পরিবেশ সুরক্ষায় অঙ্গীকার

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. মাহবুবা নাসরীন

পরিবেশ দূষণ আবারও আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই দেখছেন, সবুজ বেষ্টনী আর ডলফিন বা বিভিন্ন প্রজাতির মুখরতায় কভিড-১৯-এর কিছু ইতিবাচক দিক হিসেবে। তবে এই যোগসূত্র যে দীর্ঘস্থায়ী নয়, তা অর্থনৈতিক বিশ্নেষণে প্রতীয়মান হয়েছে। জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্বব্যাপী, এর পাশাপাশি বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপরে পড়েছে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তন বা পরিবেশগত ঝুঁকি মোকাবিলার যেসব পরিকল্পনা তা বাস্তবায়নের জন্য অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার বিষয়ে অনেকে জোর দিচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন-২৬ অনুষ্ঠিত হয়নি কভিড-১৯-এর কারণে। পরিবেশের আদিকল্প নিয়ে যে ধরনের বিতর্ক চলছিল, সেই আদিকল্প বা প্যারাডাইম পরিবর্তন আবারও সামনে এসেছে। এ ক্ষেত্রে সেই দেশগুলো সফল হবে, যারা পরিবেশ দূষণ রোধে বেশি বিনিয়োগ করবে। গ্যারি বেকারের যে তত্ত্ব ছিল- উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক কারণেই পরিবেশ দূষণ বা দুর্যোগের ঝুঁকি কাটিয়ে উঠতে পারে, সেটা হয়তো আর গ্রহণযোগ্য হবে না অনেকের কাছে। বরং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশের উপাদানগুলোকে রক্ষার সংকল্পে এগিয়ে যাওয়া হবে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান উপায়।

এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আনা হয়। শিল্পায়িত দেশ না হয়েও যে দেশ পরিবেশ বা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নাজুকতার মূল্য দিচ্ছে; ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার সঙ্গে যার মোকাবিলা হয় প্রতিনিয়ত। তথাপি, বাংলাদেশকে 'রেসিলিয়েন্স' দেশ হিসেবে দেখা হয় এর নেতৃত্বের কারণে। যে দেশের জনগণ ঘুরে দাঁড়াতে পারত ঠিকই কিন্তু পূর্বের অবস্থায় ফিরতে করতে হয় অবারিত পরিশ্রম। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা আইন পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকরী ভূমিকা রাখছিল না। সেই দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ২০১৫ সালে 'চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ' হিসেবে স্বীকৃতি পান বা বিশ্বনেতাদের মধ্যে অন্যতম স্থানে থাকেন, তখন সবার দৃষ্টি পড়ে এই দেশটির ওপর। পরিবেশ সংরক্ষণ নীতিমালা, আইনি কাঠামো নিয়ে ২০১০ সাল থেকে নেওয়া তার পদক্ষেপগুলো তাত্ত্বিক কাঠামোতে স্থান পায়। পরিবেশ আদালত আইন-২০১০; বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২; ইটভাটা ও এর স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩; জীববৈচিত্র্য রক্ষা আইন-২০১৭, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তহবিল গঠন, এমনি বহুতর গুরুত্বপূর্ণ দলিল স্থান পায়- পরিবেশ রক্ষায় সরকারপ্রধানের ভূমিকা। জাতীয় সংরক্ষণ নীতি বহু বছর পর বাস্তবায়িত হচ্ছে পুনরায় বহুল সংশোধনের মাধ্যমে। পরিবেশের উপাদান বনজসম্পদ, কৃষিসম্পদ, পানিসম্পদ, পশুসম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশের রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। দেশের ইতিহাসে এই প্রথমবার মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে কাগজবিহীন।

জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় গত ১০ বছরে গৃহীত পদক্ষেপের কারণে সুন্দরবনে বাংলাদেশের অংশে আম্পান আঘাত হানলেও বাঁচিয়েছে মানুষ ও বিভিন্ন প্রজাতি। লবণাক্ত পানি ঢুকে ফসল ও বেড়িবাঁধগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা সত্ত্বেও। গেওয়া, গরান, সুন্দরীসহ ১২ হাজার গাছের ক্ষতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাৎক্ষণিকভাবে শুরু হয়েছে বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ। আশা করা যাচ্ছে, ডেল্টা প্রকল্প শেষ হলে বেড়িবাঁধের স্থায়ী সমাধান আসবে। নদীর জায়গা ছেড়ে বাঁধ নির্মাণ ও বাঁধের উচ্চতা বাড়ানো আর বাঁধের পেছনে আরও বেশি ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বৃদ্ধি করতে পারলে বাংলাদেশেরর দক্ষিণাঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আবার ফিরে যাবে পূর্বের স্থানে।

তৈরি পোশাক বা রপ্তানিমুখী শিল্পের ওপর বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটাই নির্ভর করলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শূন্য নির্গমন নীতির (জিরো ডিসচার্জ পলিসি) কারণে শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়েছে। ১৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, ইটিপি বা এটিপি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার জন্য। বর্তমানে (ডিসেম্বর ২০১৯) ২৪০০ শিল্পের ১৯২০টিতে ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়াও সারাদেশে ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এক কোটি বৃক্ষরোপণ করা হয়েছে। কাগজ কম ব্যবহার করে তথ্যপ্রযুক্তিগত সেবা যাতে বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করে যাচ্ছেন ডিজিটাল বাংলাদেশের এই স্বপ্নদ্রষ্টা। কপ-২৫-এর ভাষণে তিনি বলেছেন, পরিবেশের ক্রমাগত অবক্ষয় রোধে আমাদের প্যারিস চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আর তাই নাজুক দেশগুলো নিজেরা তো চেষ্টা করবেই; বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে সহায়তা করবে। এর বিকল্প নেই।

আমরা যখন নতুন স্বাভাবিকতায় ফিরে যাব, তখনও চাইব আমাদের পৃথিবী হোক দূষণমুক্ত আর আমরা বসবাস করি সব প্রজাতিকে সঙ্গে নিয়ে।

পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়