চলচ্চিত্র পুনরুজ্জীবনে প্রণোদনা

প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফাত্তাহ তানভীর রানা

বাংলা ভাষার ভালো ভালো সিনেমা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে পাঁচ দিনব্যাপী আমার ভাষার চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করা হয়। এ বছর মাত্র ৩০ টাকা মূল্যের টিকিটে দেখানো হয়েছে উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র। সেখানে ছিল লোকে লোকারণ্য। অথচ সিনেমা হলে দর্শক খরা।
দেশে সিনেমা হলের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হ্রাস পাওয়া এবং দর্শকের সিনেমা হলের প্রতি বিমুখতা আজ সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। আক্ষেপ করেই বলতে হয়, রাজশাহীর মতো প্রাচীন শিক্ষানগরীতেও নেই কোনো সিনেমা হল। এ থেকে উত্তরণের পথ কোনটি হতে পারে? সরকারি অনুদানের সিনেমার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রবীণ ও পরীক্ষিত নির্মাতাদের অগ্রাধিকার থাকতে পারে। পাশাপাশি তরুণ ও মেধাবী নির্মাতাদের সুযোগ করে দিতে হবে।
দর্শকদের সিনেমা হলে ফেরানোর প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ডিসি অফিস এবং জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে পুরোনো সিনেমা প্রদর্শন করা যেতে পারে। যেহেতু বিষয়টি ব্যবসায়িক; সিনেমা হল কর্তৃপক্ষ অথবা প্রযোজক-পরিবেশক সমিতি দায়িত্ব না-ও নিতে পারে। তাই সরকারি সংস্থাকেই এগিয়ে আসতে হবে। বাংলা ক্লাসিক ও পুরোনো ছবি বয়স্কদের যেমন আনন্দ দেবে, তেমনি নতুন প্রজন্মের দর্শককেও সিনেমা হলে টানতে পারবে। এ ক্ষেত্রে দর্শকদেরও ভূমিকা রয়েছে। তাদের হলে গিয়ে ভালোমানের সিনেমা দেখার মানসিকতা রাখতে হবে।
আমরা জানি, এ পেশায় রয়েছে প্রচ্ছন্ন অনিশ্চয়তা। তাই বয়স্ক অভিনয় শিল্পীদের পেনশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তাতে মেধাবী আর নতুন ভালো শিল্পীরা অভিনয়সহ চলচ্চিত্রের অন্যান্য কাজকে পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী হবেন। সিনেমা মৌলিক গল্পের, মানসম্পন্ন, বিশ্বমানের যদি হয়, তাহলে দর্শকপ্রিয়তা পাবে। এর সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করলে আমাদের চলচ্চিত্রের মান হবে সুন্দরতম। বাণিজ্যিক সিনেমা বানাতে হবে দর্শকের চাহিদা বিবেচনা করেই। বিদ্যমান সিনেমা হলের পরিবেশ সাউন্ড সিস্টেমসহ আমূলে সংস্কার করা উচিত। সিনেমা হল হবে নারীবান্ধব। আমাদের দর্শকদের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ নারী। চলচ্চিত্র সিস্টেমকে আধুনিক করতে হলে সিনেমাতে গ্রেডেশন চালু করা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে সুবাতাস বইতে শুরু করলে কাটপিস সিনেমা, কপি-পেস্ট সিনেমা নির্মাণ এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে। আবার বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বাংলাদেশের যত্রতত্র হলে প্রদর্শন আমাদের সিনেমার জন্য অশনিসংকেত। উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময়ে বিদেশি চলচ্চিত্র বাংলাদেশের হলে প্রদর্শনে ব্যবসায়িক সফলতা লাভ করেছে। তাই হল মালিক ও কর্তৃপক্ষ বিদেশি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যাপারে আগ্রহী। এ জন্য একটা নীতিমালা থাকা উচিত। সংস্কৃতি বিনিময় চুক্তির অধীনে বিদেশি চলচ্চিত্র বাংলাদেশ আমদানি করবে, যদি বাংলাদেশি সিনেমা তাদের দেশ আমদানি করে।
চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড গঠন করতে হবে সিনেমা বিষয়ে অভিজ্ঞতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নিয়ে। মানহীন, অশ্নীল, নকল, আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সিনেমার ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড শক্তিশালী ও জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি সৃজনশীল, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক, সমাজ সংস্কারমূলক, বিজ্ঞাননির্ভর, শিশুতোষ, বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন সর্বজনীন চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহিত করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হবে এবং মেলে ধরতে হবে বিশ্বব্যাপী। সংস্কৃতি বাঁচলে বাঁচবে দেশ। সুস্থ সংস্কৃতি আমাদের আগামী প্রজন্মকে আলোর পথ দেখাবে। আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম চলচ্চিত্র। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ, ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগ, ফকির বিদ্রোহ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন সময়ের ইতিহাস ফুটে উঠেছে আমাদের চলচ্চিত্রে। বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক চলচ্চিত্রে ধারণ করেছেন আমাদের চলচ্চিত্রকাররা। তাই নিজেদের স্বার্থেই চলচ্চিত্রকে ফেরাতে হবে ঐতিহ্যে। এ জন্য চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোগ। তথ্য, অর্থ ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং এফডিসিকে যৌথভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
fattahtanvir@gmail.com

বিষয় : চলচ্চিত্র