গোপনে মালিকপক্ষের শেয়ার বিক্রি বন্ধ হচ্ছে

লাভবান হবেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আনোয়ার ইব্রাহীম

অবশেষে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মালিকদের গোপনে শেয়ার বিক্রি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালিকদের কেউ যাতে নিজ কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারসহ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অজ্ঞাতে শেয়ার বিক্রি করতে না পারেন, সেজন্য তাদের শেয়ার ডিজিটাল ব্যবস্থায় ব্লক করা হচ্ছে। এতে লাভবান হবেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিসহ সংশ্নিষ্ট একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

সূত্র জানিয়েছে, শুধু পূর্ব ঘোষণা এবং সংশ্নিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে মালিকপক্ষ অর্থাৎ কোম্পানির উদ্যোক্তা বা পরিচালকরা তাদের শেয়ার কেনাবেচা করতে পারবেন। শিগগির এ ব্যবস্থা কার্যকর হবে। ডিজিটাল ব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির শেয়ারের তথ্য সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সিডিবিএল এ বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কাজ শেষ করেছে। তবে এর আগে যেসব উদ্যোক্তা বা পরিচালক কোনো ঘোষণা ছাড়াই নিজ কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আইন অনুযায়ী, হিসাব বছর শেষ হওয়ার দুই মাস আগে থেকে নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্ষদ সভায় গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত সংশ্নিষ্ট কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকরা শেয়ার কেনাবেচা করতে পারেন না। তবে অন্য সময়ে আগাম ঘোষণা দিয়ে শেয়ার কেনাবেচা করতে পারেন তারা। কোম্পানির লাভ-লোকসান বা অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ব্যবহার করে শেয়ার কেনাবেচার মাধ্যমে মুনাফা করা ঠেকাতেই মূলত এ বিধিনিষেধ।

কিন্তু এতদিন এ আইনের প্রয়োগ ছিল না। এমনকি দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জ ডিএসই ও সিএসই থেকে বিনা ঘোষণায় শেয়ার কেনাবেচার তথ্য পাঠালেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার উল্লেখযোগ্য নজির নেই।

মালিকপক্ষ যে গোপনে শেয়ার বিক্রি করছে, সে বিষয়ে গত বছরের ২৮ অক্টোবর দৈনিক সমকালে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ৩৭ কোম্পানির মালিকপক্ষের ৫৮ জন গোপনে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করেছেন। এরপরই এ ধরনের শেয়ার কেনাবেচা বন্ধে তৎপর হয় বিএসইসি।

অবৈধভাবে শেয়ার কেনাবেচার তথ্য জানার পরও কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় সিএনএটেক্স, ফ্যামিলিটেক্স এবং এমারেল্ড অয়েলের মতো কিছু কোম্পানির কতিপয় উদ্যোক্তা-পরিচালক তাদের অধিকাংশ শেয়ার বিক্রি করেছেন। তাদের কারও কারও এখন হদিস নেই।

সিএনএ টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান রোকসানা মোরশেদ তার প্রায় সব শেয়ার ২০১৭ সালে বিক্রি করেন। চার দফায় ৫ কোটি ১৮ লাখ শেয়ার প্রায় ৫৬ কোটি টাকা মূল্যে বিক্রি করেন তিনি। এর মধ্যে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম দফায় ৭৯ লাখ ৪ হাজার শেয়ার পৌনে ১০ কোটি টাকায় বিক্রি করেন। এ নিয়ে প্রশ্ন না ওঠায় দ্বিতীয় দফায় একই সংখ্যক শেয়ার বিক্রি করেন সাড়ে আট কোটি টাকায়। তৃতীয় দফায় ২০১৭ সালের এপ্রিলে ৪০ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার পৌনে ৫ কোটি টাকায় বিক্রি করেন। এর সাড়ে ছয় মাস পর অক্টোবরে ৩ কোটি ১৯ লাখ ৩৯ হাজার শেয়ার প্রায় ৩৩ কোটি টাকায় বিক্রি করেন। শুধু সিএনএ টেক্সটাইলেরই নয়; ফ্যামিলি টেক্সটাইলের শেয়ারও বিনা ঘোষণায় বিক্রি করেছেন রোকসানা মোরশেদ। গত বছরের অক্টোবরে এ কোম্পানির ৯২ লাখ ৪০ হাজার শেয়ার তিনি সাড়ে সাত কোটি টাকায় বিক্রি করেন।

