চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন

কঠিন চ্যালেঞ্জে আওয়ামী লীগের নতুন মুখ

প্রকাশ: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে মেয়র ও কাউন্সিলর পদে এবার নতুনের ওপরেই বেশি আস্থা রেখেছে আওয়ামী লীগ। মেয়র পদে ২০ জন দলীয় মনোনয়ন ফরম নিলেও নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়েছে নতুন মুখ রেজাউল করিম চৌধুরীকে। মনোনয়নবঞ্চিত বাকিদের দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বলেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে শিল্পপতি মজিবুর রহমানের পক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ফরম নেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশন থেকে। মজিবুর যদি শেষ পর্যন্ত প্রার্থী হন, তবে তা বেকায়দায় ফেলবে রেজাউলকে।

কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগকে এ সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে আরও বেশি। ১৪টি সাধারণ ওয়ার্ডে যাদের নতুন মুখ হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে দল; তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনোনয়নবঞ্চিত বর্তমান কাউন্সিলররা। এমন কোন্দলের কারণে আগের চসিক নির্বাচনেও কাউন্সিলর পদে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে পাঁচটি ওয়ার্ডে বিজয়ী হয়েছিলেন বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী।

জানতে চাইলে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, মেয়র ও কাউন্সিলর পদে দল যাদের মনোনয়ন দিয়েছে, তাদের পক্ষে কাজ করা উচিত মনোনয়নবঞ্চিতদের। দলের বিজয় সুনিশ্চিত করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। আমি মনে করি, মনোনয়নবঞ্চিতরা সবাই দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। এখন নির্বাচন কমিশন থেকে ফরম নিলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্রোহীরা তা প্রত্যাহার করে নেবেন।

রেজাউল করিম আরও বলেন, যারা মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন তাদের কেউ কেউ এলাকায় জনপ্রিয়ও হতে পারেন। তাদের রাগ- ক্ষোভও থাকতে পারে। আলাপ-আলোচনা করে আমরা এটি ঠিক করতে পারব বলে আশাবাদী। মনে রাখতে হবে, আমাদের কোনো ভুল সিদ্ধান্ত যেন বিএনপি-জামায়াতকে সুবিধা নেওয়ার সুযোগ করে না দেয়।

অন্যদিকে মজিবুর রহমান বলেন, 'একাধিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছি; কিন্তু পাইনি। এবারও মেয়র পদে মনোনয়ন চেয়েছিলাম, কিন্তু দল আস্থা রেখেছে রেজাউল করিমের ওপর। তবু আমার নামে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কেউ একজন ফরম নিয়েছেন। এটি জমা দেওয়ার ইচ্ছা আমার নেই।' বিভ্রান্তি দূর করতে তাহলে বিষয়টি জনসমক্ষে পরিষ্কার করছেন না কেন- জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ব্যক্তিগতভাবে যারা জানতে চাচ্ছেন তাদের বলছি স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করার ইচ্ছা আমার নেই। কিন্তু জনসমক্ষে এ ঘোষণা দিতে চাচ্ছি না।'

২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ চসিক নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী থাকায় বিজয়ী হয়েছিলেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। কিন্তু আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী থাকায় ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে চারটিতে বিএনপি ও একটিতে বিজয়ী হয়েছিল জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী। দলীয় মনোনয়ন থাকলেও সে বার ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী সবাই। কিন্তু এবারই প্রথম দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হচ্ছে চসিকে।

চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত মজিবুর রহমানের নামে মেয়র পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশন থেকে ফরম নিয়েছেন তৃতীয় কোনো ব্যক্তি। এর আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নগরীর কোতোয়ালি-বাকলিয়া আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন মজিবুর। বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে হওয়া সর্বশেষ উপনির্বাচনেও এমপি পদে মনোনয়ন ফরম নিয়েছিলেন তিনি। তার বাবা সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসিও এ দুটি আসনে মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হন। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় সংসদ নির্বাচনে আর প্রার্থী হননি বাপ-বেটার কেউই। এবার মেয়র পদেও মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন তারা দু'জনই। নুরুল ইসলাম বিএসসি দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও মেয়র পদে স্বতন্ত্র হিসেবে অন্য মানুষকে দিয়ে ফরম নেওয়া হয়েছে মজিবুর রহমানের জন্য। ভোটের মাঠে ব্যক্তি মজিবুর বড় কোনো ফ্যাক্টর নন। কিন্তু নুরুল ইসলাম বিএসসির আলাদা একটি ভোট ব্যাংক আছে বাকলিয়া-কোতোয়ালি-চান্দগাঁয়। সেখানে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান আছে তাদের। কয়েক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন তাদের বিভিন্ন শিল্প কারখানায়। এটিকে কাজে লাগাতেই তৃতীয় ব্যক্তিকে দিয়ে মজিবুরের নামে ফরম নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন নগরবাসী।

মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত মজিবুরকে নিয়ে ধূম্রজাল থাকলেও কাউন্সিলর পদে নতুন মুখের প্রার্থীদের মোকাবিলা করতে হবে কঠিন চ্যালেঞ্জ। ৪১ সাধারণ ওয়ার্ডের মধ্যে এবার ১৪টিতে পুরোনো কাউন্সিলরদের সরিয়ে নতুনের ওপর আস্থা রেখেছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু পুরোনো কাউন্সিলরের বেশিরভাগই নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। ১১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর মোরশেদ আকতার চৌধুরীর পরিবর্তে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. ইসমাইলকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন মোরশেদ আকতার চৌধুরী। তিনি বলেন, এলাকার মানুষ আমাকে আবার নির্বাচন করার ব্যাপারে চাপ দিচ্ছে। এটি যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন, তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করব। এলাকায় আমার সময়ে যে উন্নয়ন কাজ হয়েছে সেটির মূল্যায়ন জনগণ করবে।

তবে নতুন প্রার্থী মো. ইসমাইল বলেন, দলীয় প্রতীকে এবারই প্রথম নির্বাচন হচ্ছে চসিকে। তাই দলের বাইরে গিয়ে কেউ বিদ্রোহী প্রার্থী হলে নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে দল ব্যবস্থা নেবে।

শুধু ১১ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ড নয়; ১৪ নম্বর লালখানবাজার ওয়ার্ডেও মনোনয়নবঞ্চিত বর্তমান কাউন্সিলর আবুল ফজল কবির আহমদ মানিক নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই ওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছেন নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা নতুন মুখ আবুল হাসনাত মো. বেলাল। ৩৩ নম্বর ফিরিঙ্গি বাজার ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর হাসান মুরাদ বিপ্লবের পরিবর্তে মনোনয়ন পেয়েছেন নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন। কিন্তু নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন বিপ্লব। ৩১ নম্বর আলকরণ ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর তারেক সোলেমান সেলিমের পরিবর্তে মনোনয়ন পেয়েছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য মো. আবদুস সালাম। কিন্তু তারেক সোলেমান সেলিমও নির্বাচন করবেন। ২৫ নম্বর রামপুর ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর এরশাদ উল্লাহর পরিবর্তে মনোনয়ন পেয়েছেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুস সবুর লিটন। ৯ নম্বর উত্তর পাহাড়তলী ওয়ার্ডে মো. জহুরুল আলম জসিমের পরিবর্তে মনোনয়ন পেয়েছেন পাহাড়তলী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি নুরল আবছার মিয়া। কিন্তু জহুরুল আলম জসিম বলেন, আমি নির্বাচন করব। গত সাড়ে চার বছরে শতকোটি টাকার উন্নয়ন হয়েছে আমার ওয়ার্ডে। চসিকের ৪১ ওয়ার্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ কাজ হয়েছে আমার ওয়ার্ডেই।