সময় এখন প্রকৃতির

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আরিফ মো. ফয়সাল ও তানিয়া নূর

এ বছরের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য 'সময় এখন প্রকৃতির'। বিশ্বকে অবশ্যই মানতে হবে যে করোনাভাইরাসের মতো বৈশ্বিক মহামারির নাটকীয় উদ্ভব ও ক্রমবিস্তারের পেছনে কোথাও না কোথাও প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ও বাস্তুসংস্থানের ক্ষয়- এ সবকিছুর দীর্ঘমেয়াদি কুপ্রভাব কাজ করছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এটাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের জাগরণী সংকেত। এখনও আমরা সম্মিলিত এবং দ্রুত পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি ও বিলুপ্তি প্রতিহত করতে পারি।

আইপিবিইএস ২০১৯-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে, ৮০ লাখ উদ্ভিদ এবং প্রাণিজ প্রজাতি বিলুপ্তির মুখোমুখি। বিলুপ্তির এ হার বাংলাদেশে ২৪ শতাংশ, যা আরও বেশি। আইইউসিএনের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার ৬১৯ প্রজাতির প্রাণী বাংলাদেশে দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আবার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার আরেক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী ১ দশমিক ৪ শতাংশ বনাঞ্চল হারিয়ে গেছে, যে হার বাংলাদেশে ২ দশমিক ৬ শতাংশ।

এই প্রতিবেদনে জীববৈচিত্র্য হ্রাসের পাঁচটি প্রধান কারণকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অতি আহরণ জলবায়ু পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়া ও আগ্রাসী প্রজাতির দ্রুত বিস্তার। এ ধরনের আশঙ্কাজনক প্রবণতা অর্থনীতি, সমাজ, জনজীবন ও জীবিকা, খাদ্য সুরক্ষা, জল সুরক্ষা সেইসঙ্গে মানুষের জীবনমানকে বিপন্ন করে তুলছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাস্তুসংস্থান ঝুঁকির প্রান্তসীমায় আর তা যদি পার হয়ে যায়, তবে বাস্তুসংস্থানগুলোর কাঠামো, কার্যক্রম এবং সেবার পরিধিতে অকল্পনীয় পরিবর্তন ঘটবে। আর পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে তার গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মানুষের সুস্বাস্থ্য আর পৃথিবীর সুস্বাস্থ্য যে এক সূত্রে গাথা, তা কভিড-১৯ মহামারি প্রমাণ করে দিল। কভিড-১৯, ইবোলা, এসএআরএস, সোয়াইন এবং এভিয়ান ফ্লু এইচআইভিসহ প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায় এমন রোগের নাটকীয় বৃদ্ধি প্রাকৃতিক বাসস্থানগুলোর ধ্বংস ও অবনতি, জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুসংস্থানের পরিষেবা হ্রাস, অবৈধ শিকারসহ বিভিন্ন কারণে এবং বন্যপ্রাণী শিকার ও অদক্ষ পরিচালনায় প্রাণিসম্পদ চাষের সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলো।

বিশ্ব অর্থনীতি জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুসংস্থানের সঙ্গে জড়িত। যেমন- ফসলের পরাগায়ন, জল পরিশোধন, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কার্বন স্বতন্ত্রকরণ ইত্যাদি মানুষের সুস্থতার জন্য অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আইপিবিইএস জানিয়েছে, জীববৈচিত্র্যের দ্বারা সরবরাহিত পণ্য ও পরিষেবাদির মূল্য প্রতিবছর ১২৫ থেকে ১৪০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার সমান, যা বিশ্বব্যাপী জিডিপির আকারের দেড় গুণ বেশি। জীববৈচিত্র্য হ্রাসের ফলে ব্যয় বেশি এবং এটি আরও বাড়তে পারে। বর্তমানে বৈশ্বিক জিডিপির ০.০০২০%-এরও কম জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বিনিয়োগ করা হচ্ছে। তবে সংরক্ষণের জন্য বরাদ্দ বর্তমান বিনিয়োগের চেয়ে চার গুণ বেশি প্রয়োজন।

প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশের জন্য ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন এবং সরকারের বিনিয়োগ পরিকল্পনা অনুসারে সেখানে অনুদানের ঘাটতি রয়েছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি এখন স্পষ্ট যে, জীববৈচিত্র্য ক্ষতির পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ অর্থনীতির জন্যও লাভজনক।

নিম্ন-মধ্যম আয়ের একটি জনবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিষয়ে কোনো ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে উন্নয়ন ও সংরক্ষণের মধ্যে একটি সূক্ষ্ণ ভারসাম্য নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। নীতি, নিয়ন্ত্রণ কাঠামোগুলো এবং সব ক্ষেত্রের কর্মপরিকল্পনাগুলো একযোগে প্রাকৃতিক সম্পদের অবক্ষয়ের রোধে সমন্বয় করা প্রয়োজন।

এ লক্ষ্যে, জাতীয় এবং স্থানীয় সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ এবং ব্যক্তিসহ সবাইকে নিয়ে সব ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা, প্রোগ্রামিং এবং বাজেট প্রক্রিয়ায় প্রকৃতিবান্ধব সমাধান নিশ্চিত করতে হবে, যা বিশেষভাবে আসন্ন অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সংযোজন করা যেতে পারে।

সরকারি, বেসরকারি ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে সৃষ্ট একটি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ তহবিল গঠনের প্রয়োজন, যা প্রকৃতি ও পরিবেশবান্ধব সমাধানের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। এ ছাড়া বর্তমান অর্থ ঘাটতি হ্রাস করে পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। এ জাতীয় অর্থ পরিকল্পনায় ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ দরকার, যা সুনির্দিষ্ট দেশের জন্য তুলনামূলক অর্থায়ন তদারকি এবং রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে।

পরিবেশ সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি নিজেদের পরিবেশবিষয়ক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে 'প্ল্যানেটারি ইমার্জেন্সি' ঘোষণা করে, যা এসব কার্যক্রমের পরিপূরক। এ ধরনের নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়াও আমাদের বিদ্যমান সব নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ মেনে চলতে এবং তা কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। এ ছাড়া বাজারভিত্তিক এমন কিছু উপায় (যেমন- পলিউটার পে প্রিন্সিপাল অথবা গ্রিন ট্যাক্স) প্রবর্তন ও প্রচলন করতে হবে। সর্বোপরি বাস্তুসংস্থানের অবক্ষয়, বনভূমি এবং জীববৈচিত্র্য ক্ষয় বন্ধে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

পৃথিবীর প্রাণ প্রকৃতি রক্ষার এ সময়ে বিশ্ব সম্প্রদায় একজোট হতে পারে, গড়ে তুলতে পারে জীববৈচিত্র্যের সুরক্ষা তহবিল। করোনা মহামারি আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, পৃথিবী নিজেই নিজেকে নিরাময় করতে পারে। আমাদের কেবল নিরাময় প্রক্রিয়াটিকে সাহায্য করতে হবে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য অনুরাগী মন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এমন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দরকার, যাতে করে প্রকৃতিবান্ধব সমাধানের লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকবৃন্দ কৌশলগত পরিবর্তন আনতে পারেন। একই সঙ্গে জনসাধারণ নিজেদের প্রাণ-প্রকৃতিকে বিনষ্ট না করেই সবুজ ও স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বিকাশের জন্য দায়িত্বশীল পদক্ষেপ রাখতে পারে।

লেখকদ্বয় জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচিতে কর্মরত