গোপনে মালিকপক্ষের শেয়ার কেনাবেচার কারণ প্রসঙ্গে শেয়ারবাজার বিশেষজ্ঞ আবু আহমেদ জানান, যখন কোনো উদ্যোক্তা বা পরিচালক বড় অঙ্কের শেয়ার বিক্রির ঘোষণা দেন, তখন শেয়ারটির দর কমে যায়। উল্টোটাও হয়। তাদেরই কেউ যখন বড় অঙ্কের শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা দেয়, তখন শেয়ারটির দর বেড়ে যায়। ফলে সংশ্নিষ্ট উদ্যোক্তা বা পরিচালকের অপেক্ষাকৃত কম বা বেশি দামে শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে হয়। এ জটিলতা এড়াতে কেউ কেউ গোপনে শেয়ার কেনাবেচা করেন। এর বাইরে কর ফাঁকি দিতেও কেউ কেউ গোপনে শেয়ার বিক্রি করেন।

সূত্র জানায়, কোনো উদ্যোক্তা বা পরিচালক বিনা ঘোষণায় যাতে শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে না পারেন, তা ঠেকাতে প্রথমত তাদের সবার শেয়ার সম্পর্কিত তথ্যভাণ্ডার করা হবে। এখানে সবার শেয়ার ব্লক থাকবে। তবে প্রাথমিকভাবে শেয়ার ব্লক করার কাজটি করবে সংশ্নিষ্ট কোম্পানির শেয়ার ডিপার্টমেন্ট। এরপর উদ্যোক্তা বা পরিচালক অর্থাৎ মালিকপক্ষের কেউ শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে চাইলে নিয়মানুযায়ী ঘোষণা দিতে হবে। ঘোষণা অনুযায়ী শেয়ার কেনা বা বেচার অনুমতি পেলে যতটি শেয়ার কেনা বা বেচার অনুমোদন পাবেন, ঠিক ততগুলো শেয়ার কেনা বা বেচার জন্য স্টক এক্সচেঞ্জ ব্লক তুলে দেবে। উদ্যোক্তা-পরিচালকরা চাইলে একবারে বা একাধিকবার শেয়ার কিনতে বা বিক্রি করতে পারবেন। তবে অনুমোদিত সংখ্যার চেয়ে বেশিসংখ্যক শেয়ার কেনা বা বিক্রির অর্ডার দিতে পারবেন না। দিলেও বিদ্যমান ব্যবস্থা ওই অর্ডার গ্রহণ করবে না। শুধু মালিকরা নন; প্রাইভেট প্লেসমেন্টধারী শেয়ারহোল্ডাররাও সংশ্নিষ্ট কোম্পানির তালিকাভুক্তির পর নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শেয়ার বিক্রি করতে পারেন না। তাই উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের পাশাপাশি প্লেসমেন্ট শেয়ারধারীদের শেয়ারও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ব্লক রাখা হবে।

বিএসইসির কর্মকর্তারা জানান, ২০০০ সালে সিডিবিএল প্রতিষ্ঠার পর তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির উদ্যোক্তা-পরিচালকেরসহ শেয়ার ধারণের একটি তথ্যভাণ্ডার তৈরির সুযোগ হয়েছিল। কিন্তু অবহেলার কারণে গত ১৮ বছরেও এ কাজটি হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকেও জোরালোভাবে নির্দেশনা ছিল না। যার সুযোগ নিয়েছে সুযোগ সন্ধানীরা।

জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সাইফুর রহমান সমকালকে বলেন, কমিশনের জনবল সংকট রয়েছে। চাইলে সব বিষয়ে সুচারুভাবে নজরদারি করতে পারে না। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম ঘটছে কি-না, তা বলতে পারে স্টক এক্সচেঞ্জ বা সিডিবিএল। তাদেরই এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া উচিত। বিষয়টির মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এটা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাজেদুর রহমান সমকালকে বলেন, উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির তথ্য যখনই স্টক এক্সচেঞ্জের নজরে আসছে, তখনই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অবহিত করা হচ্ছে। নতুন ব্যবস্থায় নজরদারির প্রয়োজন নেই। কারিগরি সহায়তায় এমন অবৈধ তৎপরতা বন্ধ করা হচ্ছে। তবে কোম্পানিগুলো উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার সঠিকভাবে ব্লক করছে কি-না, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান-সিডিবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শুভ্র কান্তি চৌধুরী সমকালকে বলেন, এরই মধ্যে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় উদ্যোক্তা-পরিচালক ও প্লেসমেন্ট হোল্ডারদের গোপনে শেয়ার বিক্রি বন্ধ হবে।

বিষয় : গোপনে মালিকপক্ষের শেয়ার বিক্রি বন্ধ হচ্ছে