করোনা বিভীষিকা ও পাশ্চাত্য সমাজ

মুখোমুখি অবাধ্য সত্য

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. জিয়া রহমান

সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী যার কিছুটা তাত্ত্বিক জ্ঞান আছে বা কোনো উৎসুক পর্যটক, যিনি উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি জানেন, কিছু ভিন্নতা থাকলেও মোটা দাগে উন্নত দেশের সামাজিক কাঠামো, বিশেষ করে আর্থসামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনপদ্ধতি অনেকটা একই ধরনের। উন্নত বিশ্বের এই যে জীবনপদ্ধতি তার মধ্যে পানীয় ও খাদ্যাভাস, ফ্যাশন, বিনোদন ও যৌনতা, শপিং বা কঞ্জুমারিজম, ব্যায়াম ও জিম, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ইত্যাদি একাকার হয়ে আছে। পাশ্চাত্যের সমগোত্রীয় প্রথা ও মূল্যবোধের পেছনে আছে মূলত উন্নত বিশ্বের আর্থসামাজিক পরিবর্তনের আধুনিক পর্ব, যা রেনেসাঁর হাত ধরে ধীরে ধীরে শিল্পায়ন, নগরায়ণ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথে বিকশিত হয়েছে। পাশ্চাত্যের এই পরিবর্তন এখন আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতা এবং বিশ্বায়ন পর্যন্ত ব্যাপ্ত হলেও পুরোটাকে আমি পুঁজিবাদ ব্যবস্থার ব্যাপ্তি হিসেবেই দেখে থাকি।
আমরা জানি, উন্নত বিশ্বের প্রথম শর্তই হলো আইনের শাসন; ব্যক্তির যেমন অধিকার আছে, তেমনি সেই অধিকারের সীমাবদ্ধতাও আছে তার দায়িত্ব পালনের বাধ্যবাধকতার মধ্য দিয়ে। উন্নত বিশ্বের মানুষ মানেই একেকজন আইনমানা মানুষ। চাইলেই কেউ রাস্তা দখল করে দোকান দিতে পারে না; চাইলেই রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে সরকারি জমি দখল করতে পারে না। চাইলেই যত্রতত্র ময়লা, আবর্জনা ফেলে পরিবেশ দূষণ করতে পারে না; চাইলেই বুড়িগঙ্গার মতো ঐতিহাসিক নদীকে ভয়ংকর বিষে পরিণত করতে পারে না। রাত ৩টার সময় গাড়ি চালালেও রাস্তার লাল ট্রাফিক বাতি জ্বললে তাকে থামতেই হয়। কোনো এক শপিংমলে গিয়ে ফুডকোর্টে খাবার আনতে আপনি মন্ত্রী, এমপি, বিচারক বা নামকরা রাজনৈতিক নেতা সেটা বিবেচনায় না নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নেওয়া। আপনি গাড়ি চালাবেন, কিন্তু ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি বা অ্যাম্বুলেন্স এলে তাকে জায়গা করে দেবেন না, সেটা অকল্পনীয়।
উন্নত বিশ্বে আপনি কোনো দুর্ঘটনায় পড়লে সে হয়তো সরাসরি আপনাকে কোনো সেবা দিতে পারবে না তার সময়ের স্বল্পতার কারণে; কিন্তু নাগরিক গুণ দিয়ে মুহূর্তেই সে ৯১১-এ কল দিয়ে পুলিশকে জানাবে; ভুল করে আপনি আপনার কোনো জিনিস বাসে বা ট্রেনে ফেলে গেছেন, কয়েকদিন পরেই সিটির সেন্ট্রাল 'লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড' বিভাগে খোঁজ নিন, খুব অস্বাভাবিক ঘটনা না হলে আপনি হারানো জিনিস খুঁজে পাবেন। পশ্চিমা বিশ্ব মানেই বিকেলে আপনি পোষা কুকুর বা বিড়াল নিয়ে মানুষকে পার্কে হাঁটতে দেখবেন; আর হরেক রকমের পোষা প্রাণী নিয়ে হরেক রকমের ভালোবাসার ফেরিওয়ালা দেখবেন পাশ্চাত্যের সমাজে। এর অর্থ হচ্ছে, সে শুধু মানবাধিকারের ফেরিওয়ালাই নয়, প্রাণী অধিকারেও বিশ্বাসী।
