এনজিও কার্যক্রমে নজরদারি দরকার

রোহিঙ্গা সংকট

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এম হাফিজউদ্দিন খান

আশ্রিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি করায় দেশের সচেতন জনগোষ্ঠীকে সঙ্গতই উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য সমস্যার নতুন কারণ নয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে- এখন সমস্যাটি রীতিমতো বড় রকমের সংকটে রূপ নিয়েছে। আমরা জানি, সত্তরের দশক থেকেই বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বাংলাদেশে আগমন ঘটে চলেছে। এর প্রেক্ষাপটও সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। তবে এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের ঘটনা। ওই সময় ভয়াবহ রকমের গণহত্যা ও বিভিন্ন মাত্রায় নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রকটতার কারণে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা শরণার্থীর স্রোত প্রবল হয়ে ওঠে। ওই সালের ২৫ আগস্ট বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে। ইতিমধ্যে এর দুই বছর অতিক্রান্ত হয়েছে।

গত ২২ আগস্ট স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের এখানে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে ফেরত যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা ছিল। প্রথম পর্যায়ে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল (বলা যায় একেবারে নামমাত্র রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন) দ্বিতীয় পর্যায়ের এই পদক্ষেপে সফল হওয়া যাবে। আশ্রিত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে বাছাই করা প্রায় সাড়ে তিন হাজারের প্রত্যাবাসনের বিষয়টি সিন্ধুর মাঝে বিন্দুর মতো হলেও এর মধ্য দিয়ে একটা নতুন রাস্তা তৈরি হতো। কিন্তু বাছাই করা রোহিঙ্গারা সবরকমের আশ্বাস প্রত্যাখ্যান করে এবং ফেরত যেতে রাজি হয়নি। দীর্ঘ প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতার পর গত ২২ আগস্ট প্রত্যাবাসনের এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে দেশি-বিদেশি এনজিও, সংবাদমাধ্যমসহ অন্য আরও কিছু দিকে অভিযোগের আঙুল উঠেছে। ২৭ আগস্ট সমকাল তাদের শীর্ষ প্রতিবেদনে এ ব্যাপারে পুনর্বার যে তথ্য উপস্থাপন করেছে তাতে প্রশ্ন দাঁড়ায়- মানবতার নামে কি তাহলে বাণিজ্য চলছে? আরও অভিযোগ আছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো ঘিরে স্থানীয় প্রভাবশালীরাও গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট। একদিকে মানবিক সংকট, অন্যদিকে এই সংকটকে পুঁজি করে চলছে মহলবিশেষের ফায়দা লাভের কূটকৌশল। কিন্তু আমি অতীতে বিভিন্ন ক্যাম্পে নিজে এও দেখেছি, অনেক এনজিও ব্যাপক ইতিবাচক ভূমিকাও পালন করছে।

বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় বাণিজ্যিকীকরণের নানারকম কর্মকাণ্ডই আমরা দেখছি। 'রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এত মধু' শিরোনামে সমকালের ওই সংবাদ প্রতিবেদনে যে তথ্য মিলেছে তাতে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ার পেছনে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কর্মরত দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোর নেতিবাচক তৎপরতাই প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে অন্তরায় সৃষ্টির পথ রচনা করেছে। কিন্তু এটা তো সত্য যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা যেসব দাবি উত্থাপন করে ফেরত যেতে রাজি হয়নি, মানবিকতার বিচারে তাদের সেসব দাবি অযৌক্তিক বলে উড়িয়ে দেওয়ার অবকাশ নেই। সংকটের শুরুটা কিন্তু করেছে মিয়ানমার। কাজেই এর সমাধানের দায়টাও সর্বাগ্রে তাদের ওপরই বর্তায়। এনজিওদের তৎপরতার যে চিত্র সমকালের প্রতিবেদনে পাওয়া গেল তাতে প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাদের কেউ কেউ যদি নেতিবাচক তৎপরতায় লিপ্ত থাকে, তাহলে সরকার এ ক্ষেত্রে নজরদারি আগেই বাড়ায়নি কেন? এত বড় একটি বিষয় তো সরকারের অজ্ঞাত থাকার কথা নয়। এনজিওগুলোর মধ্যে কেউ কেউ নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে যুক্ত- এ কথা বলেই তো দায়িত্বশীল মহলের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একই সঙ্গে প্রমাণের দায়ও থেকে যায়। কোনো অভিযোগই ঢালাওভাবে করার যেমন অবকাশ নেই, তেমনি এমনটি মেনেও নেওয়া যায় না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে দৃষ্টির গভীরতায় ঘাটতি রইল কেন? তবে মানবতার নামে কমবেশি বাণিজ্য যে হচ্ছে, এই অভিযোগও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নাগরিকত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তা অবশ্যই অনস্বীকার্য। কিন্তু এর দায় তো বাংলাদেশের নয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধান করতে গেলে চীন ও ভারতের সহযোগিতা আমাদের অত্যন্ত প্রয়োজন। দৃশ্যত চীন ও ভারতের এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি কিংবা আশ্বাসের কোনো ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে রাশিয়ার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার তরফেও আশ্বাস কিংবা প্রতিশ্রুতির কোনো ঘাটতি নেই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর কতটা প্রতিফলন আমরা দেখছি, এ প্রশ্ন বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে দাঁড়ায়। আরও প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কি কূটনৈতিক তৎপরতায় ঘাটতি রয়েছে? এ ক্ষেত্রে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন এবং অবশ্যই তা বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে। মিয়ানমারে চীন ও ভারতের বড় রকমের অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, তাও সচেতন মানুষ মাত্রেরই জানা। শুধু চীন-ভারত-রাশিয়াই নয়, জাতিসংঘসহ আমাদের বন্ধুপ্রতিম প্রত্যেকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে এ ব্যাপারে কূটনৈতিক যোগাযোগ আরও বাড়িয়ে বিশ্বচাপ প্রবল করা খুব জরুরি। এখন যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে এবং ক্রমশ পরিস্থিতি যেভাবে জটিল হচ্ছে, তাতে জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমেই দ্রুত সমাধান খুঁজতে হবে। আরও একটি কথা বলতে চাই, রোহিঙ্গা সংকট আমাদের জাতীয় একটি সমস্যা। কাজেই এ ব্যাপারে সরকারের জাতীয় উদ্যোগ দরকার। এমনটি দেখতে পাচ্ছি না। প্রত্যাশা করি, সব পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সরকার আলোচনা করে জাতীয় উদ্যোগ নেবে। এ ব্যাপারে বিরোধী রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি বিষোদ্গার কাম্য নয়। প্রয়োজন ঐকমত্য।

