কবে দায়িত্ব পাচ্ছেন তাপস ও আতিক

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

বিপুল ভোটের ব্যবধানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরও শিগগির মেয়রের চেয়ারে বসতে পারছেন না ডিএসসিসির নবনির্বাচিত মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। দায়িত্ব পেতে তাকে আরও প্রায় সাড়ে তিন মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে কোনো কারণে বর্তমান মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন মেয়াদ পূরণের আগেই পদত্যাগ করলে বা দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ প্রকাশ করলে শপথ গ্রহণ সাপেক্ষে তাপস মেয়রের আসনে বসতে পারবেন।

কিন্তু ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ক্ষেত্রে এ রকম কোনো জটিলতা নেই। কারণ, ডিএনসিসিতে এখন মেয়র পদ শূন্য আছে। শপথ গ্রহণ সাপেক্ষে যে কোনো সময় ডিএনসিসির মেয়রের দায়িত্ব নিতে পারবেন নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম।

এদিকে, ডিএনসিসির কাউন্সিলরদের আরও সাড়ে তিন মাস অপেক্ষা করতে হবে। ডিএসসিসির কাউন্সিলরদেরও অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে যেসব কাউন্সিলর পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এ সমস্যা নেই। তারা যেভাবে দায়িত্ব পালন করছিলেন, সেভাবেই দায়িত্ব পালন করে যাবেন। অবশ্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আতিকুল ইসলামকেও অপেক্ষা করতে হতে পারে। কারণ, আনিসুল হকের নেতৃত্বাধীন করপোরেশনের মেয়াদও পাঁচ বছর। সেই মেয়াদ শেষ না হলে নতুন মেয়রের দায়িত্ব পালনের সুযোগ নেই।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ও স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।

স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯ অনুযায়ী নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর করপোরেশনের প্রথম বোর্ডসভা অনুষ্ঠানের দিন থেকে এ দায়িত্ব শুরু হবে। কাজেই দুই সিটি করপোরেশনের নতুন বোর্ডসভা পর্যন্ত নবনির্বাচিত কাউন্সিলরদের অপেক্ষা করতে হবে।

এদিকে, নবনির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলরদের শপথ গ্রহণের তারিখ চূড়ান্ত না হলেও যে কোনো সময়েই তারা শপথ নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে কোনো জটিলতা তৈরি হবে কিনা, সে সম্পর্কে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, নবনির্বাচিত মেয়রদের মধ্যে আতিকুল ইসলামের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। তিনি শপথ নিয়েই ডিএনসিসিতে যোগ দিতে পারবেন। কারণ, ডিএনসিসিতে এখন মেয়র পদ শূন্য। কিন্তু ডিএসসিসির নবনির্বাচিত মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস শপথ গ্রহণ করলে তিনি ডিএসসিসির মেয়র হিসেবে গণ্য হবেন বটে, দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন না। দায়িত্বপ্রাপ্ত হবেন বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনের মেয়াদ শেষ হলে। তবে সাঈদ খোকন যদি পুরো মেয়াদ পূরণের আগেই তাপসকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন, তাহলে যে কোনো সময়ই নতুন মেয়র ডিএসসিসিতে বসতে পারবেন।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর ওই বছরের ৬ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিএসসিসির নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও ডিএনসিসির নির্বাচিত মেয়র আনিসুল হকের শপথবাক্য পাঠ করান। কাউন্সিলরদের শপথবাক্য পাঠ করান তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ। ডিএসসিসির প্রথম বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত হয় ১৭ মে, ২০১৫। এ হিসাবে আগামী ১৬ মে পর্যন্ত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের অধিকার বর্তমান ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের রয়েছে। কাজেই এর আগে মেয়রের চেয়ারে বসার সুযোগ সীমিত ডিএসসিসির নবনির্বাচিত মেয়র ফজলে নূর তাপসের।

অবশ্য এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক বলেন, 'বর্তমান করপোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আনিসুল হক নেতৃত্বাধীন ডিএনসিসির প্রথম সভা থেকে পরবর্তী পাঁচ বছর উত্তরের মেয়রের মেয়াদ। নতুন যিনি এলেন, তিনি নির্বাচিত হয়ে থাকবেন। গেজেট প্রকাশ ও শপথ নিয়ে মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।'

