বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি

তদন্তে ভূত ঢুকেছে

সাড়ে তিন বছরে ৫৬ মামলার একটিরও চার্জশিট হয়নি

প্রকাশ: ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির তদন্ত শেষ করতে আর কতদিন লাগবে, নিশ্চিত করে বলতে পারছে না দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রায় সাড়ে তিন বছরেও শেষ হয়নি এ সংক্রান্ত ৫৬টি মামলার তদন্ত। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তদন্তে 'ভূত' ঢুকেছে। সেই ভূতের ইশারায় চার্জশিটও দেওয়া হচ্ছে না।

দুদক আইনে প্রতিটি মামলার তদন্ত সর্বোচ্চ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। তদন্তের ব্যাপকতা ও জটিলতা বিবেচনায় বাড়তি সময় দেওয়ারও রীতি রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের পরও ৫৬ মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সময় নিয়েছেন প্রায় তিন বছর, যা তদন্তের স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ছয় গুণ। রাষ্ট্রায়ত্ত ওই ব্যাংকটির অর্থ লোপাটের তদন্ত শেষ করতে আর কত সময় দরকার, তদন্ত কর্মকর্তারা তা এখনও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আলোচিত এই অর্থ আত্মসাতের তদন্ত রাষ্ট্রের স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা দুদকের কাছে প্রাধান্য পায়নি। অভিযুক্তদের অবস্থান ও পরিচয় বিবেচনায় না নিয়ে দুদককে তদন্ত করার ক্ষমতা আইনে দেওয়া হয়েছে। কমিশনকে এই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি মামলার প্রধান তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন সমকালকে বলেন, ৫৬ মামলার তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। আরও সময় লাগবে। তদন্ত শেষ হলে কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে মামলাগুলোর তদন্ত কবে শেষ হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, বেসিক ব্যাংকে যে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে, তা অবশ্যই নজিরবিহীন। কমিশন ওই অর্থ কেলেঙ্কারির মূল হোতার অবস্থান ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাকে আইনের কাছে সোপর্দ করবে- এটাই মানুষের প্রত্যাশা। আইনগতভাবে দুদক একটি স্বাধীন সংস্থা। তাই এটা দুদকের পক্ষে সম্ভব। এই কাজটি করতে পারলে দুদকের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসবে। বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির তদন্ত এবং অর্থ আত্মসাৎকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করা ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বড় একটি অংশ।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের শেষদিকে সুপ্র্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুসহ তৎকালীন পর্ষদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত ও আদালতে চার্জশিট পেশের জন্য দুদককে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত দুদক রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের ওই আদেশ বাস্তবায়ন করেনি।

সূত্র জানায়, জালিয়াতি করে বেসিক সাংকের সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের তদন্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দুদকে পাঠানো হয় ২০১৩ সালে। পরে অভিযোগটি অনুসন্ধান করে ২ হাজার ৩৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুদক ৫৬টি মামলা করে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে। এসব মামলায় ব্যাংকের সাবেক

এমডি কাজী ফখরুল ইসলামসহ মোট ১২০ জনকে আসামি করা হয়। বাকি ২ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অনুসন্ধানও করা হয়নি। তবে এরপর আর কোনো মামলাও হয়নি।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ৫৬টি মামলা দায়েরের পর প্রায় ৩ বছর পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তদন্তের জন্য বরাদ্দ ১৮০ কার্যদিবস বাদেও কেটে গেছে আরও প্রায় তিন বছর। এই দীর্ঘ সময়ে একটি মামলারও তদন্ত শেষ হয়নি। তাই চার্জশিটও দেওয়া হয়নি।

তদন্ত কেন শেষ হয়নি- এর স্পষ্ট জবাব দিতে চান না সংশ্নিষ্ট কোনো কর্মকর্তা। একাধিকবার মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তা বদল করা হয়েছে। তবু তদন্ত শেষ হয়নি। এই তদন্তের পেছনে কোনো শক্তি কলকাঠি নাড়ছে বলে সন্দেহ রয়েছে অনেকের।

জানা গেছে, সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের সময় শেখ আবদুল হাই বাচ্চু দুই মেয়াদে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকলেও তাকে কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি। শুধু তাই নয়, ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের কারও নামই আসামির তালিকায় নেই।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ঋণ প্রস্তাব ত্রুটিপূর্ণ থাকায় ওই ৫৬ মামলা করা হয়। ওই সময়ের পর্ষদ সভায় খুব সহজেই প্রস্তাবগুলোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এর দায় তারা এড়াতে পারেন না।

জানা গেছে, পর্ষদের ১৩ সদস্যের মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে। এর আগে পর্ষদের সদস্য সাবেক ডাক, তার ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার, সাবেক বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বোস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক নিলুফার আহমেদ, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও অর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কামরুন্নাহার আহমেদ, প্রফেসর ড. কাজী আখতার হোসেন, ফখরুল ইসলাম, সাখাওয়াত হোসেন, জাহাঙ্গীর আকন্দ সেলিম, একেএম কামরুল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলাম (এফসিএমএ), আনিস আহমেদ এবং একেএম রেজাউর রহমানকে জ্ঞিাসাবাদ করা হয়। সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, পর্ষদের ওইসব সদস্যই বেসিক ব্যাংকের তদন্তে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

আত্মসাৎ করা টাকার প্রতিটি ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে ওই সময়ের পর্ষদ। এই কারণে অর্থ আত্মসাতের পেছনে সে সময়ের প্রতিটি সদস্যের দায় রয়েছে। চার্জশিটে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেই আদালতে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন সুপ্রিম কোর্ট। এখন তদন্ত শেষ না হওয়ার দোহাই দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে না।

দুদকের তদন্ত থেকে জানা গেছে, ঋণ প্রস্তাবগুলো ত্রুটিপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) ছাড়পত্র না নেওয়া, জামানতের মূল্য যাচাই না করা, ঋণ গ্রহীতার ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও ঋণের টাকা ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়নি। অধিকাংশ ঋণ গ্রহীতার কোনো ধরনের ব্যবসা ছিল না। কারও ক্ষুদ্র ব্যবসার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও ব্যাংক থেকে নেওয়া কোটি কোটি টাকার ঋণ ফেরত দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না। ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ঋণ প্রস্তাবগুলোতে ওইসব তথ্য উল্লেখ করা হলেও পর্ষদ সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট এক দুদক কর্মকর্তা বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ত্রুটিপূর্ণ ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন দিয়ে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের দায় পর্ষদ সদস্যদেরও নিতে হবে। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অপরাধ করে কেউ পার পেতে পারে না।

জানা গেছে, বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির ৫১ ও ৫৩ নম্বর মামলার আসামি ব্যাংকের বরখাস্ত জিএম জয়নুল আবেদীন চৌধুরীর জামিন আবেদনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছিল সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার আদালতে। শুনানিকালে বিচারপতি সিনহার এক প্রশ্নের জবাবে জয়নুল বলেছিলেন, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন সাপেক্ষে ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদেরকে বোর্ডের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে হয়েছে।

শুনানিকালে জয়নুল আরও বলেছিলেন, ওই সময় পর্ষদের নির্দেশ বাস্তবায়ন করা ছাড়া তাদের কোনো উপায় ছিল না। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে জামিনের আর্জি জানিয়েছিলেন। জয়নুলের ওই বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি এজলাসে উপস্থিত দুদকের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেছিলেন, পর্ষদের যারা ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনতে হবে। অপরাধীদের মধ্যে কারও নাম চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে সংশ্নিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পরে জয়নুলের জামিন নামঞ্জুর করা হয়।

জানা গেছে, আদালতে ওই শুনানির পর আপিল বিভাগের আদেশে বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বাচ্চুসহ ওই সময়কার পর্ষদ সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট পেশের কথা বলা হয়েছিল।

২০০৯ সাল থেকে ১৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত দুই মেয়াদে ছয় বছর বেসিকের পর্ষদ চেয়ারম্যান ছিলেন বাচ্চু। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণ ছিল ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। পরে ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকায়। ওই চার বছর তিন মাসে ব্যাংক থেকে মোট ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়। এর মধ্যে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকাই নিয়ম ভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে। আর এই পুরো টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

বিষয় : বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি