বিশ্ব পরিবেশ দিবস

জনপরিসরের 'পরিবেশ-জিজ্ঞাসা'

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

পাভেল পার্থ

করোনার নিদানে বৈশ্বিক জ্ঞানকাণ্ড যে দুটি ডালে প্রসারিত হচ্ছে, তার একটি 'পরিবেশ-জিজ্ঞাসা'। মাতৃদুনিয়ার প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশের সুরক্ষা প্রশ্ন। প্রতিটি দিবসের একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়। যেমন এই করোনাকালে পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য- 'প্রাণবৈচিত্র্য'। যেমন ২২ মে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল 'প্রকৃতির মাঝেই সকল সমাধান'। মনে হলো, ২০ বছর ধরে জিইয়ে রাখা আলাপখানিকে আবারও টেনে আনি।

উন্নয়নে উধাও বৈচিত্র্য

বৈচিত্র্যের কোনো একক সংজ্ঞা কি দাঁড় করানো সম্ভব? তারপরও মোটা বা চিকন দাগে বৈচিত্র্যের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ধরন নিয়ে আমরা মুখর থাকি। ভৌগোলিকভাবে একটা ছোট্ট দেশ হয়েও বৈচিত্র্য-বৈভবে বাংলাদেশ অনন্য। একক আয়তনে দুনিয়ার বৃহত্তম বাদাবন, মিষ্টিজলের রাতারগুল অরণ্য, বৃহত্তম সমুদ্রসৈকত, ৩০টি কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চল, ১৭টি জল-প্রতিবেশ অঞ্চল আছে এখানে। এই একটুখানি ছোট্ট দেশে যেখানে মানুষ গিজগিজ করে; এখানে এখনও ১০ হাজার ধানের জাত, দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি চামচ ঠুঁটো বাটান পাখি, ইরাবতী ডলফিনের বাস এখানেই। নরম খোলের কালো কচ্ছপ থেকে শুরু করে বট আর কচুর বৈচিত্র্য এখনও বেশি। বহুল আদৃত বৈশ্বিক সবজি বেগুনের আদি জন্মভূমি বাংলাদেশ। এখনও এখানে পঞ্চাশেরও বেশি রক্তলাগা আদিবাসী ভাষা টিকে থাকার লড়াই করছে। কিন্তু রাষ্ট্র কি বিশ্ববৈচিত্র্য-বিমুখ? বৈচিত্র্যকে পায়ে পিষে বারবার ভুঁড়ি বাগায় তাক লাগানো উন্নয়ন। প্রাণজগতের বিবর্তনের গণিতে কোনো প্রাণ এক সময় হারিয়ে যায়, আবার অন্য রূপে বিকশিত হয়। কিন্তু এই আলাপে প্রশ্ন করা হচ্ছে, জোরজবরদস্তি করে যখন আমরা প্রাণপ্রজাতিগুলোর খুন করছি। বিচরণস্থল চুরমার করে দিচ্ছি বা লুট করে নিচ্ছি শেষ মুখের গ্রাস। একটা পরিসংখ্যান টানা যাক, ১৯৯০-এর দিকে প্রতি হাজার বছরে দুনিয়া থেকে একটি প্রজাতি চিরতরে হারিয়ে যেত। মাত্র ৩০ বছর পর আজ প্রতি ১০ বছরে হাজার প্রজাতি দুনিয়া থেকে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে। যার বেশিরভাগই অণুজীব, পোকামাকড় কি খুদে জীব।

রোগ ও বন্যপ্রাণী

নানা তর্ক আছে, কীভাবে এই করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। গবেষণা বলছে, বাদুড় ও বনরুই থেকে এই করোনাভাইরাস মানুষের শরীরে আসতে পারে। যেমন সার্স বা নিপাহ বাদুড় থেকে, মশা যেমন চিকুগুনিয়া কি ডেঙ্গু ছড়ায়। মানুষই একটার পর একটা জুনোটিক ডিজিজ বা প্রাণিঘটিত রোগের সংক্রমণ হাজির করছে মানুষের সমাজে। এই করোনাভাইরাস তো দিব্যি প্রকৃতিতে তার মতো করেই ছিল। বাদুড় কি বনরুই যেখানেই থাকুক। কিন্তু মানুষ বাদুড় কি বনরুইকে বিনাশ করে করোনাকে নিজেই নিজের কাছে টেনে এনেছে। এখন একটি ভাইরাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হচ্ছে মানুষকে। একদিকে বন্যপ্রাণীর বিশাল বাজার চাঙ্গা রেখে একের পর এক প্রাণিঘটিত রোগ আর নিত্যনতুন মহামারি সামাল দেওয়ার যোগ্যতা প্রজাতি হিসেবে মানুষের এককভাবে নেই।

