তারা সবাই হতে চান কাউন্সিলর

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

কেউ স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য, কেউ আবার স্থানীয় ধর্মীয় কিংবা সামাজিক সংগঠনের সদস্য। কিছু আছেন নামসর্বস্ব সংগঠন ও দলের নেতা। অনেকে এলাকায় একেবারেই অপরিচিত। তারা সবাই হতে চান 'কাউন্সিলর'। চট্টগ্রাম মহানগরের ৪১টি ওয়ার্ডের কোনোটিতে এবার সর্বোচ্চ ১২ জন, কোনো ওয়ার্ডে ৭ থেকে ৯ জন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থী হয়েছেন। মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও বর্তমান মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সমর্থিত একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। দলীয় পরিচয় না থাকলেও অনেকে মনোনয়নও প্রত্যাশা করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল থেকে। দল থেকে মনোনয়ন না পেলেও স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে আছেন দলে অনেক অতিথি পাখিও। আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন (চসিক) উপলক্ষে সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুনে ভরে গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের অলিগলি। করপোরেশনের আওতাধীন ৪১ ওয়ার্ডের ৫৬টি পদের বিপরীতে শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ থেকেই এবার রেকর্ড সংখ্যক ৪০৯ জন কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। দলীয় পরিচয় ছাড়া আরও কয়েকশ সম্ভাব্য প্রার্থী চাচ্ছেন নির্বাচনে প্রার্থী হতে।

নগরের ৪ নম্বর চান্দগাঁও ওয়ার্ডে কাউন্সিলরসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা জানা গেছে সর্বোচ্চ ১২ জনের। এর মধ্যে আওয়ামী লীগেরই মনোনয়নপ্রত্যাশী নয়জন। বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন দু'জন। দলীয় মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র হয়ে নির্বাচনে লড়ার ঘোষণা দিয়েছেন এক প্রার্থী। এখানে তালিকায় আছেন বর্তমান কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন খালেদ সাইফ, চান্দগাঁও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য নাজমুল হক নজু, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি ফারুক ইসলাম, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য দেবাশীষ আচার্য্য ও কেএম শহিদুল কাউসার, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এসএম হুমায়ন, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম খান, সাবেক সদস্য জামাল উদ্দিন ও সাবেক ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক নাছির উদ্দিন। বিএনপির প্রার্থীর তালিকায় আছেন মো. ইলিয়াছ ও মোস্তফা কামাল। স্বতন্ত্র হিসেবে লড়তে আগ্রহী সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুল আলম।

৩৪নং পাথরঘাটা ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন ১০ জন। তারা হলেন- বর্তমান কাউন্সিলর মোহাম্মদ ইসমাইল, আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ আনিসুর রহমান, আসফাক আহমদ, পুলক খাস্তগীর, মশিউর রহমান রোকন, সুমন চৌধুরী, সোলায়মান সুমন, শফিফুল আলম ও সুজন কুমার ভট্টাচার্য্য। সংরক্ষিত ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগের বর্তমান কাউন্সিলর লুৎফুন্নেছা দোভাষ বেবীসহ মনোনয়ন চাচ্ছেন আরও কয়েকজন।

৭নং পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডে সম্ভাব্য প্রার্থী সাতজন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের পাঁচ ও বিএনপির দু'জন রয়েছেন। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চাচ্ছেন বর্তমান কাউন্সিলর মোবারক আলী ও তার ভাই তালেব আলী। তালিকায় থাকা অন্যরা হলেন- ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমিরুল ইসলাম, পাঁচলাইশ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইয়াকুব ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল মাহমুদ। বিএনপি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন দলের মহানগর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরইউ চৌধুরী শাহীন ও ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. আসলাম।

২১নং জামালখান ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনসহ প্রার্থী আছেন ছয়জন। অন্যরা হলেন- সাবেক কাউন্সিলর অ্যাডভোকেট এমএ নাসের ও প্রকৌশলী বিজয় কুমার চৌধুরী কিষাণ, ওয়ার্ড যুবলীগের আহ্বায়ক মো. আইয়ুব, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক উপ-সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক ফরহাদুল ইসলাম চৌধুরী এবং হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ নেতা সুচিত্রা গুহ টুম্পা। সংরক্ষিত ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর বিএনপির মনোয়ারা বেগম মনিসহ রয়েছেন পাঁচজন।