২০১৮ সালে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগ পরিদর্শন করতে গিয়ে দেখি, তাদের বিভাগের একটা প্রধান ফোকাসই হলো অ্যানিমেল রাইট। পশ্চিমা বিশ্ব মানেই হেলথ ইন্স্যুরেন্স থেকে শুরু করে মেডিকেয়ার, হসপিটাল সুবিধা থেকে শুরু করে ফ্যামিলি ডাক্তার, প্রতিটি এলাকায় কমিউনিটি কার্যক্রমের আওতায় লাইব্রেরি, জিম ও শরীরচর্চা কেন্দ্র, খেলাধুলার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ, বিনোদন ও শরীরচর্চার জন্য পার্কসহ অজস্র স্বাস্থ্য, সাংস্কৃতিক, বিনোদন সুবিধা। আর শহরে থাকে অসংখ্য খোলা জায়গা, থাকে লেক, থাকে পার্ক, থাকে গাছপালা। নাগরিকরাই তা রক্ষণাবেক্ষণ করে চলেছেন। এই তালিকা আরও লম্বা করা যায়।
এত নিয়মবিধি, প্রথা, মূল্যবোধ, স্বাস্থ্যসেবা, নীতি আর আদর্শের মিলন মেলা সত্ত্বেও করোনাভাইরাসের মতো একটা ক্ষুদ্র ভাইরাস কেন নাস্তানাবুদ করে চলেছে পাশ্চাত্য সমাজকে? আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার বহু সুফলের পরেও এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কেও বিস্তর আলোচনা হয়েছে আগে। এখন হচ্ছে পোস্ট মরডানিটি নিয়ে। সন্দেহ নেই, সামন্তবাদী পরাধীনতা থেকে আধুনিক শহর মানুষকে অপার স্বাধীনতা দিয়েছিল, যেমনটি বলেছিলেন ধ্রুপদি সমাজবিজ্ঞানী মাক্স বেবার- 'দ্য সিটি মেকস ইউ ফ্রি'। কিন্তু একই সঙ্গে নগরায়ণের করাল থাবা আমাদের কমিউনিটি ফিলিংস থেকে বঞ্চিত করে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের স্বার্থপরতায় বন্দি করেছে। এই চরম নগরবাদের হৃদয়হীনতার অভিশাপ তো আমরা বিভিন্ন গল্প, উপন্যাস, নাটক আর সিনেমায় প্রতিনিয়ত দেখেছি। এ নিয়ে তো রবীন্দ্রনাথও লিখেছিলেন, 'ফিরিয়ে দাও সে অরণ্য, লও এ নগর।'
নগর সভ্যতা মানে একদিকে বস্তির উন্নয়ন, অন্যদিকে আধাশহুরে উন্নয়নের মধ্য দিয়ে সামাজিক অসমতা তৈরি করা। এই যে অসমতা, এর বিষবাষ্পে নগরজীবনে জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, অভিবাসী, আদিবাসী, নারী, শ্রমিক ও নিম্নআয়ের মানুষের সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে নাকি? যুক্তরাষ্ট্রের মেনিয়াপলিসে রায়ট হতে দেখলাম, পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক হত্যা নিয়ে। পশ্চাৎপদ এসব শ্রেণি-পেশা ও দলের মানুষেরা উন্নত বিশ্বে বসবাস করার পরেও দারিদ্র্য ও সাংস্কৃতিক পশ্চাৎপদতার কারণে সমাজের বিভিন্ন জায়গায় তাদের যথাযথ হিস্যা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কাজেই চাকরি, আয়, বাসস্থান, চিকিৎসা ইত্যাদি সব জায়গাতেই এই যে সামাজিক অসমতা, তার কারণে পশ্চাৎপদ মানুষেরা নানাভাবে বঞ্চিত। মোটা দাগে এটিই হচ্ছে পুঁজিবাদী জীবনব্যবস্থা, আপনি পছন্দ করুন বা না করুন। সন্দেহ নেই, নব্য উদারবাদ নীতি এই বঞ্চনাকে আরও ব্যাপক ও জটিল করে তুলেছে। নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন, প্যারিস, রোম, মাদ্রিদ, জেদ্দা কিংবা দোহা সব অঞ্চল থেকে তথ্য পাচ্ছি, কীভাবে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণি করোনার অন্যতম শিকার। সেটা কালো মানুষ হোক, অভিবাসী হোক বা অতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীই হোক।