অবশ্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির এক শীর্ষ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, এ সময়ের মধ্যে বর্তমান মেয়র পদত্যাগ করলে বা দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে নতুন মেয়রের দায়িত্বভার গ্রহণ ত্বরান্বিত হতে পারে। কিন্তু সে রকম কোনো সম্ভাবনা কতটুকু, তা নিয়ে সংশয় আছে।

তিনি আরও জানান, দায়িত্ব নেওয়ার আগে শপথ গ্রহণে কোনো বাধা নেই। নবনির্বাচিত মেয়র শপথ নিয়ে রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে শপথ নেওয়ার পরও বর্তমান মেয়রের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে।

অন্যদিকে, ডিএনসিসিতে মেয়র পদ শূন্য রয়েছে। কারণ, নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম পদত্যাগ করেই আওয়ামী লীগের মনোনয়নে মেয়র নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি শপথ গ্রহণ করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তবে নবনির্বাচিত কাউন্সিলররা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কারণ, ডিএনসিসির বর্তমান কাউন্সিলররা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৫ সালের ১৪ মে। এ হিসাবে আগামী ১৩ মে পর্যন্ত অন্তত ডিএনসিসির নবনির্বাচিত কাউন্সিলরদের অপেক্ষা করতেই হবে। স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এ বলা হয়েছে, নবনির্বাচিত মেয়র দায়িত্ব গ্রহণের পর কাউন্সিলরদের প্রথম বোর্ডসভার মাধ্যমে নতুন কাউন্সিলররা দায়িত্ব পাবেন। কোনো কারণে বোর্ডসভা বিলম্ব হলে সে সময় পর্যন্ত বর্তমান কাউন্সিলররাই দায়িত্ব পালন করবেন এবং নতুনদের অপেক্ষা করতে হবে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে বলেন, ২০১৫ সালে একই সঙ্গে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে আ জ ম নাছির উদ্দীন চট্টগ্রামে মেয়র নির্বাচিত হলেও তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর। কারণ, বোর্ডসভার নিয়মের বাধ্যবাধকতার কারণে ওই দীর্ঘ সময় আ জ ম নাছিরকে অপেক্ষা করতে হয়েছে। তৎকালীন মেয়র মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু মেয়াদ শেষ করেই দায়িত্ব হস্তান্তর করেন।

স্থানীয় সরকার আইন, ২০০৯-এর ৭ ধারার ১ উপধারায় বলা হয়েছে, 'মেয়র বা কোন কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত ব্যক্তি তাহার কার্যভার গ্রহণের পূর্বে নির্ধারিত পদ্ধতি ও সময়ের মধ্যে দ্বিতীয় তফসিলে বর্ণিত ছকে সরকার কর্তৃক মনোনীত ব্যক্তির সম্মুখে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা প্রদান করিবেন এবং শপথ বা ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরদান করিবেন।' উপধারা ২-এ বলা হয়েছে, 'মেয়র বা কাউন্সিলরগণের নাম সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হইবার ত্রিশ দিনের মধ্যে সরকার বা তদ্‌কর্তৃক মনোনীত কর্তৃপক্ষ মেয়র ও সকল কাউন্সিলরকে শপথ গ্রহণ বা ঘোষণা প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন।' তবে অতীতের রেওয়াজে দেখা গেছে, প্রধানমন্ত্রী মেয়রদের ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী কাউন্সিলরদের শপথবাক্য পাঠ করান। একদিনেই শপথ নেওয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। এবারও তেমনটাই হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অতীতে স্থানীয় সরকার সচিবের মাধ্যমেও দু-একজন কাউন্সিলরের শপথ নেওয়ার নজির রয়েছে।

স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন আইন, ২০০৯-এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে, 'সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ উহা গঠিত হইবার পর উহার প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হইবার তারিখ হইতে পাঁচ বৎসর হইবে। তবে শর্ত থাকে যে, সিটি কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হওয়া সত্ত্বেও, উহা পুনর্গঠিত সিটি কর্পোরেশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করিয়া যাইবে।' ৩৪ ধারার খ উপধারায় বলা হয়েছে, 'কর্পোরেশনের মেয়াদ শেষ হইবার পূর্ববর্তী একশত আশি দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।'

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, নবনির্বাচিতদের নাম, ঠিকানাসহ ফল গেজেট আকারে প্রকাশের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সেরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। স্থানীয় সরকার বিভাগ শপথ আয়োজনের বিষয়টি দেখবে।

বিষয় : তাপস ও আতিক