১৫ নম্বর বাগমনিরাম ওয়ার্ডে ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান কাউন্সিলরসহ মনোনয়ন চাচ্ছেন ছয়জন। বিএনপি থেকে আছেন দু'জন। ১৮ নম্বর পূর্ব বাকলিয়া ওয়ার্ডে বর্তমান কাউন্সিলর হারুনুর রশিদের মতো আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন আরও চারজন। এ ওয়ার্ডে বিএনপি থেকেও মনোনয়ন চাচ্ছেন বেশ কয়েকজন।

এভাবে ৪১টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতে এবার সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীর ছড়াছড়ি। এত সংখ্যক প্রার্থী প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন সমকালকে বলেন, 'কাউন্সিলর পদে নৌকার একক প্রার্থী ঠিক করবে কেন্দ্র। শুনেছি দল থেকে একাধিক প্রার্থী এবার মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে নিতে হবে। দল যাকে চূড়ান্ত করবে, তার জন্যই সবাইকে কাজ করতে হবে। কেউ দলীয় সিদ্ধান্ত অম্যান্য করে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে কেন্দ্র।'

চান্দগাঁও ওয়ার্ডে এবারও প্রার্থী হওয়া বর্তমান কাউন্সিলর সাইফুদ্দিন খালেদ সাইফু বলেন, 'নির্বাচনকে ঘিরে অতিথি পাখির সমাগম ঘটেছে। তবে স্থানীয় ভোটার ও দল এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। গত পাঁচ বছরে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি দেওয়া বেশিরভাগই পূরণ করেছি। এ কারণে এলাকার মানুষ আবারও আমাকে কাউন্সিলর হিসেবে পেতে চাচ্ছেন। জনসমর্থন থাকায় জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।'

সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর পদপ্রার্থী নীলু নাগ বলেন, 'আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার সম্পর্ক অনেক বছরের। বিপদে-আপদে সবসময় দলের সঙ্গে ছিলাম, এখনও আছি। অতীতে দায়িত্ব পেয়ে এলাকার উন্নয়নে দিনরাত কাজ করেছি। যে কারণে মানুষ ভোট দিয়ে আমাকে জয়ী করেছেন। এবার অনেক প্রার্থী থাকলেও জনসমর্থন আছে আমারই। ভোটাররা এবারও জয়যুক্ত করে আমার কাজের মূল্যায়ন করবে বলে বিশ্বাস।'

পশ্চিম ষোলশহর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মোবারক আলী বলেন, 'চলতি টার্মে বরাদ্দ পাওয়া ১৩৫ কোটি টাকার মধ্যে ১০০ কোটি টাকার কাজ শেষ করেছি। বাকি ৩৫ কোটি টাকার কাজ চলমান। এসব কাজ শেষ হলে ওয়ার্ডের ৯০ শতাংশ রাস্তা পাকাকরণের কাজ সম্পন্ন হবে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এলাকার সামগ্রিক উন্নয়নে কাজ করেছি। এবারের নির্বাচনে ভোটাররা এসবের সুফল দেবে।'

আন্দরকিল্লা ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর জহুরলাল হাজারী বলেন, 'মনোনয়ন ফরম কেনার অধিকার সবাই রাখে। তবে সবার যে জনপ্রিয়তা আছে তা সঠিক নয়। এলাকার জন্য যিনি কাজ করবেন, এমন প্রার্থীকেই বেছে নেবেন ভোটাররা। ১৫ বছর ধরে আমি ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছি। প্রত্যেকবার ভালো কাজ করেছি বলেই এলাকাবাসী আমাকে জয়যুক্ত করেছে। এবারও আমি আশাবাদী।'

নতুন প্রার্থী ঘোষণা দেওয়া দেবাশীষ আচার্য্য বলেন, 'দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আছি। এলাকার মানুষ চায় আমি নির্বাচন করি। স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয়তা থাকায় এবারের নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছি।'