রাষ্ট্রনথিতে প্রাণবৈচিত্র্য

রাষ্ট্রের নথিতে 'প্রাণবৈচিত্র্য' প্রত্যয়টি নেই, আছে জীববৈচিত্র্য। ১৯৯২ সনে বিশ্ব ধরিত্রী সম্মেলনে আন্তর্জাতিক প্রাণবৈচিত্র্য সনদ ঘোষিত হয়। বাংলাদেশ এটি অনুমোদন ও স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে এর অনুকূলে একটি খসড়া তৈরি করে এবং ২০১৭ সালে জীববৈচিত্র্য আইন চূড়ান্ত করে। আইনে প্রাণবৈচিত্র্যের সংজ্ঞায়ন এবং এর বিস্তারে 'মানুষকে' বাদ রাখা হয়েছে। এমনকি সংবিধানে প্রাণসম্পদ ও বৈচিত্র্য সুরক্ষার প্রশ্নটি রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ 'নাগরিক'-এর জন্যই প্রযোজ্য। প্রাণবৈচিত্র্য ও পরিবেশ প্রশ্নে রাষ্ট্রের চিন্তা ও মনোজগৎ প্রবলভাবে 'মানুষকেন্দ্রিক'। আর পরিবেশগত এই রাজনৈতিক দর্শনটাই পরিস্কার হওয়া জরুরি। মানুষকেন্দ্রিক চিন্তাকে বাতিল করে আজ সামগ্রিক প্রাণজগৎকে নিয়ে ভাবার ইশারা তৈরি হয়েছে করোনাকালে। আর এটিই করোনাকালের পাবলিক-পরিবেশ জিজ্ঞাসা। প্রাণজগতের দেখা-অদেখা সব সদস্যই রাষ্ট্রের সমান মনোযোগের অংশ হয়ে উঠুক।

আদি পরিবেশ-দর্শন

পরিবেশ ডিসকোর্সে অনেক চিন্তাদর্শন আলোচিত হয়। মানবতাবাদ, মানুষকেন্দ্রিক মতবাদ, তত্ত্বাবধায়ন মতবাদ, প্রাণকেন্দ্রিক মতবাদ, প্রাণীর অধিকার, প্রতিবেশকেন্দ্রিক মতবাদ কি প্রতিবেশ-নারীবাদ। করোনাকালে এক আদি মান্দি সাংসারেক পরিবেশ-দর্শনের বারবার আলাপে টেনেছি। এই দর্শনমতে, দেবতা বাগবা-বরম্বির চিপাংফাকসা (তলপেট) থেকে দুনিয়ার সব প্রাণ-প্রজাতির জন্ম হয়। এ কারণে সব প্রাণ-প্রজাতি একই সংসারের বাসিন্দা। এর নামই জগৎসংসার। এই সংসারে একটা বনরুই বা অজগর বিপদে পড়লে এর প্রভাব মানুষ কি পাখিদের সংসারেও পড়ে। একটা উইঢিবির শরীর দেখেই বোঝা যায়, গ্রামের মানুষ কোনো অসুখে পড়বে কিনা? সাংসারেক মতে, পৃথিবী কেবল মানুষের নয়; মানুষও এই পৃথিবীর। এই আদি সাংসারেক দর্শনের মতো করে কি আবার ভাবা যায়?

পরিবেশ-জিজ্ঞাসার বিস্তার

উজান থেকে ভাটিতে বয়ে চলে একটি নদীর সংসার। এখানে মাছ থাকে; কাঁকড়া, ডলফিন, কচ্ছপ, সাপ, গুল্ম কি পাখি থাকে। এই জলধারা মানুষের পেশা ও জীবন সাজিয়ে দেয়। বৃহৎ বাঁধ, জলবিদ্যুৎ কি কারখানার বর্জ্য দিয়ে কি নদীর এই জটিল সংসার এক নিমিষে তছনছ করে ফেলা যায়? কিউসেকের মাপে এই জীবন কি কেটে টুকরো টুকরো হয়? চাইলেই কি একটি পাহাড় চিনামাটির কারখানায় তোলা যায়? মাটির তলার জল নিঃস্ব করে কার বাণিজ্যকে চাঙ্গা রাখতে চায় সবুজ-বিপ্লব? একের পর এক অরণ্যকে নিদান করে কীসের উন্নয়ন, কার বিলাসিতা? একের পর এক কার্বনের ছাপ জমছে মাতৃদুনিয়ায়। আমাজন থেকে অস্ট্রেলিয়া দাবানল, একের পর এক প্রবল ঘূর্ণিঝড়, আফ্রিকায় পঙ্গপাল; আর এর ভেতরেই বিশ্ব আজ করোনায় অস্থির। কে জানে, সামনে কত জটিল জলবায়ু-বিপদ অপেক্ষা করছে? করোনাকালের লকডাউনে আমরা আমাদের প্রবল বাহাদুরিগুলো লকডাউন করতে পারছি কি? আসুন, করোনাকালের পাবলিক পরিবেশ-জিজ্ঞাসাকে বিস্তৃত করি।

লেখক ও গবেষক
animistbangla@gmail.com