ব্রেইন টিউমারের কথা শুনলেই মনটা আঁতকে ওঠে। ভয়াবহ কিছু মনে ভেসে ওঠে। কারণও আছে। মস্তিষ্ক বিশেষ একটা জায়গা। এখানে অস্ত্রোপচার বেশ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাও এগিয়েছে অনেকখানি। ব্রেইন টিউমারে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা কম নয়। যে কোনো বয়সের নারী-পুরুষ এ টিউমারে আক্রান্ত হতে পারেন। টিউমার হলো, শরীরের কোনো কোষের অস্বাভাবিক ও অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি। যেমন পাকস্থলীর কোষের সংখ্যা যদি অতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা চাকার মতো বড় হয়ে যায়। একেই বলে পাকস্থলীর ক্যান্সার। দেহের বিভিন্ন অঙ্গে ক্যান্সার বা টিউমার হতে পারে।
ব্রেইন টিউমার যে কারণে হয়

ব্রেইন টিউমার বিভিন্ন কারণের জন্য হতে পারে। ব্রেইন টিউমার তখনই হয়, যখন মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কোষগুলোর ডিএনএতে কোনো ত্রুটি থাকে। শরীরের কোষগুলো ক্রমাগত বিভক্ত হয়ে যায় এবং মরে যায়। যার পরিবর্তে অন্য কোষ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে নতুন কোষ সৃষ্টি হয়ে যায়; তবে দেখা যায় পুরোনো কোষগুলো সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হয় না। যার ফলে এ কোষগুলো জমাট বেঁধে টিউমার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আবার অনেক সময় বংশগত কারণে ব্রেইন টিউমার হয়ে থাকে।

টিউমার দুই প্রকার। একটি হলো, বেনাইন ও অন্যটি মেলিগন্যান্ট। বেনাইন টিউমার এত বেশি ক্ষতিকর নয়। এটি চিকিৎসায় পুরোপুরি ভালো হয়। ক্যান্সার বলতে আমরা যা বুঝি তাহলো, মেলিগন্যান্ট টিউমার। ক্যান্সারকে অন্যভাবেও ভাগ করা যায়। ক্যান্সার একটি নির্দিষ্ট অঙ্গে সীমাবদ্ধ থাকলে তাকে বলে প্রাইমারি আর যদি বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে যায় তাকে বলে মেটাস্টাসিস। সবচেয়ে খারাপ হলো, মেটাস্টাসিস। এটি থেকে চিকিৎসা করা অনেকটা দুরূহ ও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্যমতে, বিশ্বে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার মানুষ মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন প্রায় আড়াই লাখ। আমাদের দেশেও এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছেন অনেকে। এ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, মস্তিষ্কের ক্যান্সার বা টিউমার কতটা মারাত্মক। তাই আমরা বলি, মস্তিষ্কের মারাত্মক রোগ টিউমার। ভালো দিক হলো, মস্তিষ্কে বেনাইন টিউমার বেশি হয়। কিন্তু সমস্যা হলো, মস্তিষ্কে যেহেতু জায়গা কম, তাই টিউমার প্রভাব ফেলতে পারে সহজেই। মানে হলো, লক্ষণগুলো দেখা দেয় তাড়াতাড়ি। এর সুবিধাও আছে। এর ফলে রোগী দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান। তাই রোগ তাড়াতাড়ি ধরা পড়ে। মস্তিষ্কে মেটাস্টাসিস হতে পারে, তবে তা খুব কম। মস্তিষ্কের টিউমার যে কোনো বয়সে হতে পারে। শিশুদের যত ক্যান্সার হয়, তার দ্বিতীয় কারণ এটি। কিন্তু এর কারণ জানা যায় না। তবে কিছু জিনের মিউটেশনে এটি হতে পারে। এ ছাড়াও রেডিয়েশনেও হতে পারে টিউমার।

মস্তিষ্কের ক্যান্সারের মূল লক্ষণ হলো মাথাব্যথা। তবে মাথাব্যথা হলেই যে মস্তিষ্কের ক্যান্সার তা কিন্তু নয়। মাথাব্যথার যত কারণ আছে তার বেশিরভাগই কিন্তু অন্য। মস্তিষ্কের টিউমারের মাথাব্যথার ধরন একটু ভিন্ন। মাথাব্যথা সারাক্ষণ থাকে, পুরো মাথায় হালকা বা মাঝারি ধরনের ব্যথা থাকে। হাঁচি-কাশি দিলে মাথাব্যথা বেড়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠলে ব্যথা বেশি হয়। মাথাব্যথার সঙ্গে বমি হতে পারে।

টিউমারের অবস্থানের ওপর নির্ভর করে কিছু কিছু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন- মস্তিষ্কের সামনের দিকে টিউমার হলে আচরণে অস্বাভাবিকতা, হঠাৎ রেগে যাওয়া, মনোযোগে ঘাটতি হতে পারে।

শরীরের একপাশ ধীরে ধীরে অবশ হওয়া, চোখে দেখার সমস্যা, হাঁটতে সমস্যা, ভারসাম্যহীনতা, কথা বলার সমস্যা, খিঁচুনি, কানে শোনার সমস্যা ইত্যাদি লক্ষণগুলো দেখা যেতে পারে।

টিউমার নির্ণয়ে শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি জরুরি মস্তিষ্কের সিটিস্ক্যান বা এমআরআই। এ ছাড়া আরও কিছু পরীক্ষার প্রয়োজন পড়ে। মস্তিষ্কের টিউমারের চিকিৎসা পদ্ধতির মধ্যে আছে- মেডিকেল চিকিৎসা, সার্জারি, রেডিওথেরাপি ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি। সার্জারি ব্রেইন টিউমারের মূল চিকিৎসা পদ্ধতি। কিছু টিউমার আছে যেটা মস্তিষ্কের মূল অংশ থেকে আলাদা থাকে। এদের চারদিকে পর্দা দ্বারা আবৃত থাকে। এমন হলে সার্জারির মাধ্যমে টিউমার পুরোপুরি কেটে ফেলা সম্ভব হয়। কিছু ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের মূল অংশে টিউমার দেখা দেয়। সেসব ক্ষেত্রে অপারেশন করে পুরো টিউমার কেটে ফেলা যায় না, তখন টিউমার আংশিক কেটে ফেলে অন্যান্য চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়।আবার কিছু টিউমার আছে যার পরিমাণ বেশ কম, তা শুধু ওষুধের মাধ্যমে পুরোপুরি সেরে যায়। সঠিক রোগ নির্ণয় করতে দেরি হলে যে কোনো রোগের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের কিছুই করার থাকে না। এসব রোগে আক্রান্ত রোগী এতই বিভ্রান্ত থাকেন, তাঁদের চিকিৎসার সময়টি তাঁরা অযথা নানাজনের অপ্রয়োজনীয় পরামর্শ পার করে দেন। অনেকেই জানেন না, আমাদের দেশেও এখন ব্রেইন টিউমারের আধুনিক চিকিৎসা সম্ভব।

অনেকে জানতে চান, অপারেশন ছাড়া কি টিউমারের চিকিৎসা নেই? তাঁরা অকারণে অপারেশন করতে দেরি করেন। তাঁদের বলছি, চিকিৎসক যদি অপারেশন করতে বলেন, তাহলে অহেতুক দেরি না করে অপারেশন করাই ভালো।

[কনসালট্যান্ট নিউরোলজিস্ট
ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টার, উত্তরা, ঢাকা]

বিষয় : ব্রেইন টিউমার

মন্তব্য করুন