সংবাদ সম্মেলনে অঙ্গীকার

সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়তে চান দুই মেয়র

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

বিশেষ প্রতিনিধি

সচল ও আধুনিক ঢাকা গড়ার ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকার নবনির্বাচিত দুই মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস ও আতিকুল ইসলাম। বিপুল ভোটের ব্যবধানে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর গতকাল রোববার বিকেলে তারা পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এমন ঘোষণা দেন।

শেখ ফজলে নূর তাপস বিকেলে গ্রিন রোডে তার নিজস্ব কার্যালয়ে এবং আতিকুল ইসলাম বনানীতে তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।

দুই মেয়রই নগর ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবেন- সাংবাদিকদের কাছে তার বিস্তারিত তুলে ধরেন। বিশেষ করে তারা নির্বাচনের আগে যে ইশতেহার দিয়েছেন, তার আলোকে প্রথম দিন থেকেই কাজ শুরু করার ওপর গুরুত্ব দেন। ঢাকা সবার উল্লেখ করে বাসযোগ্য মহানগরী গড়তে দলমতনির্বিশেষে দায়িত্ব পালনে রাজধানীবাসীর ইতিবাচক পরামর্শ, সহায়তা ও সমর্থন প্রত্যাশা করেন তাপস ও আতিক।

শেখ ফজলে নূর তাপস এক দিনের মধ্যে পোস্টার অপসারণের ঘোষণা দিয়েছেন। আতিকুল ইসলাম পোস্টার অপসারণ এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রিসাইক্লিংয়ের জন্য তিন দিন সময় চেয়েছেন নগরবাসীর কাছে। তিনি পোস্টার পোড়ানো  এবং ডাস্টবিনে ফেলা থেকে সংশ্নিষ্ট সবাইকে বিরত থাকারও আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে নির্বাচনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলাকে দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে দুঃখ প্রকাশ করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ।

শেখ ফজলে নূর তাপস: গতকাল সন্ধ্যায় ধানমন্ডি ৭ নম্বর সড়কে নিজের রাজনৈতিক কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। এ সময় দলীয় বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। নবনির্বাচিত কাউন্সিলরদের অনেকে তাপসের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে আসেন। আইনজীবীদের অনেকে ফুল নিয়ে গিয়ে তাকে শুভেচ্ছা জানান।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের শুরুতেই ফজলে নূর তাপস ঢাকাবাসীকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নৌকা প্রতীকে তাকে জয়যুক্ত করায় তিনি নগরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ। বিজয়ের এই ক্ষণে তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জাতীয় চার নেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের সব শহীদ ও দেশের ভাষাসৈনিকদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তাপস বলেন, এ বিজয় তিনি ঢাকাবাসীর জন্য উৎসর্গ করছেন। জনগণের এ অভূতপূর্ব সাড়ায় তিনি অভিভূত। জনগণ রায় দিয়েছেন, তাদের ম্যান্ডেট নিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে একটি উন্নত ঢাকা গড়ার কাজে হাত দেবেন। এ কাজে তিনি দলমতনির্বিশেষে সবার সঙ্গে মিলে কাজ করতে চান। ঢাকাবাসীকে এ কাজে তিনি পাশে চান। তিনি জানান, নগরভবন নগরবাসীর জন্য, তার দরজা সবার জন্য সব সময়ই খোলা থাকবে। তাপস নবনির্বাচিত কাউন্সিলরদেরও অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানান।

নির্বাচনী নৌকা প্রতীকের বিজয়ের জন্য আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন জানিয়ে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বলেন, তাদের প্রতি অনুরোধ, আগামীকালের (আজ) মধ্যে পোস্টার, ব্যানার, ফেস্টুনসহ সব প্রচারসামগ্রী সরিয়ে ফেলতে হবে। নির্বাচনে অংশ নেওয়া বিজয়ী ও পরাজিত সব প্রার্থীর প্রতিও তিনি একই অনুরোধ জানান। নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিজয় এসেছে। এখন কোনো বিশৃঙ্খলা করা যাবে না। ধৈর্য ও সহনশীলতার সঙ্গে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে। যারা কষ্ট করে ভোট দিতে এসেছেন, তাদের ধন্যবাদ। আমরা দলমতনির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করব। বিশেষ করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনকে সহানুভূতি ও শুভেচ্ছা জানাই। তারও সহযোগিতা কামনা করি।

এক প্রশ্নের জবাবে ফজলে নূর তাপস বলেন, প্রিয় ঢাকাবাসী ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে যে রায় দিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে বিএনপি হরতাল দিয়েছে। এটা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। ঢাকাবাসীর রায়ের প্রতি তাদের সম্মান জানানো উচিত ছিল। জনগণের রায়কে অসম্মান করার অধিকার কারও নেই।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনী ইশতেহারে তিনি যা বলেছেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তার সবই পূরণের জন্য কাজ শুরু করবেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশও রয়েছে। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। কবে থেকে দায়িত্ব নেবেন- জানতে চাইলে তাপস বলেন, আইনে যা আছে, সে অনুযায়ী। দায়িত্ব পালনে তিনি বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকনেরও সহযোগিতা চান।

লেমিনেটেড পোস্টারের বিষয়ে তাপস বলেন, সোমবারের মধ্যে সব পোস্টার অপসারণ করা হবে। আমি পরিচ্ছন্ন ঢাকা দেখতে চাই। প্লাস্টিকের দূষণের বিষয়ে উন্নত দেশগুলোতে যা করা হয়, এখানেও সে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেষে নবনির্বাচিত এই মেয়র বলেন, ১ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে তিনিও প্রত্যাশা করেছিলেন ভোটকেন্দ্রে আরও বেশি ভোটাররা আসবেন। তবু যা রায় এসেছে, সে অনুযায়ী অর্পিত দায়িত্ব পালনে তিনি শতভাগ আন্তরিক থাকবেন।

আতিকুল ইসলাম: বনানী কার্যালয়ে মেয়র আতিকুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, তিনি নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহার অনুযায়ী সবাইকে সঙ্গে নিয়ে আধুনিক ও সচল ঢাকা গড়ার লক্ষ্যে কাজ করবেন। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পেয়েছেন। এর আগের মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে গত ৯ মাস তিনি কঠোর অনুশীলন করেছেন। এর মাধ্যমে আধুনিক ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তোলার জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, তার একটা রূপরেখা তৈরি করেছেন। এ অনুযায়ী তিনি ১৮টি ওয়ার্ডের প্রয়োজনীয় উন্নয়নকাজের একটি মহাপরিকল্পনাও তৈরি করেছেন। এটি এরই মধ্যে একনেক ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির মাধ্যমে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর্যায়ে রয়েছে। আতিকুল প্রয়াত মেয়র আনিসুল হককে স্মরণ করে বলেন, তার নেওয়া অসমাপ্ত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নেও তিনি পদক্ষেপ নেবেন। ঢাকা উত্তরে যানজট নিরসনে কয়েকটি স্থানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ইউলুপ স্থাপনের কাজ শুরু করবেন।

ঢাকার উন্নয়ন ও সেবার সঙ্গে প্রায় ৫৪টি সরকারি সংস্থা সম্পৃক্ত। নগর সরকার ব্যবস্থা না থাকায় এসব সংস্থা মেয়রের নিয়ন্ত্রণে নেই। ফলে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে এসব সংস্থার সঙ্গে কীভাবে কাজের সমন্বয় করবেন- জানতে চাইলে মেয়র আতিক বলেন, সরকারি প্রতিটি সংস্থা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। আর মেয়র জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধি। অতএব, সরকারি সংস্থাগুলো মেয়রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে এটাই জনগণের প্রত্যাশা। এ জন্য তিনি প্রতি মাসে টাউন হল সভা করবেন। এই সভায় সংশ্নিষ্ট সব সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা থাকবেন। ফলে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে মেয়র আতিক বলেন, ঢাকা উত্তর থেকে তিন দিনের মধ্যে সব ধরনের নির্বাচনী পোস্টার অপসারণ করা হবে। এসব পোস্টার মাটিচাপা দেওয়া কিংবা ডাস্টবিনে ফেলা হবে না। এগুলো পরিবেশ ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে রিসাইক্লিং করা হবে। এ পদ্ধতিতে লেমিনেটেড পোস্টার থেকে প্লাস্টিক ও কাগজ পৃথক করা হবে। তিনি সব প্রার্থীসহ সংশ্নিষ্ট সবাইকে পোস্টার পোড়ানো কিংবা ডাস্টবিনে ফেলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ বলেন, বিএনপি এই নির্বাচনে অংশই নিয়েছিল নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য। তারা জয়ের জন্য নির্বাচনে আসেনি, সেটা বিএনপি নেতাদের বক্তব্য থেকেই পরিস্কার হয়েছে। তারা প্রথমেই বলল, আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এরপর তারা নির্বাচন নিয়ে নানা অভিযোগ তুলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টায় ব্যস্ত থেকেছে। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ এবং অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর তারা জনগণের রায় মেনে না নিয়ে হরতাল ডাকে। সে হরতাল জনগণ প্রত্যাখ্যান করে প্রমাণ করে দিয়েছে, বিএনপির বক্তব্য জনগণ বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, বিএনপি বারবার রাজনৈতিক ভুল করেছে এবং রোববারের হরতাল ছিল বিএনপির আরও একটি রাজনৈতিক ভুল।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থীদের বিজয় সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিজয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার ফল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ তৃণমূল নেতাকর্মীদের দল। তারা ঐক্যবদ্ধ থাকলে আওয়ামী লীগকে কেউ হারাতে পারবে না। এবারও সেটাই প্রমাণ হয়েছে।

শনিবারের নির্বাচনে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ হামলার ঘটনা দুর্ভাগ্যজনক এবং কলঙ্কজনক। এটি অবশ্যই নির্দেশিত নয়, একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। অবশ্যই এ হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

নগর সরকার ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হবে কিনা জানতে চাইলে সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, এটি সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকায় মেয়রদের সমন্বিত উন্নয়ন ও নাগরিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো সমস্যা হবে না। কারণ প্রধানমন্ত্রী দুই মেয়রের পাশে আছেন। তিনি সরকারি সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে উন্নয়নের বিষয়টি প্রাধান্য দিয়ে সার্বিক কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচি, সংসদ সদস্য এ কে এম রহমতুল্লাহ, আকবর হোসেন পাঠান ফারুক, আসলামুল হক আসলাম ও সাদেক খান।