ঋণে ৯ শতাংশ সুদহার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করবে

ব্যাংক খাত

প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

জাহিদ হোসেন

ব্যাংকগুলো সাধারণত জাতীয় ও বহুজাতিক ব্যবসায়ী গ্রুপ এবং সরকারের সঙ্গে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কারণ এদের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি কম থাকে, লাভও বেশি পাওয়া যায়। অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক বেশি ঝুঁকি মনে করে বলে তাদের ক্ষেত্রে ঋণের সুদহার বেশি থাকে। সাধারণত ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য একটি বড় আকারের ব্যবসায়ী গ্রুপের চেয়ে অনেক বেশি বেগ পেতে হয়। বিশেষ করে, ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংক যখন ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়ন করে, তখন নানা ধরনের তথ্যের ঘাটতি থাকে।

যথাযথভাবে ঝুঁকির বিষয়টি মূল্যায়ন করতে না পারার কারণে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ছোট ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হারে সুদ নির্ধারণ করে থাকে। ছোট আকারের প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কারণে ঋণ থেকে বঞ্চিত হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জামানত, বাজারে প্রবেশগম্যতা, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, স্বল্প গবেষণা, উন্নয়নের সামর্থ্য, অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত জ্ঞান এবং দক্ষতার অভাব।

এর বাইরেও ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। ব্যবস্থাপনা ও পণ্য উৎপাদন বা সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ধারণা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক সমস্যা মোকাবিলা করতে হয়। এসব প্রতিবন্ধকতাকে তাদের উদ্যোগ, টিকে থাকার সামর্থ্য ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে বাধা হিসেবে দেখা দেয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান যখন ঋণ নিতে যায়, তখন ঋণদাতারা বিনিয়োগের ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখে উচ্চ হারে সুদ নির্ধারণ করে। এটা একটা সংকেত যে, ঝুঁকির উৎসগুলো নিয়ে কাজ করা দরকার। আগামী ১ এপ্রিল থেকে শুধু ক্রেডিট কার্ড বাদ দিয়ে বাকি সব ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ কার্যকর করার কথা রয়েছে। কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্প উদ্যোগের ক্ষেত্রেও সুদহারের এই বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য হবে।

বলা হচ্ছে, এই খাতে প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ানোর লক্ষ্যে এই বাধ্যবাধকতা। এ ধরনের উদ্যোগে এখন ঋণের বিপরীতে সুদহার গড়ে ১৬ শতাংশের বেশি। হ্যাঁ, এই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুদহার কমানোর উদ্যোগটা ভালো; কিন্তু বিশেষ কিছু কারণে এটা হিতে বিপরীত হতে পারে। এতে সফল অর্থায়নের ক্ষেত্রে ইনটেনসিভ সুপারভাইজরি ক্রেডিট ফ্রেমওয়ার্কের প্রয়োজন হয়; যার জন্য বড় আকারের কর্মশক্তি ও অবকাঠামো লাগে। ফলে আয়ের অনুপাতে খরচের ওপর প্রভাব পড়ে, যা কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোগের (সিএমএসই) ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে প্রায় ৮৪ শতাংশ। এত বেশি পরিচালনা খরচ তুলে আনা সম্ভব হতে পারে শুধু উচ্চ সুদহারে ঋণ দিয়ে এবং উচ্চ হারের সুদ ছড়িয়ে দিয়ে। তাই বেঁধে দেওয়া ৯ শতাংশ সুদহার ঝুঁকি এবং ব্যয় মেটাতে পারবে না; এর ফলে সিএমএসই পোর্টফলিও বাণিজ্যিকভাবে রাতারাতি দুর্বল হয়ে পড়বে।

বেঁধে দেওয়া সুদহার ব্যাংকগুলোকে এই খাতে নতুন করে ঋণ দিতে অনুৎসাহিত করবে। ফলে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে। ব্যাংক ঋণ না পেলে ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তারা অনানুষ্ঠানিক নানা সূত্রের কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হবে; যার সুদহার হবে অনেক বেশি, ঋণের শর্ত হবে পুরোপুরি ঋণদাতার পক্ষে। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে স্থানীয় অর্থনীতিতে। সিএমএসই উদ্যোক্তারা ৭৮ লাখ ৬০ হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। ব্যবসার গতি কমে গেলে, অর্থায়ন কমে গেলে শুধু যে এ খাতেই বেকারত্ব বাড়বে তা কিন্তু নয়; ব্যাংক এবং ব্যাংকের মতো যারা এ খাতে অর্থায়ন করে, তারাও সংকটে পড়বে। বিভিন্ন ব্যাংকে ১২ হাজারের বেশি কর্মকর্তা এসএমই সংশ্নিষ্ট গ্রাহকের জন্য কাজ করে থাকেন।

সিএমএসইতে অর্থায়ন দেশের সামগ্রিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এজেন্ডার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিএমএসই অর্থায়নের মাধ্যমে হাজার হাজার ছোট উদ্যোক্তাকে ব্যাংকিং ছাতার নিচে আনা হয়েছে। এই খাত বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক খাত হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ব্যাংকগুলোর ২৫ শতাংশ তহবিল কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসএমই) জন্য বরাদ্দ করতে হবে। কিছু ব্যতিক্রম বাদে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বেঁধে দেওয়া লক্ষ্য থেকে এখনও বেশ দূরে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ডাটা অনুযায়ী সিএমএসএমই ব্যাংক ঋণ মোট ব্যাংক ঋণের ১৯ শতাংশ এবং এসএমই খাতের বাইরে এটা সাড়ে ১৩ শতাংশ। সিএমএসই খাতে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনলে শুধু যে ব্যাংকগুলোই ঋণ দেওয়ার উৎসাহ হারাবে তা নয়; অতিরিক্ত ঋণ দিতে তহবিল বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যে লক্ষ্য, সেটাও পূরণ করা কঠিন হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই আশঙ্কাগুলো কতটা যৌক্তিক? ধারণা পেতে আমরা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলোর দিকে তাকাতে পারি। সুদহার বেঁধে দেওয়া হলে তা বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি করে- ১. আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকি ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের কথা বিবেচনা করে ছোট আকারের ঋণগ্রহীতাদের ঋণ দেওয়া কমিয়ে দেয়; ২. ব্যাংকগুলোতে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে যায় বলে তারা বেশি সুদে অনানুষ্ঠানিক নানা সূত্র থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়, যেখানে সুদহার বা ঋণের অঙ্কের বাঁধাধরা কোনো নিয়ম থাকে না; ৩. সুদহীন চার্জের (যেমন বিভিন্ন ধরনের ফি) ক্ষেত্রে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি কমে যায়। এর ফলে ঋণ নিলে বিপরীতে কত টাকা শোধ করতে হবে, সেটা বুঝতে পারা ঋণগ্রহীতার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়; ৪. ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যাংকগুলোরও টিকে থাকা ঝুঁকির মুখে পড়ে। কারণ এই ব্যাংকগুলো উচ্চ হারে সুদ দেওয়ার কথা বলে ডিপোজিট নেয় এবং ছোট উদ্যোক্তাদের বেশি ব্যয় করে ঋণ দিয়ে বেশি লাভ করে টিকে থাকে। এসব নেতিবাচক প্রভাবের কারণে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এই সমস্যাগুলো কীভাবে সুস্পষ্ট হয়, তার সুনির্দিষ্ট উদাহরণ আছে। যেমন- অভাবী মানুষ বা বাজারের সুনির্দিষ্ট খাতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণপ্রবাহ প্রত্যাহার করা; এমনটা হয় বিশেষ করে ছোট আকারের ঋণগ্রহীতা, যাদের ঋণ ব্যবস্থাপনায় ব্যাংকের খরচ বেশি; যেমন- প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাহক বা নারীদের ক্ষেত্রে। এভাবে নেতিবাচক প্রভাবগুলোর কারণে অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে পড়েছে বেশ কিছু দেশ। নামও বলা যেতে পারে : বলিভিয়া, কলম্বিয়া, ডমিনিকান রিপাবলিক, ইকুয়েডর, হাইতি, নিকারাগুয়া, পেরু, পোল্যান্ড ও জাম্বিয়া। এর মধ্যে বলিভিয়া, ইকুয়েডর, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাম্বিয়ায় সুদহার নির্ধারণ করে দেওয়ার পর ছোট আকারের ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ায় ঋণের আকার বেড়ে গেছে। আর্মেনিয়া, নিকারাগুয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাম্বিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায়, ঋণের ফি ও কমিশনের ক্ষেত্রে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি কমে গেছে।

বাংলাদেশে সিএমএস গ্রাহকদের জন্য ব্যাংক খাতে উল্লেখযোগ্য হারে তহবিল এবং নতুন প্রযুক্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। যে কোনো নীতিমালা পরিবর্তন যদি ব্যাংকিং খাতে সিএমএস ফ্রেমওয়ার্ককে বাণিজ্যিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ করে, তাহলে তা হবে পিছিয়ে পড়ার নামান্তর। এ পর্যায়ে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ঋণ বাড়ানো। ব্যাংক খাত যদি একবার সিএমএসে অর্থায়নে যথাযথ পর্যায়ে (যেমন- বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ২৫ শতাংশ) পৌঁছে যায় এবং স্বীকৃত মূলধন অর্জন করে, তাহলে ঋণের বিপরীতে সুদহার এমনিই নিম্নমুখী হতে শুরু করবে।

প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে। তারা আস্থা প্রতিষ্ঠা হলে কম সুদহার নির্ধারণ করে এবং মাঝারি মানে ঝুঁকি রাখে। ঋণের হার বেঁধে দেওয়ার নেতিবাচক দিক এড়ানো যেতে পারে, যদি উচ্চ ঝুঁকির ঋণগ্রহীতাদের ক্ষেত্রে ঋণহারের সীমাও পর্যাপ্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ঋণহারের সীমার ক্ষেত্রে একটি বিকল্প সেট করা যেতে পারে বিগত মাসের বাণিজ্যিক হারের মার্জিন ধরে। এই মার্জিন উচ্চ ঝুঁকির ঋণগ্রহীতাদের জন্য ঋণহার নির্ধারণ করতে সহায়ক হবে। এই সক্ষমতা সমকক্ষ দেশগুলোর ঋণহারের ওপর ভিত্তি করে বিবেচনা করা যেতে পারে। সিএসএমের ক্ষেত্রে রেট চার্জ ভারত, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে করপোরেট এবং বাণিজ্যিক রেট চার্জের চেয়ে গড়ে ৭০ শতাংশ বেশি। সিএমএসইর ক্ষেত্রে এমন পর্যাপ্ত রেট সিলিং নতুন ঋণ ও ঋণ রোলওভারের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এই পদ্ধতিতে ঋণ দেওয়ার সীমা বেঁধে দেওয়া হলে তা ঋণগ্রহীতার ওপর অন্যায্য শর্ত চেপে বসতে বাধা সৃষ্টি করে এবং ঝুঁকির জন্য ক্ষতিপূরণের পর্যাপ্ত মার্জিন থাকে। গত কয়েক দশকে বিশ্বের বেশিরভাগ দেশে সুদহার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি শিথিল করা হয়েছে। এ খাতের মূল ফোকাস করা হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণগ্রহীতাদের কীভাবে ঋণের অন্যায্য শর্ত থেকে রক্ষা করা যায় তার ওপর। আমাদেরও এই দিকটাতে বেশি নজর দেওয়া জরুরি।

অর্থনীতিবিদ