পাশ্চাত্যের এসব কাঠামোগত অসঙ্গতি এবং তার সঙ্গে তাদের পশ্চাৎপদ নাগরিকদের বৈষম্যের মতো সাংস্কৃতিক উপাদান বা জীবন প্রণালি কি তাদের মূল জনগোষ্ঠীর করোনা আঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত? সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে তাদের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায় এ বিষয়টি আলোচনায় এনেছেন। পুঁজিবাদী সমাজের মূল্যবোধ এ মানুষের ক্রমশ টাকার দাসে পরিণত হওয়া, মানুষের ভোগ, বিলাসিতা, ফ্যাশন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে জীবনকে কঠিন ভোগবাদী জাগতিক সভ্যতায় নিয়ে আসাকেই নির্দেশ করে। বস্তুত পুঁজিবাদী সমাজের এই কঠিন ভোগবাদী সভ্যতাই মানুষকে মানবিকতা-বিবর্জিত এমন এক সত্তায় পরিণত করে, যে জীবনের অবস্থাগত দর্শনের পুরোটারই মৃত্যু ঘটায় এই উত্তরাধুনিকতার সময়কালে। ফলে অনুন্নত বিশ্বের তৈরি পোশাক শ্রমিকের দুর্বিষহ জীবন, উন্নত বিশ্বের নাগরিকদের প্রাচুর্য, ভোগবাদী সংস্কৃতি, ফ্যাশন, অ্যালকোহল, ক্যাসিনো, স্মার্টফোনসহ ক'দিন পরপর মডেল পরিবর্তনের সংস্কৃতি সৃষ্ট ঘোর বা আচ্ছন্নতা এবং বিচ্ছিন্নতা মানুষকে তার মূল কাজ থেকে বিচ্যুত করেছে। করোনার ছোবল এই আধুনিকতার সংকটকেই নির্দেশ করে বলে আমার বিশ্বাস। পুঁজিবাদী বিশ্বের এই যে নৈরাজ্য তা তো মার্ক্স-অ্যাঙ্গেলস তাদের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টোতে বহু আগেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, যদিও সেটা ছিল মূলত বিপ্লবকে কেন্দ্র করে।
অতি মাত্রায় ফাস্টফুডে আসক্তি; অতি মাত্রায় প্রতিযোগী জীবন; অতি মাত্রায় অকাজের মধ্যে ডুবে থাকা; স্বল্প আহার এবং স্বল্প ঘুম; অতি মাত্রায় ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী হয়ে সমাজ ও কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা; বিবাহ বিচ্ছেদ, বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, বিয়ে না করে একাকী জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে পরিবারের শাশ্বত ভূমিকাকে অবমূল্যায়ন করা, পর্নোগ্রাফির মতো ভয়ংকর বিষয়ে আসক্তি; ড্রাগ, নারকোটিক, অ্যালকোহলে বুঁদ হয়ে থাকা এবং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভায়োলেন্স ও উচ্ছৃঙ্খলতা। নিকট অতীতে আধুনিকায়নের নামে পাশ্চাত্যে জ্যাজ মিউজিক, হিপ্পি, জিপসি, রক অ্যান্ড রোল, পাঙ্কের মতো অল্টারনেটিভ জীবনপদ্ধতির সঙ্গে আমরা পরিচিত।
উন্নত জীবনব্যবস্থা তথা উত্তরাধুনিকতা মূলত অত্যাধুনিক জীবনব্যবস্থা, যা আমাদের এমনই যুক্তিবাদী করেছে যে, নিউইয়র্ক শহরের মানুষেরা লকডাউন ভেঙে পিৎজা খাওয়াকে কিংবা সেলুনে গিয়ে চুল কাটাকেও তার 'অধিকার' মনে করছে। পাশ্চাত্যের এসব অস্থির জীবনপদ্ধতি কি মানুষকে আরও অরক্ষিত করে ফেলেনি? মানুষের ইমিউন সিস্টেমকে নষ্ট করে ফেলেনি? এসব ভিন্নধর্মী জীবনব্যবস্থার সঙ্গে করোনা আক্রান্ত হওয়া বা নিহত হওয়ার তথ্য বিশ্নেষণ করলেই হয়তোবা ভবিষ্যতে বিষয়টি পরিস্কার হবে।
zia_soc71@du.ac.bd
সমাজবিজ্ঞানী; অধ্যাপক ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, ক্রিমিনোলজি বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিষয় : করোনা