পরিবেশ রক্ষায় ছাড় নয়

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

এবার বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে। কভিড-১৯ নামে প্রাণঘাতী ভাইরাসে এখন গোটা বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশও আক্রান্ত। এটা ঠিক, পরিবেশ দিবস পালন আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। পরিবেশ-প্রতিবেশ সুরক্ষায় অঙ্গীকার শানিত করার উপলক্ষ ছাড়া কিছু নয়। এবার সেই আনুষ্ঠানিকতাও সম্ভব হচ্ছে না করোনা সতর্কতার কারণে। জনসমাগম নিষিদ্ধ থাকায় এই দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভাগুলো 'ভার্চুয়ালি' অনুষ্ঠিত হতে দেখছি আমরা। সমকালের পক্ষেও আমরা এই সম্পাদকীয় স্তম্ভ ছাড়াও পূর্ণ পৃষ্ঠা নিবেদন করছি পরিবেশ-পরিবেশ দিবস উপলক্ষে। আমরা প্রত্যাশা করি, এসব আলোচনা, অনুষ্ঠান ও লেখালেখির মধ্য দিয়ে পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার, বোঝাপড়া ও প্রত্যয় জোরদার হবে। এটাও প্রত্যাশিত যে, মাঠের পরিবেশ সুরক্ষায়ও এর প্রভাব পড়বে। বস্তুত এক্ষেত্রে ছাড় দেওয়ার অবকাশ নেই। ইতোমধ্যে স্পষ্ট যে, পরিবেশ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থার প্রতি ঔদাসীন্য ও নিষ্ঠুরতাই মানব সমাজে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও বিস্তৃতি ডেকে এনেছে। বিশেষত বন্যপ্রাণীর নির্বিচার ব্যবসার কারণে বন্যপ্রাণীর ভাইরাসের মানবদেহে সংক্রমণ ও রূপান্তর ঘটেছে। এটা নিশ্চিত, প্রবাদ মেনে বন্যরা যদি বনে সুন্দর থাকত, তাহলে লোকায়লেও মানুষ থাকত নিরাপদ। বিলম্বে হলেও এ ব্যাপারে সতর্ক ও সচেতন হতেই হবে আমাদের।

আমরা দেখছি, জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির পক্ষ থেকে এ বছর পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য হিসেবে জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এই প্রতিপাদ্য বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা দেখছি- এখানে বনজ ও জলজ উভয় প্রতিবেশ ব্যবস্থাই হুমকির মুখে। একদিকে যেমন বন উজাড় হচ্ছে ও পাহাড় কাটা পড়ছে; অন্যদিকে দখল, দূষণ ও ভরাটের শিকার হচ্ছে নদী-নালা, খাল-বিল। এমনকি এত মূল্যবান সমুদ্রসীমা তাও দূষণের শিকার হচ্ছে। এর ফলে বহু জীব ও অণুজীবের আবাস ও প্রজনন ধ্বংস হচ্ছে। প্রকৃতির অমূল্য উপহার সুন্দরবনের গুরুত্বও আমরা যথাযথ বুঝতে পারছি কিনা সন্দেহ রয়েছে। স্বীকার করতে হবে, প্রাকৃতিক বন ক্রমশ কমে গেলেও দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়েছে সামাজিক বনায়ন। কিন্তু ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সৃজিত সবুজের বড় অংশই প্রতিবেশসম্মত নয়। ফলে তা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। আর মনে রাখা জরুরি, প্রাকৃতিক বন বা জলাশয়ের ক্ষতি মনুষ্যসৃষ্ট কোনো কিছু দিয়েই পূরণ সম্ভব নয়। এটাও ভুলে যাওয়া চলবে না যে, বিষয়টি নিছক 'প্রকৃতির ক্ষতি' নয়। জীববৈচিত্র্য বিপন্ন হলে মানুষের অস্তিত্বও সংকটের মুখে পড়তে বাধ্য। করোনাভাইরাস আমাদের সামনে সেই সত্য আরেকবার উন্মোচন করেছে।

আমরা দেখতে চাইব, করোনা পরিস্থিতিতেও পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ কোনো ছাড় দিচ্ছে না। ইতোমধ্যে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে আমরা দেখছি যে, প্রশাসন যখন করোনা মোকাবিলায় ব্যস্ত, তখন বন, বন্যপ্রাণী বা নদীখেকোরা থেমে নেই। রাতের আঁধারেও নদী থেকে বালু উত্তোলনের খবর এসেছে। খবর এসেছে বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণী পাচারেরও। পরিবেশ বিনাশকারীদের এই অবিমৃশ্যকারিতা রুখতেই হবে। বাংলা প্রবাদে আছে, চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনি। করোনা পরিস্থিতিও রুখতে পারছে না তাদের। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও প্রত্যক্ষ। আমরা দেখি, প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটে। প্রায় প্রতিবছর বন্যায় ঘটে ফসলহানি, নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুতি। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও ক্রমে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। অথচ দেশের প্রতিবেশ ব্যবস্থা যদি অক্ষুণ্ণ থাকত, তাহলে এসব দুর্যোগের প্রভাব এতটা প্রাণঘাতী হতো না। জীবন ও জীবিকার সুযোগও বিস্তৃত হতো। এমন পরিস্থিতিতে পরিবেশ সুরক্ষায় ছাড় দেওয়া মানে বাংলাদেশ সুরক্ষায় ছাড় দেওয়া। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের জীবন ও প্রকৃতি এভাবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের ভোগে বিনষ্ট হতে পারে না।