আইসিজে রায়ের প্রভাব ও তাৎপর্য

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ড. আকমল হোসেন

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে গত ২৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) যে নির্দেশ দিয়েছেন, তার তাৎপর্য নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বিচার-বিশ্নেষণ হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যার ক্ষেত্রে এর প্রভাব কী হতে পারে, তা বিশ্নেষণের প্রথমে স্থান পাবে। কেননা, ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা জাতির ওপর মিয়ানমার যে নির্যাতন চালিয়েছে, সে সম্পর্কে কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা বহু হয়েছে; কিন্তু মিয়ানমারকে বিরত রাখতে সেসব কোনো দাগ কাটতে পারেনি। লক্ষ্য করার বিষয়, ২০১৭ সালের আগে বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের এ ইস্যুতে দু'বার যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল, তা দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক বৈঠকে সমাধান হয়েছিল। কিন্তু নতুন রূপে দেখা দেওয়া এ বিরোধ শুধু নির্যাতনের স্বরূপ দিয়ে নয়, বিরোধ মীমাংসায় দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক আলোচনায় ব্যর্থতা এবং মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যথোপযুক্ত আন্তর্জাতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং জটিল অবস্থায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চীনের রাজনৈতিক-কূটনৈতিক ও সামরিক পৃষ্ঠপোষকতা মিয়ানমারকে একগুঁয়ে করে তুলেছে। অন্যদিকে ভারতও তার স্বার্থে মিয়ানমারকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে এসেছে, যা বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের কথিত ভারতের সঙ্গে 'সর্বোচ্চ পর্যায়ের বন্ধুত্বের' পক্ষে যায় না।

কিন্তু গত কয়েক মাসে রোহিঙ্গা জাতিকে নিয়ে মিয়ানমার সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আইনগতভাবে দু'দিক দিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এক. গত নভেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চিফ প্রসিকিউটরের দপ্তর থেকে রোহিঙ্গাদের ওপর চলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের মতো বীভৎস ঘটনা তদন্ত করার একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমানে চলমান আছে। দুই. আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গাম্বিয়ার করা রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সংঘটিত গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলা। আইসিজের এ সংক্রান্ত রায় এ সমস্যাকে শুধু আইনি স্বীকৃতিই দেয়নি, মিয়ানমারের অবশ্যপালনীয় কাজের সীমাও নির্দেশ করে দিয়েছে। এ দুই আদালতের পদক্ষেপগুলোর আইনি তাৎপর্যের সঙ্গে রাজনৈতিক তাৎপর্যও লক্ষ্য করার মতো। রাজনৈতিকভাবে এতদিন যেভাবে বিষয়টি আলোচিত হয়েছে, তাতে মিয়ানমারের পক্ষের দেশগুলো তার গৃহীত পদক্ষেপ নিয়ে কোনো আপত্তি তোলেনি। বরং মিয়ানমারের নিরাপত্তার অজুহাত তুলে নেওয়া সহিংস ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য বলে সাফাই গেয়েছে। ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশও বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে কোনো শর্তহীন সমর্থন দেয়নি। এ ইস্যুতে ভোট দেওয়ার সময় বিরত থেকে তারা পরোক্ষভাবে মিয়ানমারকে সহায়তা জুগিয়েছে বললে ভুল হবে না।

গত ডিসেম্বরে বিষয়টি আদালতে উঠলে গণহত্যার অভিযোগকারী গাম্বিয়ার আইনমন্ত্রী আবু বকর মারি তামবাদু শুনানি করতে গিয়ে কেন আদালত রোহিঙ্গা গণহত্যাকে আমলে নেবেন বলে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। অপরপক্ষে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি কোনো গণহত্যা হয়নি বলেন এবং যুদ্ধাপরাধের মতো অপরাধ হতে পারে যুক্তি দিয়ে তার জন্য মিয়ানমার নিজ আইনে অপরাধ সংঘটনকারীদের বিচার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত তার যুক্তিকে খারিজ করে দিয়ে অন্তর্বর্তী চারটি নির্দেশ দিয়েছেন : গণহত্যা সনদ অনুযায়ী হত্যাসহ সব ধরনের নিপীড়ন থেকে নিবৃত্ত থাকা; সেনাবাহিনীসহ অন্য কেউ যাতে গণহত্যা সংঘটন, ষড়যন্ত্র বা উস্কানি দিতে না পারে তা নিশ্চিত করা; গণহত্যার সব সাক্ষ্যপ্রমাণ রক্ষা এবং চার মাসের মধ্যে নির্দেশ অনুযায়ী গৃহীত ব্যবস্থাদি আদালতকে জানানোর বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছেন।



রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের আচরণ সবসময়ই শুধু অমানবিক নয়, একই সঙ্গে সব ন্যায়নীতির বিরোধী। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করে তাদের বাঙালি বলে আখ্যায়িত করার পক্ষে মিয়ানমারের বক্তব্যের কোনো ন্যায়ানুগ ভিত্তি নেই। অপরপক্ষে হত্যা-ধর্ষণ-আগুন জ্বালিয়ে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়াসহ তাদের জোর করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার নীতি একটি জাতিকে নিশ্চিহ্ন করার নীতি। হিটলারের নাৎসি সরকার যেমন ইহুদি জনগোষ্ঠীকে গ্যাস চেম্বারে পুরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল, সু চির সরকারও হত্যার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের সব রকমভাবে সন্ত্রস্ত করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করে এসব মানুষের রাজনৈতিক অস্তিত্ব অস্বীকার করতে চেয়েছে। সুতরাং এ অপরাধের বিচার করার জন্য আইনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই। গাম্বিয়া ১৯৪৯ সালের গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে গণহত্যা বিষয়ে আইনি হস্তক্ষেপ চেয়েছে। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে শুনানিতে গাম্বিয়ার অভিযোগ দায়ের করার কোনো বৈধতা নেই বলে যে যুক্তি দেওয়া হয়েছিল, তা আইসিজে গ্রহণ করেননি। গণহত্যা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী অপর দেশ মিয়ানমার গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে; এ কারণে গাম্বিয়ার অভিযোগ করার বৈধতা আদালত কর্তৃক গৃহীত হয়েছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার অসততার পরিচয় দিয়ে আসছে সবসময়। দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিতে সবসময় বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে; কিন্তু কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বলা যেতে পারে, এ ব্যাপারে বাংলাদেশ আশ্বাসের পর আশ্বাস পেয়েও দেশটির আন্তরিকতার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ করেনি। বরং রোহিঙ্গারা প্রত্যাবর্তনের নির্ধারিত তারিখে ফিরে যেতে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদেরই দায়ী করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক জনমত তার বিরুদ্ধে যাওয়ার উপক্রম হলে মিয়ানমার এ ধরনের শঠতার আশ্রয় নেয়। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায়ের আগের দিন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মিয়ানমার তার নিয়োজিত এক কমিশনের পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে; যেখানে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধাপরাধ হয়েছে কিন্তু কোনো গণহত্যা হয়নি।

আইসিজের নির্দেশ মিয়ানমার পালন করবে কিনা এ প্রশ্ন উঠতে পারে। যেহেতু এ রায়ে মিয়ানমারকে কোনো ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে না, তাই পালন না করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয় বলে মনে হয়। আদালত যেসব নির্দেশ দিয়েছেন, সেসব গণহত্যা সম্পর্কিত। এতে দেশটির অস্বীকার সত্ত্বেও গণহত্যার সঙ্গে তার সংশ্নিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে। মিয়ানমার সরকার এবং তার নিয়োজিত কমিশন যতই বলুক না কেন গণহত্যা হয়নি- আইসিজের রায়ে গণহত্যা হয়েছে, এটা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। গণহত্যার মতো একটি জঘন্য অপরাধের বিচার করার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকা উচিত নয়। গণহত্যা হয়েছে, তা প্রমাণ হওয়ায় তার বিরুদ্ধে নতুন ব্যবস্থা, যেমন গণহত্যাকারীদের বিচার করার পথ প্রশস্ত হতে পারে। এদিক থেকে আইসিসির তদন্ত যৌক্তিকতা পেতে পারে। তাছাড়া যেসব দেশ মিয়ানমারকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন করে আসছে, তাদের অবস্থানও প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে এখন। কেননা, আইসিজের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে তাদের যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশ্নেষক