সমকালীন প্রসঙ্গ

সামাজিক মাধ্যম কড়চা

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. জেবউননেছা

ধরা যাক 'ক' সামাজিক মাধ্যমে বেশি একটা ছবি আপলোড করে না। তার আশপাশে যতজন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে তাদের সবার ছবিতে মন্তব্য করে। তবে বিশেষ কাউকে কাউকে সে এড়িয়ে যায়। যাদের সে এড়িয়ে যায় তাদের ছবিতে লাইক কমেন্ট করলে, তাদের যারা প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের সঙ্গে 'ক' সম্পর্ক বিনষ্ট করতে চায় না। কেননা 'ক' সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে। 'খ' এর সঙ্গে 'গ' এর সম্পর্কের বয়স ২৫ বছর। 'খ' এর সামাজিক মাধ্যমে শত শত বন্ধুর ভিড়ে 'গ' এখন হারিয়ে যাওয়ার পথে। কিন্তু 'গ' ভীষণভাবে 'খ'-কে মনে করে। 'ঘ' এবং 'ঙ' এর মধ্য থেকে 'ঙ'-কে অনেকে শক্তিশালী মনে করে। কিন্তু 'ঙ' এর ভয়ে 'ঘ' এর কোনো ছবিতে 'ঙ' এর বন্ধুরা মন্তব্য প্রদান করে না। 'ঘ'-কে তার বন্ধুরা জানায়, আপনার কোনো ছবিতে মন্তব্য বা অন্য কোনো রিঅ্যাক্ট দিলে 'ঙ' খুব আগ্রাসী হয়। তাই আমরা নিলিপ্ত থাকি। 'চ' কোনো জায়গায় গেলেই সহজ-সরল মনে সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করে। দেখা গেল, 'চ'-এর অনেক শত্রু বেড়ে গেছে। 'ছ'-এর শিক্ষাদীক্ষা বেশি নেই। টাকা-পয়সা এবং সৌন্দর্য আছে। সে দামি পোশাক পরে নানা ঢংয়ে ছবি দিলেই তার ছবিতে শত শত মন্তব্য পড়ে।

ব্যক্তিগতভাবে ্‌একবার ছয় মাস পরীক্ষামূলকভাবে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা বন্ধ করেছিলাম। দেখা গেল, আপন কয়েকজন বন্ধু ছাড়া কেউ খবর নেয়নি। একবার ফেসবুক মেসেঞ্জারে হুমকির শিকারও হয়েছিলাম। এরপর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলাম। যেই আইডি থেকে হুমকিটি এসেছিল পরবর্তীকালে আইডিটি বন্ধ থাকার ফলে সেই ব্যক্তিকে নির্ণীত করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু আইডিটির শেষ অবস্থান নিশ্চিত করা গিয়েছিল। আমার ছেলে বলে, 'সামাজিক মাধ্যম ব্যাপন প্রক্রিয়ার মতো। যতটুকু দরকার ততটুকুই ব্যবহার করা ভালো।' শিক্ষার্থীবৃন্দ সামাজিক মাধ্যম সম্পর্কে বলেছে, 'দূরের বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে গিয়ে কাছের বন্ধুদের ভুলে যাই। পরিচিতির পরিসর বৃদ্ধি পায়, দূরত্ব কমে। গুজব ছড়ানো সহজ। অতিরিক্ত আসক্তির ফলে মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। পরশ্রীকাতরতা, হিংসা বাড়ছে। এমনভাবে বেড়েছে যে, কে কতটা উপরে উঠতে পারে এর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় হাবুডুবু খেয়ে যাচ্ছে সবাই। সামাজিক মাধ্যম মানুষের মানসিকতা কতটা সস্তা হতে পারে তা বোঝা গেছে। কেউ ভালো কিছু করলে, স্রোতের বিপরীতে কিছু করলে সেটাকে প্রেরণা না দিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছে। সরলতার সুযোগ গ্রহণ করে সাহায্যের নামে অনেকে ব্যবসা করছে। এটি সামাজিক ব্যধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অনেক অসাধু মানুষ এর অপব্যবহার করে সমাজের ক্ষতিসাধন করছে। নানা রকমের অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। মানুষ এখন আর আগের মতো নিজের পরিবারকে সময় দেয় না। মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকে সংকীর্ণ করে দিয়েছে। কথা বলার সুযোগ পাওয়ায় কাকে কখন কি বলতে হবে সেই কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে অনেকে।

ফেসবুকের অতিরিক্ত ব্যবহার পাঁচগুণ পর্যন্ত হতাশা বাড়িয়ে দেয়। তবে এর মধ্যে বহু পুরোনো বন্ধুদের কাছে পাওয়া যায়। এই মাধ্যম দিয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করা যায়। অনেক সময় সৃজনশীলতা প্রকাশের সুযোগ পাওয়া যায়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যায়। এর সঠিক ব্যবহার মানবসমাজ বদলাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ২০১৯ সালের শেষ দিকে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ২৫০ কোটি। বাংলাদেশ থেকে সামাজিক মাধ্যমে ফেসবুকে বছরে ১২ হাজার কোটি টাকা আয় করেছে। বিনিময়ে এই মাধ্যম ব্যবহার করে আমরা কতটুকু আয় করছি তা নিয়ে ভাবা দরকার। বাংলাদেশে ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটির ও বেশি।

মনোবিজ্ঞানী বলেছেন, 'সামাজিক মাধ্যমের কারণে টিনএজাররা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছে এবং তাদের শারীরিক স্বাস্থ্য খারাপ হচ্ছে।' বাবা-মায়েদের কড়া নজর রাখতে হবে সন্তানের দিকে। সামাজিক মাধ্যম একটি সৃষ্টিশীলতার মাধ্যম। এই মাধ্যমটি পরিবারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম নয়। কাকে সাহায্য করছি তার ছবি দিয়ে প্রচারের মাধ্যম নয়। নিজেকে নিরপেক্ষ রাখা, নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য সামাজিক মাধ্যম নয়। অন্যের উন্নতিতে হিংসা না করে তাকে শুভেচ্ছা প্রদান করি। সামাজিক মাধ্যমে কিছুটা সময় কাটানো যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, আপনার সবচেয়ে কাছের বন্ধুটির জন্মদিনে আপনি যদি তাকে একটি ফোন করেন সে আরও বেশি খুশি হবে। এ ক্ষেত্রে আমি যা করি, আমার কাছের কারও জন্মদিন হলে তাকে ফোন দিই। যদি জানতে পারি কারও বাবা, মা, ভাইবোন, সন্তান অসুস্থ কমেন্ট বক্সে একটা কমেন্ট দিয়েই দায়িত্ব পালন করি না। তাকে ফোন দিই। এক সময় চিঠি ছিল। চিঠি হারিয়ে এলো মুঠোফোন। মুঠোফোন এখন সামাজিক মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে হারিয়ে যাওয়ার পথে। আমাদের বিন্দু বিন্দু আবেগ-অনুভূতি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করার জন্য সামাজিক মাধ্যম ভালো ভূমিকা পালন করতে পারে। সামাজিক মাধ্যমের সদস্যদের 'বন্ধু' বলা হয়। যদি সত্যি 'বন্ধু' হয় তাহলে সেই বন্ধুটি কেমন আছে তাকে ছোট একটি ফোন করা, খবর নেওয়াই বন্ধুত্বের আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।

আমার এক স্প্যানিশ বান্ধবী আছে নাম তার সোফিয়া। করোনার সময় খবর নেওয়ার জন্য তাকে ফোন করি। সে আমাকে বলছে, এ রকম, ফেসবুকে দেশে-বিদেশে আমার হাজারো বন্ধু আছে। কেউ ফোন দেয়নি। তুমি কতদূর থেকে ফোন দিলে আমি বিস্মিত। আমার উত্তর ছিল, তুমি আমার ফেসবুকের ভার্চুয়াল বন্ধু নও। মানসিক এবং আত্মিক বন্ধু।

আসুন, হাজার হাজার বন্ধুর মাঝে সামাজিক মাধ্যম যুগের আগের বন্ধুটিকে খুঁজি। ভোরের শিশির, বৃষ্টি, সূর্যাস্ত, পূর্ণিমা, পাহাড়, ঝরনা, নদী একান্তে প্রিয়জনের সঙ্গে উপভোগ করে নীরবে অবসর সময়ে ছবি আপলোড করি। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ বলেছেন, 'ফেসবুক মূলত কোনো প্রতিষ্ঠান হওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়নি। এটি পৃথিবীকে আরও উন্মুক্ত এবং সংযুক্ত করার সামাজিক মিশন সম্পন্ন করতে গড়ে উঠেছিল। আমার বাবা বলেন, 'ফেসবুকে বেশি সময় না কাটিয়ে বই পড়। তাহলেই তুমি ভালো লেখক, প্রাবন্ধিক, গবেষক এবং সমালোচক হতে পারবে।'

সহযোগী অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
asiranjar@yahoo.com