চসিক নির্বাচন

চট্টগ্রামে পাল্টে যাচ্ছে রাজনীতির সমীকরণ

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদলে চট্টগ্রামে পাল্টে যাচ্ছে রাজনীতির সমীকরণও। মেয়র পদে রেজাউল করিম চৌধুরী নির্বাচিত হলে এ পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে আরও ব্যাপকভাবে। এতদিন চট্টগ্রামের আওয়ামী রাজনীতি দুটি বলয়ে বিভক্ত থাকলেও এখন রেজাউলকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন আরেকটি বলয়। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছিরের বলয়ে না থাকা আওয়ামী লীগের অংশটি সখ্য গড়ে তুলছে রেজাউলের সঙ্গে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে কিংবা নগরকে যথাযথভাবে সাজাতে হলে নিজের বিশ্বস্ত কিছু মানুষ লাগবে নতুন এ প্রার্থীর। এই সুযোগে মেয়র প্রার্থী রেজাউলের সঙ্গে সখ্য বাড়াচ্ছে নতুন কিছু মুখ। কেন্দ্রের সঙ্গে কথা বলে রেজাউল করিম নিজেও নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে তার পছন্দের প্রার্থীদের কাউন্সিলর পদে মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। নির্বাচনী বৈতরণী পার হলে বিশ্বস্ত এসব নেতাকর্মীকে কমিটিতেও অন্তর্ভুক্ত করতে চাইবেন তিনি। জানতে চাইলে চট্টগ্রামে নৌকার মনোনয়ন পাওয়া নতুন প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, প্রার্থী হিসেবে আমি নতুন হলেও রাজনীতিতে সম্পৃক্ত আছি ৫০ বছর ধরে। সাংগঠনিক সম্পাদক থেকে নগরের সর্বশেষ কমিটিতে পেয়েছি যুগ্ম সম্পাদকের পদ। নির্বাচনের পর নতুন করে কমিটি হবে আওয়ামী লীগের। তার আগে আমাকে ভালোভাবে পার হতে হবে নির্বাচনী বৈতরণী। নগর আওয়ামী লীগের সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই এ নির্বাচনে বিজয়ী হতে চাই আমি। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদেও বিজয় নিশ্চিত করতে হবে আওয়ামী লীগের। তাই যাদের ইমেজ ভালো ও সাংগঠনিক দক্ষতা ভালো কাউন্সিলর হিসেবে আমি তাদেরই চেয়েছি। নির্বাচনী কৌশল সাজাতে আমার দরকার হবে বিশ্বস্ত কিছু মানুষের। যারা মনেপ্রাণে নৌকার পক্ষে কাজ করবে, নতুন কমিটিতে দলও নিশ্চয়ই তাদের মূল্যায়ন করবে।
২০১৩ সালে নগর আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্য বিশিষ্ট বর্তমান কমিটি ঘোষণা করা হয়। তিন বছরের জন্য গঠিত এ কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে আরও চার বছর আগে। কোন্দলের কারণে কমিটি গঠন করতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ। গত বছরের ডিসেম্বরে হওয়া আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগে কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মেয়র নির্বাচন সামনে থাকায় চট্টগ্রামে আর কমিটি করা হয়নি। মেয়র নির্বাচনের পরে কমিটি করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। নগরের বর্তমান কমিটিতে যারা আছেন তাদের বেশিরভাগই হয় মহিউদ্দিন চৌধুরীর অনুসারী, না হয় আ জ ম নাছিরের অনুসারী। এই দুই গ্রুপের বাইরে থাকা নেতার সংখ্যা খুবই কম। ধারণা করা হচ্ছে, যে অংশটি এই দুই গ্রুপের বাইরে আছে তারাই এখন সখ্য বাড়াবে আওয়ামী লীগের নতুন প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে।
বর্তমান কমিটি সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করায় নতুন কমিটির ব্যাপারে সোচ্চার আছে আওয়ামী লীগের একটি অংশ। আবার যুবলীগে থাকা শীর্ষ নেতারাও চাচ্ছেন আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হতে। এরই মধ্যে এমন ইচ্ছার কথা প্রকাশও করেছেন নগর যুবলীগের শীর্ষ নেতারা। জানতে চাইলে নগর যুবলীগের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু বলেন, আসন্ন মেয়র নির্বাচন আমাদের জন্য অগ্নিপরীক্ষা। প্রার্থী হিসেবে রেজাউল করিম চৌধুরী নতুন হলেও রাজনীতিতে তিনি অনেক পুরোনো মানুষ। এ নির্বাচনে আমরা কাজ করতে চাই মনেপ্রাণে। যুবলীগ থেকে প্রবেশ করতে চাই আওয়ামী লীগেও। যুগ্ম আহ্বায়ক দেলোয়ার হোসেন খোকা বলেন, নির্বাচনের পরে নতুন কমিটি হবে আওয়ামী লীগের। ছাত্রলীগ হয়ে যুবলীগ করছি অনেক বছর ধরে। বয়স এখন ৫০ ছাড়িয়ে গেছে। যুবলীগে আর থাকতে চাই না। নতুন কমিটি হলে আওয়ামী লীগে যেতে চাই আমি। তার আগে নৌকার প্রার্থী রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী করতে হবে আমাদের। প্রধানমন্ত্রী তার ওপর যে আস্থা রেখেছেন এর প্রতিদান দিয়েই আওয়ামী লীগে আসতে চাই আমি। যুবলীগের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক ফরিদ মাহমুদও অভিন্ন ইচ্ছার কথা জানান। তিনি বলেন, রেজাউল করিম চৌধুরীকে বিজয়ী করে আমরা প্রধানমন্ত্রীর আস্থার মূল্য দিতে চাই। অতীতেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে যুবলীগ। এবারও এই ধারা অব্যাহত রাখতে চাই আমরা।
আওয়ামী লীগের বর্তমান কমিটিতে ১৩ জন প্রবীণ নেতাকে উপদেষ্টা করা হয়েছে। তারা হলেন- সাবেক সাংসদ ইসহাক মিয়া, একেএম বেলায়েত হোসেন, ডা. ছৈয়দুর রহমান, মুহাম্মদ কলিমউল্লাহ চৌধুরী, সুলতান আহমেদ, নূরুল হক, আহমেদুর রহমান সিদ্দিকী, নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম, খন্দকার সিরাজুল আলম, মোহাম্মদ সফর আলী, শেখ মোহাম্মদ ইসহাক এবং এম এনামুল হক। তাদের মধ্যে সাবেক সাংসদ ইসহাক মিয়াসহ কয়েকজন মারা গেছেন। নির্বাচনের পর হওয়া নতুন কমিটিতে তাদের স্থলাভিষিক্ত হবেন অন্য কেউ। বর্তমান কমিটিতে এক নম্বরসহ সভাপতি হিসেবে আছেন মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী। তিনি এখন ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সহসভাপতি হিসেবে আছেন নইম উদ্দিন চৌধুরী, ?সুনীল কুমার সরকার, ডা. আফছারুল আমীন, নুরুল ইসলাম বিএসসি, ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল, খোরশেদ আলম সুজন, জহিরুল আলম দোভাষ এবং আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু। নতুন কমিটি হলে পরিবর্তন আসবে এখানেও।
বর্তমান কমিটিতে বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। কিন্তু তাদের অনেকে এবার মনোনয়ন পাননি আওয়ামী লীগের। আ জ ম নাছির মেয়র পদে মনোনয়ন না পাওয়ায় কাউন্সিলরদের মধ্যে এবার নতুন মুখ এসেছে প্রায় অর্ধেক। নৌকার মনোনয়ন পাওয়া রেজাউল করিম চৌধুরীও কাউন্সিলর পদে তার পছন্দের প্রার্থীর কথা জানিয়েছিলেন কেন্দ্রে। স্থানীয় এমপিদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাউন্সিলরের ব্যাপারে কথা বলেন রেজাউল করিম। তার পছন্দের এ কাউন্সিলররা বিজয়ী হলে আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিতেও তাদের অন্তর্ভুক্তির দাবি জোরালো হবে। মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির গ্রুপের বাইরে গিয়ে এভাবেই নতুন একটি মেরুকরণ হচ্ছে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগে।