'আমি যে বিশ্বের অর্থমন্ত্রীদের সেরা, এটা তারা একবারও বলেননি'

প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০   

বিশেষ প্রতিনিধি

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কমাল- ফাইল ছবি

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কমাল- ফাইল ছবি

সংসদে বুধবার মেজাজ হারানোর কথা স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, 'আমি কখনই তা হারাই না। কিন্তু ওই দিন সামান্য সময়ের জন্য তা হারিয়েছিলাম। আমি যে সারাবিশ্বের অর্থমন্ত্রীদের সেরা, এটা তারা একবারও বলেননি।'

স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত সরকারি প্রতিষ্ঠানের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া নিয়ে বুধবার সংসদে উত্থাপিত বিলের ওপর আলোচনায় বিরোধী দলের কয়েকজন সাংসদ অর্থমন্ত্রীকে সমালোচনা করে যে বক্তব্য দেন, তার জবাব দিতে বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি একথা বলেন।

গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস গ্রুপের মাসিক ম্যাগাজিন দ্য ব্যাংকারের 'ফাইন্যান্স মিনিস্টার অব দ্য ইয়ার ফর এশিয়া প্যাসিফিক অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড ২০২০' পান বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি এ স্বীকৃতিকে পুরো জাতির অর্জন বলে মন্তব্য করেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, 'কয়েক দিন আগে আমি পুরস্কৃত হয়েছি। আসলে আমি তো পুরস্কৃত হইনি, পুরস্কৃত হয়েছে পুরো জাতি, প্রধানমন্ত্রীসহ দেশের সকল মানুষ, এটা সবার পুরস্কার। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে উন্নয়ন হয়েছে, সেসব বিবেচনায় এ পুরস্কার।'

সংসদে পাস হওয়া বিল প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতিষ্ঠানগুলোতে আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতেই এ বিল পাস করা হয়েছে। কোনো অসৎ উদ্দেশ্যে তা করা হয়নি। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সততার সঙ্গে, যাতে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত হয়।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, 'আমাদের ভালো কাজগুলো তারা পছন্দ করেন না। সংসদে গতকাল (বুধবার) তারা যেভাবে কথা বলেছেন, এগুলো গণতান্ত্রিক ভাষা না। কোনো সভ্য সমাজে এটি চলে না। একজন বলেছেন, আমি ব্যবসায়ী মন্ত্রী, ভালো ছাত্র ছিলাম। ব্যবসায়ী ছিলাম এটা ঠিক। পেশাগত পরিচয় ছিল আমার। অন্য ব্যবসাও ছিল। আমি সনদপ্রাপ্ত হিসাববিদ (সিএ) ছিলাম। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানও সিএ ছিলেন। কিন্তু আমি ব্যবসায়ী ছিলাম ১২ বছর আগে। ব্যবসা করা তো অপরাধ নয়।'

বুধবার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের আপত্তির মুখে বিলটি পাস হয়। সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেন, 'সংসদে আলোচনায় একটি বিষয়ই উঠে আসে- সেটি হলো ব্যাংক খাতের দুর্বল অবস্থা এবং অর্থ পাচার। পরিমাণও দিয়ে দিলেন তারা। সংসদে এভাবে বললে দেশবাসী বিশ্বাস করেন। আমার প্রশ্ন, এত অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, কীভাবে জানলেন?'

অর্থমন্ত্রী জানান, স্বায়ত্তশাসিত ও আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদ্বৃত্ত টাকা সরকারি কোষাগারে নিয়ে এলে সিঙ্গেল ডিজিটে ঋণ সুদ কার্যকরে সমস্যা হবে না। কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে এই মুহূর্তে ব্যাংকগুলোতে অলস টাকা পড়ে আছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৪৩ কোটি টাকা। ফলে উদ্বৃত্ত অর্থ কোষাগারে আনলে ব্যাংকগুলো কোনো ধরনের আর্থিক সংকটে পড়বে না।

বিলটি পাসের ব্যাখ্যা দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের জন্মলগ্নে সরকারি অর্থ দিয়েই যাত্রা শুরু করেছে। এখন ওইসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা নিজেদের মধ্যে ব্যবহার করছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে এটি জানার অধিকার জনগণের আছে। এ জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আসলে বিরোধী দলের লোকজন সামান্য কিছু পেলেই হৈচৈ করে। তারা যেভাবে কথা বলে এটি গণতান্ত্রিক ভাষা নয়, সভ্য সমাজে এটি চলে না।

রাজস্ব আদায় প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল বলছে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কমছে। প্রবৃদ্ধি কমছে বলা যাবে যদি লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে তুলনা করেন। কর্মকর্তাদের চাপে রাখতে বাড়তি রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে রাজস্ব আহরণ করা হয় ৯১ হাজার কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছে ৯৭ হাজার কোটি টাকা। ফলে রাজস্ব আয় বাড়ছে। প্রথম সাত মাসে রপ্তানি খাতে ৫ শতাংশ কমছে। বছর শেষ এটি থাকবে না।

বিডিবিএলের সম্মেলন: এদিকে, সকালে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) শাখা ব্যবস্থাপকদের সম্মেলনে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, খেলাপি ঋণের জন্য সংসদে তাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে। এটা শুনতে হয়েছে ব্যাংকারদের জন্য। তিনি বলেন, 'ঋণ দিচ্ছেন আপনারা। সেটা খেলাপি হচ্ছে। আর খেলাপি হওয়ার কারণে সংসদে গালি শুনতে হয় আমাকে।' এ সময় তিনি মন্দ ঋণ বিতরণে ব্যাংকারদের যারা জড়িত, তাদের শাস্তি দেওয়ার আহ্বান জানান।

দেশের অর্থনীতির চালচিত্র তুলে ধরে মুস্তফা কামাল বলেন, '২০০৯ সালের পর বিশ্বে এখন একটা অর্থনৈতিক মন্দা যাচ্ছে। গত বছর এমন কোনো দেশ পাওয়া যাবে না যাদের আমদানি-রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। এখন আমাদের আমদানি-রপ্তানি নেতিবাচক অবস্থায় আছে। তবে বছর শেষে সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব বলে আমি বিশ্বাস করি। কারণ, সরকার কিছু সহায়তা দিচ্ছে, সহায়ক ভূমিকা রাখছে।'

এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির বলেন, বিডিবিএলে খেলাপি ঋণ গত সেপ্টেম্বর থেকে কমে এখন ৩৮ দশমিক ২২ শতাংশ হয়েছে। এটি আরও কমিয়ে আনতে হবে। এক-তৃতীয়াংশের বেশি ঋণ খারাপ হয়ে যাবে, এ পরিস্থিতি কখনও গ্রহণ করা যায় না। ঢাকার মতিঝিলে বিডিবিএল ভবনের সম্মেলন কক্ষে এই অনুষ্ঠানে বিডিবিএল চেয়ারম্যান মো. মেজবাহউদ্দিন সভাপতিত্ব করেন।