রূপরেখা তৈরি করেছে। মতামতের জন্য অংশীজনের কাছে পাঠিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, শিগগিরই বাস্তবায়ন শুরু হবে। সিজিএস এমনভাবে করা উচিত যাতে গ্রাহক এবং অংশগ্রহণকারী ব্যাংক, উভয়ের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য ও বাণিজ্যিকভাবে জুতসই হয়। একটি দুর্বল সিজিএস অংশীজনের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না এবং তারা এটা বাস্তবায়নও করতে পারবেন না। এটি তখন কারও কাজেও আসবে না।

বাংলাদেশের সিএমএসএমই খাতে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় ব্র্যাক ব্যাংক এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। একটি কার্যকর সিজিএস কীভাবে প্রণয়ন করা যেতে পারে সে ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে। আমাদের মতে সিজিএস যেমন হওয়া উচিত:

প্রথমত, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সিএমএসএমইগুলোর উপযোগিতা ও যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করতে হবে; ক. মাইক্রো, কুটিরশিল্প এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলোকে লক্ষ্য করে এবং নারী মালিকানাধীন ব্যবসাগুলোর জন্য বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া। খ. চলতি মূলধন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, উভয়ই এর আওতায় আসা প্রয়োজন। একজন সিএমএসএমই উদ্যোক্তার জন্য মূলধন ও চলতি ব্যয়ের মধ্যে পার্থক্য করা খুবই কঠিন এবং তা কারও করাও উচিত হবে না। সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ পাওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং তারা জানবেন কীভাবে এই তহবিল ব্যয় করবেন। গ. খাত শ্রেণিভুক্তর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। সিএমএসএমইর সব খাতকেই সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে। ঘ. উন্নত পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যাংক ঋণ পুনঃতফসিল এবং পুনর্গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিশ্চিত করতে হবে যেন সিজিএস গ্রাহক এবং ব্যাংকবান্ধব হয় এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে চালু করা সম্ভব হয়; ক. সিজিএসে দুটি প্রধান দৃষ্টিভঙ্গি থাকে। ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং পোর্টফোলিও দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই সুপারিশ করছি যে বাংলাদেশে পোর্টফোলিও দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা শ্রেয় হবে। কারণ এ ব্যবস্থায় ব্যাংক দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারে এবং বিপুলসংখ্যক এসএমই ঋণগ্রহীতার কাছে পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশে সিএমএসএমই খাতের যা আয়তন ও ব্যপ্তি, তাতে এখানে লোন বাই লোন দৃষ্টিভঙ্গি বেশ অবাস্তব প্রমাণিত হবে। খ. বাংলাদেশে এসএমই ঋণগ্রহীতাদের ঋণের সীমা সাধারণত ৫ লাখ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত হয়। তাই এসএমই ঋণের এই সীমার মধ্যেই সিজিএস হওয়া উচিত।

তৃতীয়ত, নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ঋণদাতাদের মূলধন অব্যাহতি প্রদান করে এমন আংশিক গ্যারান্টি ইস্যু করতে হবে; ক. সিজিএসের উচিত গ্যারান্টি কভারেজ রেশিওর মাধ্যমে ব্যাংকের ঝুঁকি হ্রাস করা যা সাধারণত মূল ঋণের একটি শতাংশের হিসেবে প্রকাশ করা হয়। গ্যারান্টি কভারেজ রেশিও এমন হওয়া উচিত, যেন ব্যাংকগুলো এর সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত বোধ করে। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থায় গ্যারান্টি কভারেজ রেশিও ৮০ শতাংশের কম হওয়া উচিত নয়। খ. সিজিএস এর উচিত দাবির সর্বোচ্চ ও গ্রহণযোগ্য একটি পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, বর্তমানে ব্যাংকিং খাতের সিএমএসএমই অংশের যে অবস্থা, তাতে স্বাভাবিক সময়ে সর্বোচ্চ সীমা ৩০ শতাংশ নির্ধারণ করা যুক্তিযুক্ত। আর বর্তমান মহামারি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সিজিএস সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করতে পারে। গ. গ্যারান্টির মধ্যে থাকা অন্তর্নিহিত ঋণ ঝুঁকির অনুপাতে ব্যাংককে মূলধন অব্যাহতি প্রদান করা উচিত সিজিএসের। ঘ. সিজিএসের নতুন ক্রেডিট নিরূপণ প্রয়োজনীয়তা আরোপ করা উচিত হবে না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিজস্ব ক্রেডিট মূল্যায়ন ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখা উচিত। ঙ. ঋণের ক্ষতি শ্রেণিবিন্যাসের জন্য সিজিএসের মাধ্যমে ঋণের নিশ্চয়তা যথাযথ বিধি দ্বারা মেনে চলা উচিত। চ. ঋণের লোকসান ব্যবস্থাপনার সময় নিজের গ্যারান্টিকৃত ঋণের অংশটি ঋণদাতাদের বাদ প্রদানের সুযোগ দেওয়া উচিত সিজিএসের।

চতুর্থত, একটি স্বচ্ছ এবং সঙ্গতিপূর্ণ ঝুঁকিভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ নীতিনির্ধারণ করতে হবে, যাতে ঋণের গ্যারান্টি কর্মসূচি আর্থিকভাবে টেকসই হয় এবং এসএমই উদ্যোক্তা এবং ঋণগ্রহীতার কাছে আকর্ষণীয় হয়; ক. মূল্য নির্ধারণ পরিবর্তনশীল হওয়া উচিত এবং আর্থিক শিল্পজুড়ে বিবেচনাপূর্ণ ক্রেডিট সংস্কৃতিকে কম খেলাপি ঋণের সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে কম ফি প্রস্তাব করে এগিয়ে নেওয়া উচিত। খ. সিজিএস ফিস বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হওয়া উচিত এবং ব্যাংকের জন্য খেলাপি ঋণ ০.৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত না। উচ্চ গ্যারান্টি ফি ঋণগ্রহীতার কাছে সিজিএস অনাকর্ষণীয় হয়ে যেতে পারে। গ. ঋণগ্রহীতারা নিজেরাই যেন ক্রেডিট গ্যারান্টি ফি পুনরায় পরিশোধ করতে পারেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সিজিএসের এমন সুযোগ দেওয়া উচিত।

পঞ্চমত, একটি কার্যকর, সুস্পষ্টভাবে নথিবদ্ধ এবং স্বচ্ছ দাবি ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া নকশা করা উচিত। এতে ঋণ উদ্ধারের জন্য প্রণোদনা সুবিধা এবং স্থানীয় আইনগত এবং নজরদারি কাঠামোর মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে; ক. সিজিএসে ঋণের অন্তর্ভুক্তির নিয়মাবলি এবং দাবির বিষয়টি দ্রুত, দক্ষতা এবং স্বচ্ছতার সঙ্গে হওয়া উচিত। আর পুরো প্রক্রিয়াটি হওয়া উচিত ডিজিটাইজড। খ. সিজিএসের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ভর করছে, দাবিনামা পেশের পর তা কীভাবে কার্যকর করা হয় তার ওপর। যে পরিস্থিতিতে দাবিনামা পেশ করা হবে, তা সিজিএস এবং ঋণগ্রহীতার মধ্যে স্পষ্ট ও যথাযথভাবে চুক্তিবদ্ধ হতে হবে। গ. ঋণ ছাড় করার পর দাবিনামা পেশের আগে সিজিএসে বাধ্যতামূলক নূ্যনতম একটি অপেক্ষাকালীন সময় থাকতে হবে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি যে, এই অপেক্ষাকালীন সময় অন্তত ১৮০ দিন হওয়া উচিত যেহেতু সিএমএসএমই খাতের ঋণের মেয়াদ স্বল্পমেয়াদি হয়। ঘ. একজন উদ্যোক্তার কাছ থেকে একের পর এক আসা দাবি বিভিন্ন ঋণগ্রহীতার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা এবং খতিয়ে দেখার সামর্থ্য সিজিএসের থাকা উচিত।

আমরা বিশ্বাস করি যে, একটি কার্যকর ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম কেবল সরকারের নতুন সিএমএসএমই প্রণোদনা প্যাকেজে ঋণ প্রদানের অংশই জোরদার করবে না, বিভিন্ন ব্যাংকের বর্তমান পোর্টফোলিওকে আরও উদ্দীপনা দেবে। একই সঙ্গে যে ব্যাংকগুলো এখনও এসব খাতে কাজ করেনি, তাদের নতুন পোর্টফোলিও শুরু করতে উৎসাহিত করবে।

ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও