চট্টগ্রাম নগরের বাদুরতলা। বিকেল পাঁচটায় এই এলাকায় হাঁটু পানি জমে আছে। দুপুরে নগরের ষোলশহর চিটাগং শপিং কমপ্লেক্সে একটি পোশাকের দোকানের কর্মচারীরা পানি সেচ দিচ্ছিলেন। বহদ্দারহাটের হক মার্কেটেও ভিজে যাওয়া পোশাক সরানোর চেষ্টা করছিলেন এক দোকান মালিক। সোমবার চট্টগ্রাম নগরের চিত্র। শুধু এই তিনটি স্থানেই নয়, নগরের অধিকাংশ এলাকা পানিবন্দী হয়ে আছে। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জোয়ারের পানিও।

অনেকে নৌকা নিয়ে চলাচল করেছেন। জলাবদ্ধতায় নগরবাসী কষ্ট পেলেও দায় নিতে নারাজ কেউ। নগর উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলো একে অপরকে দুষছেন। জলাবদ্ধতায় ঘরবন্দী হয়ে আছেন স্বয়ং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। জমে থাকা পানিতে বাসা থেকে বের হতে না পারায় সকালে সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে যেতে পারেননি। বাতিল করা হয় পূর্ব নির্ধারিত সাতটি বৈঠক। পরে দুপুরে নগর ভবনে যান তিনি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সমকালকে বলেন, ‘খালে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলছে। খালে সংস্কার কাজের জন্য দেওয়া বাঁধগুলো অপসারণ করা হলেও মাটি থেকে গেছে। যার কারণে পানি চলাচল বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়া খালের মুখে যেসব স্লুইচগেইট নির্মাণ করা হয়েছে এগুলো সরু। যাতে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ হচ্ছে না।’

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রধান প্রকৌশলী কাজী হাসান বিন শামস বলেন, ‘খাল থেকে বাঁধ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। খালে পানি চলাচলে কোন সমস্যা নেই। নগরের ৫৭টি খালের মধ্যে প্রকল্পের আওতায় কাজ চলছে ৩৬টি খালে। নগরের ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার নালার মধ্যে কাজ চলছে ৩০২ কিলোমিটার নালায়। সিটি করপোরেশন বাকি খাল ও নালা-নর্দমাগুলো ঠিক সময়ে পরিষ্কার করলে পানিনিষ্কাশনে বাধা থাকত না।’

সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে নগরের বহদ্দারহাট এলাকায় হাঁটু পানি জমে আছে। ওই এলাকার বহদ্দার বাড়ির স্বয়ং সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনের নিচতলায় হাঁটুপানি জমে আছে। বাড়ির সামনে গলিতে কোমরসমান পানি। পানিবন্দী থাকায় সকালে নগরের টাইগারপাস নগর ভবনে আসতে পারেননি। দুপুরে তিনি নগর ভবনে আসেন।

এ প্রসঙ্গে মেয়রের একান্ত সচিব মুহাম্মদ আবুল হাশেম বলেন, ‘সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সিটি করপোরেশন পরিচালিত সাতটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে মেয়র মহোদয়ের পৃথক পৃথক বৈঠক ছিল। বৃষ্টির কারণে তাদের অনেকে আসতে পারবেন না, তাই বৈঠক স্থগিত করা হয়েছিল।’

এদিকে নগরের হক মার্কেটে অন্তত ৩৫০টি দোকান রয়েছে। এরমধ্যে প্রায় ১০০ দোকানে পানি ঢুকেছে বলে দাবি করেছেন মার্কেটটির ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক। তিনি বলেন, ‘চালের বস্তা ও পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য ভিজে ব্যবসায়ীদের অন্তত দুই কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে।’

এই মার্কেটের শাহ শরীফ ফ্যাশনের কর্ণধার মো. মানিক মিয়া। স্ত্রী, ৩ ছেলে ও ২ মেয়ে নিয়ে তার সংসার। তার দোকান ভাড়া ১৫ হাজার টাকা। বাসা ভাড়া ১২ হাজার টাকা। এই দোকানের আয়ে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ করেন। কিন্তু দোকানে পানি জমে থাকায় গত পাঁচদিন ধরে কোন বিক্রি করতে পারেননি। পানিতে দোকানের পোশাকও ভিজে গেছে। এসব পোশাক কিভাবে শুকিয়ে আবার বিক্রি করবেন তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।

নগরের ষোলশহরে অবস্থিত চিটাগং শপিং কমপ্লেক্সের অনেক দোকানে পানি ঢুকে গেছে। সকালে দোকান খোলার পর থেকে জমে থাকা পানি সেচ দিয়ে বের করছেন কর্মচারীরা। রুকু শাড়ীজ নামে একটি দোকানের কর্মচারীরা জানান, রোববার রাতে দোকানে পানি ঢুকে গেছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই তাদের এই দুর্ভোগে পড়তে হয়।

বিকালে নগরের আরাকান সড়কের বাদুরতলা এলাকায়ও জমে আছে হাঁটুপানি। এখানকার কোন কোন গলিতে কোমরসমান পানি জমে আছে। বাদুরতলা এলাকার বাসিন্দা সরওয়ার কামাল সমকালকে বলেন, ‘ভবনের পার্কিংয়ে রোববার রাতে হাঁটু পানি ছিল। সকালে একটু কমেছিল। বিকালের পর থেকে আবার পানি বাড়তে শুরু করেছে। অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন এখানকার বাসিন্দারা।’

বৃষ্টির সঙ্গে জোয়ারের পানি যুক্ত হয়ে ডুবে যায় নগরের চান্দগাঁও থানাও। চারতলা থানা ভবনটির নিচতলায় ওসি, ডিউটি অফিসার, অফিসার ও হাজতখানা রয়েছে। নিচতলায় পানি ঢুকে যাওয়ায় দ্বিতীয় তলায় বসে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। বিপাকে পড়ছেন সেবা নিতে আসা লোকজনও। সন্ধ্যা পৌনে সাতটা পর্যন্ত পানি জমে আছে বলে জানিয়েছেন চান্দগাঁও থানার ওসি মঈনুর রহমান।

তিনি সমকালকে বলেন, ‘রোববার পর্যন্ত বাইরে পানি ছিল। রাতে পানি বেড়ে থানার নিচতলায় ঢুকে যায়। এখন নিচতলায় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। দুইতলায় অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।'

 সিটি করপোরেশনের জলাবদ্ধতা নিরসন স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, ‘বৃষ্টির সাথে জোয়ারের পানি যোগ হয়েছে। জোয়ার থাকায় কর্ণফুলী দিয়ে নগরের জমে থাকা পানি নামতে পারছে না। জোয়ারের কারণে বেশিরভাগ খাল থেকে পানি নামতে পারছে না। পরিচ্ছন্ন বিভাগের কর্মীরা কাজ করছেন। তারা স্কেভেটর ও অন্য যন্ত্রপাতি দিয়ে পানি প্রবাহের বাঁধা সরিয়ে দিচ্ছে।’

পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় চট্টগ্রামে ১৬২ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টিপাত কমতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম।