করোনাকালে বাল্যবিয়ে

সতর্ক থাকুন, ব্যবস্থা নিন

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকীয়

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বাল্যবিয়ে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলেও সমস্যাটি রয়ে গেছে। এখনও ১৮ বছরের নিচে প্রায় অর্ধেক মেয়েরই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণের প্রভাবে বাল্যবিয়ের হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বুধবার এ-সংক্রান্ত সমকালের প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। বাল্যবিয়ের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক। যেহেতু গবেষণা বলছে, করোনাভাইরাসের কারণে শহর-গ্রাম উভয় স্থানেই নিম্ন আয়ের মানুষের আয় কমেছে প্রায় আশি ভাগ। অনেক ক্ষেত্রে কোনো রকমে তিন বেলা খেতে পারলেও পুষ্টিমান রক্ষা করতে পারছে না তারা। স্বাভাবিকভাবেই এসব পরিবারের কন্যাশিশুর লেখাপড়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
আমরা দেখেছি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পর্যায়েই অনেকের বিয়ে হয়ে যায়, তারা আর মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোতে পারে না। এমনকি চর কিংবা হাওরাঞ্চলে অনেকে প্রাথমিক স্তর থেকেই ঝরে যায়। এখন করোনার সংক্রমণ এবং একই সঙ্গে উপকূলের সাম্প্রতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে স্বাভাবিকভাবেই বাল্যবিয়ের প্রবণতা বেড়ে যাবে।
যদিও ৩১ মে থেকে করোনাভাইরাসের কারণে আরোপ করা লকডাউন শিথিল করা হয়েছে, তারপরও এর প্রভাব কিন্তু থাকবে অনেক দিন। তার ওপর করোনার সংক্রমণ এখনও কমেনি বরং বাড়ছে। ফলে পুরোপুরি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হতে এখনও আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। আমরা দেখেছি, লকডাউনে দিনে এনে দিনে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষ কীভাবে কর্মহীন সময় কাটিয়েছে। অধিকাংশের আয়ের চাকা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেককে নির্ভর করতে হয়েছে সরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের ত্রাণ কিংবা সাহায্যের ওপর। দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সহসা কমলেও দুই মাসের অধিক সময়ে যে অর্থনৈতিক স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক মাস লেগে যাবে বলেই বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এ অবস্থায় নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর অবস্থার দ্রুত উত্তরণ ঘটবে- এমন সম্ভাবনা রয়েছে সামান্যই। যেসব পরিবার তিন বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খাচ্ছে তারা মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে চেষ্টা করবে। লকডাউনের কারণে জীবিকা কমে যাওয়ায় পরিবারের ওপর নির্ভরতা কমাতে অনেকে তাদের মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিতে পারে? তাছাড়া বৈশ্বিক পরিসংখ্যান বলছে- সংঘাত, দুর্যোগ কিংবা মহামারির সময় বাল্যবিয়ের সংখ্যা বাড়ে। আমাদের দেশের ২০ শতাংশ মানুষ এখন দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, করোনার কারণে আরও ২০ শতাংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। বাল্যবিয়ের ঝুঁকি এসব পরিবারেই বেশি।
বাল্যবিয়ে রোধে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে। পাশাপাশি অসহায় পরিবারের অবস্থা ফেরানোও জরুরি। এসব পরিবারকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা দেখেছি, গত মাসে প্রধানমন্ত্রী সামাজিক সুরক্ষার বাইরে থাকা কর্মহীন পঞ্চাশ লাখ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন। সরকারের এ সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। মেয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির টাকা বাড়ানো এবং তা যথাসময়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা চাই। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে রোধে আইন প্রয়োগের দিকেও নজর দিতে হবে।
বাল্যবিয়ে রোধে অনেক বছর ধরেই সরকার সচেষ্ট। নানা পদক্ষেপ গ্রহণসহ সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে 'বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে' সাজা ও জরিমানা বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের আয় বৃদ্ধির ফলেও বাল্যবিয়ে কমেছে। এ অবস্থায় করোনাদুর্যোগের কারণে বাল্যবিয়ের ঝুঁকি স্পষ্টতই বেড়েছে। আমরা মনে করি, এখনও সময় আছে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে তা রোধ করা সম্ভব।
বাল্যবিয়ে রোধে প্রশাসনকে যেমন সচেষ্ট থাকতে হবে তেমনি সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বাল্যবিয়ের ফলে কন্যাশিশুরা শিক্ষা, উন্নয়ন ও শিশু হিসেবে বড় হওয়ার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সমকালের আলোচ্য
প্রতিবেদনেও এসেছে, বাল্যবিয়ের কারণে শিক্ষায় ঝরে পড়ার হার বেড়ে যেতে পারে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের অন্তত আশি লাখ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কিশোরীর স্বাস্থ্য সুরক্ষাই কেবল নয় বরং দেশের উন্নয়নের জন্যই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ জরুরি। করোনার এ সময়ে বাল্যবিয়ে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে আমাদের আরও সচেষ্ট হতে হবে। এ ক্ষেত্রে যারা বিয়ে পড়ান, সেই কাজি ও জনপ্রতিনিধিদেরও ভূমিকা কম নয়। বিয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রে কন্যার বয়স যাচাইয়ের
ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক অবস্থা খারাপ হলে তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর ব্যবস্থা থাকা চাই। করোনাদুর্যোগের মধ্যেই বাল্যবিয়ের দুর্যোগে যেন কোনো মেয়েকে পড়তে না হয় এ ব্যাপারে সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে
উপকারে আসবে।

বিষয় : করোনা