মিয়ানমার বিশ্বসম্প্রদায়কে এ ব্যাপারে অনেক ক্ষেত্রেই বোকা বানিয়ে তাদের কূটকৌশল অব্যাহত রেখেছে। যদি বলি যে, আমাদের বন্ধুপ্রতিম বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো কার্যত বাংলাদেশের মানবতাবাদী আচরণের প্রশংসা ছাড়া মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি, তাহলে কি অত্যুক্তি হবে? এই যে তাদেরকে দিয়ে মিয়ানমারের ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করা গেল না, তাতে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতার ঘাটতির বিষয়টিই সামনে নিয়ে আসে। দুই বছর আগে রাখাইনে ভয়াবহ রকমের গণহত্যা-নিপীড়ন-নির্যাতনের আগে যে সুরে কথা বলেছিল মিয়ানমার সরকার, তাদের বর্তমান অবস্থানও এ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। শান্তিতে নোবেলজয়ী মিয়ানমারের 'এককালের মানবতাবাদী' নেতা অং সান সু চিরও এ ব্যাপারে যে ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়েছে কিংবা হচ্ছে, তাও অবশ্যই চরম নিন্দার। মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের ওপর কয়েকটি রাষ্ট্র সীমিত আকারে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও এই নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে তাদের অবস্থান যথেষ্ট জোরদার না হওয়ায় সুফলও কার্যত মেলেনি। এসব কিছু বিবেচনায় এ কথা বলা যায়, আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি। এত বড় একটি সংকটের সমাধানকল্পে প্রথমত জরুরি জোরদার কূটনৈতিক তৎপরতা। এ ক্ষেত্রে ঘাটতি রেখে কাঙ্ক্ষিত সুফল আশা করা যায় না। রাখাইনে 'সেইফ জোন' অর্থাৎ 'নিরাপদ এলাকা' প্রতিষ্ঠা করে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যে প্রস্তাবটি ইতিপূর্বে বাংলাদেশ দিয়েছিল, তা সাহসী ও কার্যকর প্রস্তাব হলেও এর পক্ষেও বাংলাদেশ কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে সমর্থ হয়নি। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। মিয়ানমার ধরাকে সরা জ্ঞান করে এখনও যেভাবে কূটকৌশল চালাচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয় কি-না, এও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিয়ানমার রোহিঙ্গা সংক্রান্ত ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এখনও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সরবরাহ করছে।

নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, ইতিপূর্বে এশিয়ার এই রাষ্ট্রটি ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাপক সুবিধা ভোগ করেছে। দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগরে গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে এই রাষ্ট্রটির ওপর বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোর মুখাপেক্ষিতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়- এ হলো বিদ্যমান বাস্তবতার আরেকটি দিক। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের বিষয়টি কি আপাতত অধরা থেকে যাবে, এ প্রশ্নও অমূলক নয়। এমন বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করে এগিয়ে আসে, বাংলাদেশকে এখন এই লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে। একই সঙ্গে মানবিকতা সংশ্নিষ্ট কার্যক্রমের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে। আমাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি যে কোনো তৎপরতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেই হবে।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও সভাপতি, সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন